তিনি বলে গেছেন, আন্দালুসিয়ার প্রত্যেক নতুন বাদশাহই যেন সিংহাসনে আরোহণের কিছুদিনের মধ্যে এই লৌহফটকে তালা লাগিয়ে চাবি আমাদের নিকট দিয়ে দেয়।
বৃদ্ধ রডারিককে চাবির ছড়াগুলো দেখিয়ে বললেন, এগুলো সেসব তালার চাবি, যা হিরাক্কেলের পর থেকে তোমার পূর্ববর্তী বাদশাহগণ দুর্গের লৌহফটকে লাগিয়েছেন। এখন তোমার পালা। লৌহফটকে তোমার তালা লাগিয়ে দাও। আমরা অন্য আরেকদিন এসে চাবি নিয়ে যাব।’
‘আমি এই দুর্গ দেখেছি। রডারিক বলল। আমি ওটাকে প্রাচীন কোন প্রাসাদ মনে করতাম। আপনারা উভয়ই কি সেই দুর্গে অবস্থান করেন?
‘না, আন্দালুসিয়ার বাদশাহ!’ প্রথম বৃদ্ধ বললেন। আমরা অনেক দূর থেকে এসেছি। এই চাবিগুলো আমাদের বাব-দাদা আমাদেরকে দিয়ে গেছেন। এই দুর্গের হেফাযত করা আমাদের খান্দানের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও আদায় করতে থাকবে।’
‘আমি আপনাদের এই দায়িত্ব এখানেই খতম করে দিতে চাই।’ রডারিক বলল।
“হে বাদশাহ। দ্বিতীয় বৃদ্ধ বললেন। আমাদের দুজনকে তোমার প্রজা মনে করো না। তোমার ইচ্ছা যদি এই হয় যে, তুমি দুর্গের ফটক খুলবে তাহলে শুনে রাখো, তোমাকে পস্তাতে হবে। তোমার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। এমন অনেক বাদশাহই অতিবাহিত হয়েছে, যারা এই ফটক খুলতে চেয়েছিল। কোন প্রবীণ প্রত্যক্ষদর্শীকে ডেকে জিজ্ঞেস করে দেখ, সে সকল বাদশাহর পরিণতি কতটা ভয়ঙ্কর হয়েছিল।
জুলিয়াস সিজারের চেয়ে প্রবল প্রতাপশালী বাদশাহ আর কে ছিল? সেও এই ফটক খোলার চেষ্টা করেনি। আমরা এখন যাচ্ছি। খবরদার, হে বাদশাহ! এটা কোন কল্পকাহিনী নয়। আমরা বাস্তব ঘটনা বর্ণনা করছি, কয়েক দিন পর এসে আমরা সেই তালার চাবি নিয়ে যাব, যা তুমি দুর্গের ফটকে লাগাবে।’
কথা শেষ হতেই বৃদ্ধ দু’জন দরবার থেকে বের হয়ে চলে গেলেন।
***
‘রডারিক যদি এই মুলুকের শাহানশা হয়ে থাকে তাহলে এই মুলুকের কোন রহস্যই তার নিকট গোপন থাকতে পারবে না।’ বৃদ্ধ দুজন চলে যাওয়ার পর রডারিক ঘোষণা করল। আমি ঐ দুর্গে তালা লাগাব না, বরং সবকটি তালা ভেঙ্গে ফটক খুলে দেখব ভিতরে কি আছে।
‘বাদশাহ নামদার, গোস্তাখি মাফ করবেন। একজন দরবারী বিনীত স্বরে বলল। আমাদের কারোই এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে, বাদশাহ হুজুরের সাহসিকতা ও ভয়হীনতা প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়েছে। বাদশাহ হুজুরকে বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করা আমাদের কর্তব্য। বৃদ্ধ ধর্মযাজক বলে গেছেন, হিরাক্কেল দুর্গের ভিতর জাদুর প্রহরা নিযুক্ত করেছেন। আর কোন মানুষের পক্ষে জাদুর মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। বাদশাহ হুজুরের নিকট আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ, হুজুর দুর্গের লৌহফটকে তালা লাগিয়ে সে বিষয় বেমালুম ভুলে যাবেন।
