মেরিনা, এখানে বোধহয় আমাদের বেশিক্ষণ কথা বলা ঠিক হবে না। এতে করে আমাদের উভয়েরই বিপদ হতে পারে।
‘হ্যাঁ, আউপাস! মেরিনা বলল। দ্রুত আমাদের পৃথক হয়ে যাওয়া উচিত। তোমাকে দেখে মনে হয়, তুমি একজন অভিজ্ঞ গুপ্তচর। তুমি তো জানই এ সময় আমি ঝিলে অবস্থান করি।’
‘না, মেরিনা, আমি ঠিক গুপ্তচর নই। আউপাস বলল। আমি এ অঞ্চলের একজন অভিজ্ঞ গুপ্তচরের সন্ধান পেয়েছি। সে সোথ সম্প্রদায়ের লোক। সেই আমাকে বলেছে, তুমি শাহীমহলেই অবস্থান কর। দুই-তিন দিন পর পর চিত্তবিনোদনের জন্য ঝিলে এসে থাক। তোমার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য গত পরশু থেকে এই বেশে আমি উভ্রান্তের ন্যায় ঘোরাফেরা করছি। আজই আমার গুপ্তচর আমাকে সংবাদ দিয়েছে যে, তুমি মেয়েদের নিয়ে ঝিলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছ।
মেরিনা, প্রতিশোধ নেওয়ার সময় এসেছে। আমি কিসের প্রতিশোধ নিতে চাই তুমি তা জান। সেই নরাধম, চরিত্রহীন রডারিক থেকে তোমারও তো প্রতিশোধ নেওয়া উচিত। যৌবনের প্রারম্ভে সে তোমাকে যৌনদাসী বানিয়ে তোমার জিন্দেগী বরবাদ করে দিয়েছে। আমি তো বিয়ে-শাদী করে সংসারী হয়েছি। আমার ছেলেমেয়েও আছে। আর তুমি…, তোমার সকল স্বপ্ন-সাধ সে ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে।’
‘ঠিকই বলেছ, আউপাস!’ মেরিনা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল। আমাকেও প্রতিশোধ নিতে হবে। আমি তো তোমার জীবন-সঙ্গিনী হতেই পরিনি, অন্য কারো স্ত্রীও হতে পারিনি। ছেলে-সন্তান নিয়ে সুখের ঘরও বাঁধতে পারিনি; বরং আমি সাক্ষাৎ শয়তানে পরিণত হয়েছি। নিকৃষ্ট স্বভাব-চরিত্র আমার মাঝে জন্ম নিয়েছে। নারীলিন্দু পুরুষদেরকে আমি চোখের ইশারায় নাচিয়ে বেড়াই। শাহীমহলের কর্মচারী-কর্মকর্তা ও রাজ্যের আমীর-উমারাগণ আমাকে মুকুটহীন রানী মনে করে।
‘মেরিনা! কথা দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের হাতে সময় বেশি নেই।’ আউপাস বলল। তোমার ভাবাবেগ আমাকেও স্পর্শ করছে। মেরিনা, মন চায় বিশ বছর পূর্বের সেই না বলা কথাগুলো এখনই বলে নেই। হায়! বিশ বছর পূর্বে ফিরে যাওয়া যদি সম্ভব হতো তাহলে আমি তোমাকে সেই দুঃস্বপ্নের কথা শুনাতাম যে দুঃস্বপ্ন তোমার বিচ্ছেদের দিন থেকে আমার নিত্যসঙ্গী।
মেরিনা বলল, “সত্যি কথা কি জান? এতদিন পর তোমাকে দেখে আমি আত্মসংবরণ করতে পারছি না।’
এ মুহূর্তে আত্মহারা হলে চলবে না মেরিনা!’ আউস বলল। এখন আমাদের প্রতিশোধ নেওয়ার সময়। ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পনা গ্রহণ করে আমাদেরকে সামনে অগ্রসর হতে হবে।’
‘আমি বুঝতে পেরেছি, তুমি আক্রমণকারীদের সাথে এসেছ।’ মেরিনা বলল। ‘তারা কারা?’
