‘আমি তোমার সাথে আবারও সাক্ষাৎ করব।’ এ কথা বলে আউপাস সেখান থেকে দ্রুত সরে পড়ল।
***
জেনারেল থিয়োডুমিরকে পরাজিত করার কয়েকদিন পরের ঘটনা। সেনাসাহায্য পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত তারিক বিন যিয়াদ মুসলিম বাহিনীকে বর্তমান রণাঙ্গনের আশেপাশেই অবস্থানের নির্দেশ দেন।
শত্রুপক্ষের নিহত সৈনিকদের লাশ সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হয়েছে। কিন্তু রক্ত এতো বেশি পরিমাণে প্রবাহিত হয়েছে যে, মাটির উপরে জমাটবাঁধা রক্ত দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দিন-রাত বিভিন্ন প্রকার জীব-জন্তু সেখানে ঘোরাফেরা করছে, আর রক্ত চেটে চেটে খাচ্ছে। সাপ ও অন্যান্য বিষাক্ত সরিসৃপের আনাগোনা বেড়ে গেছে।
তারিক বিন যিয়াদ পরবর্তী আক্রমণের জন্য যে অঞ্চল নির্ধারণ করেছিলেন, তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য ঘোড়ায় চড়ে একদিন সেদিকে রওনা হলেন। গাইড হিসেবে তার সাথে জুলিয়ানও ছিলেন। তার সাথে আরো ছিলেন, মুগীস আর-রুমি ও আবু যারু’আ তুরাইফ
‘আউপাস কবে নাগাদ ফিরে আসবে বলে মনে করছেন?’ তারিক বিন যিয়াদ জুলিয়ানকে জিজ্ঞেস করলেন। ধরা পরে যাবে না তো?
সে এতোটা আনাড়ি নয়।’ জুলিয়ান উত্তর দিলেন। কিছু একটা করে তবেই ফিরে আসবে। সে এমন ছদ্মবেশ ধারণ করেছে যে, কেউ তাকে চিনতেই পারবে না। তার ধরা পরার সম্ভাবনাও খুবই কম। যুদ্ধবন্দীদের থেকে আপনি শুনেছেন, রডারিক এখন টলেডোতে নেই। যথাসম্ভব উযির-নাযিররাও তার সাথেই আছে। এই অবস্থায় আউপাসের জন্য কাজ করা অনেক সহজ হবে।
তারিক বিন যিয়াদরা কথা বলতে বলতে জেলে পাড়া অতিক্রম করে সামনে অগ্রসর হয়ে গেলেন। তারিক বিন যিয়াদকে বলা হয়েছিল যে, এখান থেকে বহুদূর পর্যন্ত কোন শহর বা উপশহর নেই। এ জন্য কোন সেনাক্যাম্পও আশেপাশে কোথাও নেই। তারা আরও কিছু দূর অগ্রসর হয়ে একটি ছোট বসতি দেখতে পেলেন।
চারদিকে সবুজের সমারোহ। বসতিটিকে ঘিরে প্রকৃতি তার সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়েছে। দূর থেকে লোকদের প্রাণচাঞ্চল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। তারিক বিন যিয়াদ তাঁর সাথীদের নিয়ে সেই বসতির নিকট পৌঁছলেন। তাদেরকে দেখে লোকজন যার যার ঘরে দৌড়ে পালাল।
‘জুলিয়ান!’ তারিক বিন যিয়াদ বললেন। এরা হয়তো জানতে পেরেছে, আমরা তাদের বাহিনীকে পরাজিত করেছি। তাদেরকে কে বুঝবে যে, আমরা সেইসব বিজয়ী সম্প্রদায়ের মতো নই, যারা কোন শহর বিজয় করার পর জোরপূর্বক সেখানকার বাসিন্দাদের গৃহে প্রবেশ করে লুটতরাজ করে, রক্তের হোলি খেলে, আর যুবতী মেয়েদেরকে বেআবরু করে।
“ইবনে যিয়াদ!’ জুলিয়ান বললেন। তাদেরকে বুঝানোর কী দরকার? তারা যখন আমাদের থেকে এমন কোন আচরণ না পাবে তখন তারা নিজেরাই বুঝতে পারবে।