‘তা হলে আজ থেকে আমাকে বাদশাহ বলা পরিত্যাগ কর। রডারিক চিৎকার করে বলল। এই মুলুক আমার, এই মুলুকের প্রতিটি গোপন রহস্য আমাকে জানতে হবে। ইতিপূর্বে আমি এই দুর্গের ব্যাপারে মনযোগ দেইনি। এখন আমার উপলব্ধি হচ্ছে, সেই রহস্যময় দুর্গ আমার বুকের উপর জগদ্দল পাথরের ন্যায় চেপে বসেছে।’
‘বাদশাহ রডারিকা’ রাজ্যের প্রধান পাদ্রি দাঁড়িয়ে বলল। আন্দালুসিয়া, ফ্রান্স এবং জার্মানের পর্বতমালা পর্যন্ত রডারিকের নাম শুনে কেঁপে উঠে; কিন্তু এমন কিছু রহস্যময় শক্তি আছে, যার সামনে মানুষ কিংকর্তব্যবিমোঢ় হয়ে পড়ে। বাদশাহ নামদার যদি আমাকে আপন ধর্মের ধর্মীয় গুরু মনে করেন তাহলে তিনি যেন আমাকে এই অধিকার থেকে বঞ্চিত না করেন যে, আমি তাকে দুর্গে প্রবেশ করা থেকে বাধা প্রদান করব।’
‘হিরাক্বেল আমার মতোই একজন বাদশাহ ছিলেন। রডারিক বলল। তিনি যদি কোন রহস্যময় শক্তি দুর্গের মাঝে বন্দী করে রেখে থাকেন তাহলে বুঝতে হবে, ওটা তার আয়ত্তে ছিল। আমিও সেই রহস্যময় শক্তি করায়ত্ত করতে চাই।’
রডারিক সামান্য সময়ের জন্য নীরব হয়ে দরবারে উপবিষ্ট লোকদের উপর তার দৃষ্টি একবার ঘুরিয়ে আনল। তারপর তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, কাপুরুষের দল! সেই দুর্গে রোমানরা গুপ্তধন গচ্ছিত রেখেছে। সেখানে অবশ্যই অতি মূল্যবান হীরা-জহরত ও মণি-মাণিক্য রয়েছে। ভয় শুধু একটাই হয়তো সেখানে অনেক বিষাক্ত সাপ আছে। অথবা মাত্র এক জোড়া বিষাক্ত সাপ আছে। তোমাদের মধ্যে এমন বীরপুরুষ কি নেই, যারা আমাকে সেই দুর্গের রহস্য উদঘাটনে সাহায্য করবে?
রডারিক তার দরবারে উপস্থিত জেনারেলদের প্রতি দৃষ্টিপাত করল। তারা কেউই বাদশাহর চোখে কাপুরুষ হতে চাচ্ছিল না। তাই সকলেই একে একে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি বাদশাহ নামদারের সাথে যাব।’
রডারিকের উপদেষ্টাবৰ্গ, রাষ্ট্রের বড় বড় পাদ্রি এবং তার পরিবারের সদস্যরাও তাকে তার সংকল্প ত্যাগ করার জন্য অনেক অনুরোধ করল, কিন্তু সে কারো অনুরোধ-উপরোধ শুনার জন্য প্রস্তুত ছিল না।
তিন-চার দিন পর দেখা গেল, সে যুদ্ধ সাজে সজ্জিত হয়ে সেই দুর্গের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার সাথে তিন-চারজন নামকরা জেনারেলও ছিল, যারা বিভিন্ন যুদ্ধে অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। তাদের সাথে নিজ নিজ রক্ষীবাহিনীর সেরা অশ্বারোহীরাও উপস্থিত ছিল।
প্রকাণ্ড চওড়া এক পাথরের উপর দুর্গটি অবস্থিত। দুর্গের চতুর্পাশে স্তম্ভের ন্যায় উঁচু উঁচু পাথর মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্তম্ভগুলো উচ্চতায় দুর্গকেও ছাড়িয়ে গেছে। প্রথম পলকেই মনে হবে, স্তম্ভের ন্যায় উঁচু পাথরগুলোই বুঝি দুটাকে স্থির করে রেখেছে। দুর্গটি মরমর পাথরে নির্মিত। সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য স্থানে স্থানে ধাতব পদার্থের টুকরা লাগানো হয়েছে। সামান্য আলো পেলেই সেগুলো ঝলমল করে উঠে।