‘তারা বাবার সম্প্রদায়।’ আউপাস বলল। তারা আফ্রিকান মুসলিম।
আউপাস মেরিনার নিকট ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা করল। জুলিয়ান কীভাবে মুসলমানদেরকে এই হামলার জন্য প্রস্তুত করেছে, সে কথাও বলল। সবশেষে আউপাস মেরিনাকে বলল,
‘আন্দালুসিয়ার সেনাবাহিনীতে গোথ সৈন্যও আছে, ইহুদি সৈন্যও আছে। মেরিনা, তুমি কি এক কাজ করতে পারবে, যখন রডারিকের বাহিনী আর মুসলিম বাহিনী মুখোমুখি হবে তখন গোথ ও ইহুদি সৈন্যরা মুসলিম বাহিনীর সাথে মিশে যাবে–পারবে এমনটা করতে?
‘তুমি যা চাইছে, তাই হবে।’ মেরিনা বলল। এ ব্যাপারে আর কোন কথা বাড়ানোর প্রয়োজন নেই।’
‘এ মুহূর্তে তুমি আমাকে কোন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ দিতে পারবে? আউস বলল।
‘হ্যাঁ,’ মেরিনা বলল। রডারিক এখন পাম্পালুনায় আছে। সে সৈন্য সংগ্রহ করছে। লোকদেরকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বলা হচ্ছে। মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা কত?
‘সাত হাজার। আউপাস বলল। এখন কিছু কম হবে। প্রথম লড়াইয়ে কয়েকজন সৈন্য নিহত হয়েছে।
‘উহ্! এতো কম সংখ্যক সৈন্য!’ মেরিনা বিস্মিত হয়ে বলল। “নির্ঘাত মুসলমানরা মার খেয়ে পিঠটান দেবে।
‘জেনারেল থিয়োডুমিরকে জিজ্ঞেস করে দেখো। আউপাস মুচকি হেসে বলল। তুমি এই মুসলিম সৈনিকদের লড়াই করতে দেখলে হতভম্ব হয়ে যাবে। এরা কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই করাকে ‘জিহাদ’ বলে, যার অর্থ হল, পবিত্র যুদ্ধ। মুসলমানগণ জিহাদকে ইবাদত মনে করে। তারা তাদের এই ইবাদতে আপন জীবনকে নাযরানা হিসেবে পেশ করতে পারাকে পরম সৌভাগ্য মনে করে। কিন্তু তারা অবিবেচকের মতো জীবন বিসর্জনও দেয় না।
প্রথম আক্রমণেই তারা শত্রুপক্ষের জন্য সাক্ষাৎ মৃত্যুদূতে পরিণত হয়। তাদের অন্তরে যেহেতু মৃত্যুর কোন ভয়ই থাকে না, তাই তারা নির্ভয়ে শুক্রব্যুহ ভেদ করে ভিতরে ঢুকে পড়ে। তাদের জেনারেল এমন সব রণকৌশল প্রয়োগ করেন, যা শত্রুপক্ষ তখনই বুঝতে সক্ষম হয় যখন তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙ্গে তছনছ হয়ে যায়। আমার চোখের সামনে মাত্র সাত হাজার মুসলিম সৈন্য থিয়োডুমিরের লৌহবর্ম পরিহিত পনের হাজার সৈন্যের যে করুন অবস্থা করেছে, তা আর বলে লাভ নেই। সম্ভবত তুমি ইতিমধ্যেই এ সম্পর্কে জানতে পেরেছ।
ভালো করে ভেবে দেখ, আউপাস!’ মেরিনা বলল। রডারিক যে বাহিনী প্রস্তুত করছে তার সৈন্যসংখ্যা এক লক্ষেরও বেশি হবে।
‘এ নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না, মেরিনা!’ আউপাস বলল। এখনও যদি তোমার অন্তরে আমার জন্য সামান্য ভালোবাসা থেকে থাকে তাহলে আমি তোমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছি, তা পূর্ণ করে দাও।’
“ঠিক আছে, তাই হবে।’ মেরিনা বলল। এখন তুমি পাগলের মতো আচরণ করতে করতে এখান থেকে বের হয়ে যাও।