এমন সময় একজন অতসীপর বৃদ্ধা বসতির কোন এক ঘর থেকে বের হয়ে তারিক বিন যিয়াদের সামনে এসে দাঁড়াল। তারিক তার ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলেন, অন্যরাও ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলেন।
‘তোমাদের মধ্যে তোমাদের কমান্ডারও কি আছেন, যিনি আমাদের বাহিনীকে পরাজিত করেছেন?’ বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করলেন।
‘হ্যাঁ, বুড়ি মা!’ এনিই হলেন সেই কমান্ডার, যিনি আন্দালুসিয়ার বাহিনীকে পরাজিত করেছেন। জুলিয়ান তারিক বিন যিয়াদের দিকে ইঙ্গিত করে বৃদ্ধার ভাষায় উত্তর দিলেন।
‘বৎস, ঘোড়া থেকে নেমে এসো, তারপর তোমার শিরস্ত্রাণ খুলে ফেল।’ বৃদ্ধা। কোন রকম প্রভাবান্বিত না হয়ে তারিক বিন যিয়াদকে উদ্দেশ্য করে বললেন।
মুগীস আর-রুমি আন্দালুসিয়ার ভাষা বুঝতেন। তিনি তারিক বিন যিয়াদকে বৃদ্ধার কথা তরজমা করে শুনালে তারিক বিন যিয়াদ ঘোড়া থেকে নেমে তাঁর পাগড়ী খুলে ফেললেন।
‘ওহো, তুমি এসে গেছ! বৃদ্ধা তারিক বিন যিয়াদের মাথায় হাত রেখে আনন্দিত হয়ে বললেন। আমার স্বামী একজন গণক ছিলেন। তার ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা অনেক দূর-দূরান্তের মানুষও স্বীকার করত। তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি আমাকে কয়েকবারই বলেছেন, এক ভিন জাতি আন্দালুসিয়া বিজিত করে তাদের শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করবে। তাদের কমান্ডারের পরিচয়-চিহ্ন হল, তাঁর দাড়ি ও মাথার চুল হবে লালচে রঙ্গের। ললাট হবে প্রশস্ত।
আমার বিশ্বাস তুমিই সেই ব্যক্তি। তোমার চুল লালচে রঙ্গের, আর তোমার ললাট প্রশস্ত। আরেকটি চিহ্ন আছে, তোমার বাম কাঁধের কাপড় সরাও। সেখানে একটি মোটা তিল থাকার কথা। তিলের চতুরপার্শ্বে পশম থাকবে।’
মুগীস আর-রুমী তারিক বিন যিয়াদকে বৃদ্ধার কথা তরজমা করে বললেন, ‘বৃদ্ধ আপনাকে বাম কাঁধের কাপড় সরাতে বলছেন।’
‘বৃদ্ধা ঠিকই বলেছেন। তারিক তার বাম কাঁধ উন্মুক্ত করতে করতে বললেন। ‘আমার এ কাঁধে একটি মোটা তিল আছে। তিলের চতুরপার্শ্বে পশমও আছে।’
‘তুমিই আন্দালুসিয়া জয় করতে পারবে।’ বৃদ্ধা তারিকের বাম কাঁধের তিল ও তার চতুরপাশের পশম দেখে বললেন, ‘তুমিই সেই ব্যক্তি, যে এই রাজ্যের হতভাগা লোকদেরকে বাদশাহ ও তার পরিষদবর্গের জুলুম-অত্যাচার থেকে মুক্তি দিতে পারবে।’
‘প্রিয় বন্ধুগণ!’ তারিক বিন যিয়াদ তার সাথী-সঙ্গীদের লক্ষ্য করে বললেন। ‘আমি ইতিপূর্বে আপনাদেরকে এবং গোটা বাহিনীকে আমার স্বপ্নের কথা শুনিয়েছি। স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে সুসংবাদ দিয়েছিলেন যে, বিজয় আমাদেরই হবে। এখন এই বৃদ্ধা ভবিষ্যত্বাণী শুনাচ্ছেন যে, আমিই হবো আন্দালুসিয়ার বিজেতা। তবে সকলকে মনে রাখতে হবে, এখানে আমাদেরকে জীবনবাজি রেখে লড়তে হবে।
