অর্টিজা হলেন বড় ভাই। তিনি বাদশাহও ছিলেন। তাই বংশীয় মান-মর্যাদা ও শাহীদরবারের প্রভাব-প্রতিপত্তির কথা বিবেচনা করে তিনি আউপাসকে নির্দেশ দিলেন, আইপাস যেন মেরিনার সাথে মেলামেশা না করে। তার নির্দেশ অমান্য করে সে যদি মেরিনার সাথে মেলামেশা করে তাহলে তাকে কয়েদখানায় বন্দী করে রাখা হবে। কিন্তু আউলাস বড় ভাইয়ের হুমকির কোন পরোয়া না করে সে তার শেষ সিদ্ধান্ত নিয়ে দিল। সে বলল, ‘আমি মেরিনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না।
এ ঘটনার কয়েকদিন পর আউপাসের সাথে মেরিনার সাক্ষাৎ হলে মেরিনা আউপাসকে বলল, ‘শহীদরবারের এক লোক বাবাকে বলেছে, বাবা যেন আমাকে শাহীখান্দানের কোন ব্যক্তির সাথে দেখা করতে না দেয়। আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে যেন বিয়ে দেওয়া হয়।
অর্টিজা ছিলেন বাদশাহ। সামান্য এক ইহুদি-কন্যা তার শাহী সম্ভ্রমবোধে আঘাত হানবে–এমন মেয়েকে শেষ করে দেওয়া তার জন্য কোন ব্যাপারই ছিল না। কিন্তু অর্টিজা ছিলেন এক মহানুভব বাদশাহ। সকল মানুষই তার নিকট সমান মর্যাদার অধিকারী। তিনি তার স্বভাব-বিরুদ্ধ কোন পদক্ষেপ নেওয়া পছন্দ কতেন না।
বাদশাহর নির্দেশমতো মেরিনার বাবা তাকে গৃহবন্দী করে রাখল। কিন্তু আউপাসকে বাধা দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আউপাস রাতের অন্ধকারে মেরিনার সাথে দেখা করার জন্য চলে আসতো। মেরিনার বাবা তাড়াহুড়া করে এক জায়গায় মেরিনার বিবাহ ঠিক করে। কিন্তু মেরিনা অন্য কোথাও বিয়ে বসতে অস্বীকার করে।
বাদশাহ অর্টিজা তাঁর ভাই ও মেরিনার সব খবরই রাখতেন। তিনি তাঁর স্বভাবসূলভ উদারতার কারণে মেরিনার ব্যাপারে কোন কঠোর সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি মেরিনার বাবার ব্যাপারেও কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। কিন্তু তিনি তার ভাই আউপাসকে অনেক কঠিন শাস্তি দেন। তারপরও আউপাস মেরিনাকে ভুলে যেতে অস্বীকার করে।
একবার আউপাস ও মেরিনা রাজ্য ছেড়ে পালাতে চেয়েও পালাতে পারেনি। পথিমধ্যেই ধরা পড়ে যায়। সেদিন থেকে অর্টিজা ছোট ভাই আউলাসের উপর নজরদারী আরোপ করেন, যেন সে শাহীমহল থেকে বের হতে না পারে।
আউপাস তার ভাই অর্টিজার জন্য, আর মেরিনা তার বাবার জন্য এক বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তাদের প্রেমকাহিনী গোটা টলেডোতে মশহুর হয়ে পড়ে। এমনিভাবে দুই বছর অতিবাহিত হয়ে যায়। হটাৎ একদিন শাহীমহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সংবাদ পৌঁছে, সেনাবাহিনী বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিচ্ছে সেনাবাহিনীর কমান্ডার রডারিক।
অর্টিজা তার রক্ষীবাহিনী ও টলেডোর রিজার্ত বাহিনীকে নিয়ে বিদ্রোহীদের দমন করার জন্য বের হয়ে পড়েন। তার ধারণা ছিল, তিনি বিদ্রোহীদেরকে দমন করতে পারবেন। তাদেরকে সমূলে বিনাশ করতে সক্ষম হবেন; কিন্তু প্রকৃত অবস্থা তার ধারণার চেয়ে ভিন্ন ছিল। তার জানাই ছিল না যে, তার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী ও গির্জাসমূহে এ প্রপাগাণ্ডা চালানো হয়েছে, তিনি দেশ ও জাতির দুশমন। তিনি অন্য রাজার কাছে দেশ বিক্রি করে দিয়েছেন।
অর্টিজা ছিলেন জনদরদি বাদশাহ। তিনি ইহুদিদেরকে সম্মানজনক জীবন যাপনের অধিকার প্রদান করেছিলেন। এ কারণে রাজ্যের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, উযির-নাযির, জাগিরদার ও ধনী শ্রেণীর লোকেরা তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পাদ্রিরা তার প্রতি একটু বেশিই অসন্তুষ্ট ছিল। কারণ, তারা গির্জায় বসে সুন্দর সুন্দর ইহুদি মেয়েদেরকে ভোগ করতে পারত। অর্টিজা তাদের এই ভোগ-বিলাসের পথ বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
বিত্তশালী ও ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গ তাঁর বিরুদ্ধে চলে যায়, ফলে তাঁর পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অর্টিজার বাদশাহী এমনই এক পরিস্থিতির শিকার হয়ে পড়ে যে, অর্টিজা যে বাহিনী নিয়ে টলেডো থেকে বের হয়েছিলেন, সে বাহিনীকে তিনি অত্যন্ত বিশ্বস্ত মনে করতেন; কিন্তু বিদ্রোহীদের মুখোমুখি হয়ে তাঁর এই বিশ্বস্ত বাহিনীই তার সাথে প্রতারণা করে বসে। তারা বিদ্রোহীদের সাথে হাত মিলায়। যার ফলে তিনি রডারিকের হাতে বন্দী হয়ে নিহত হন।
অর্টিজার বান্দানের কিছু লোক জীবন বাঁচাতে সক্ষম হয়। তারা সমুদ্র পার হয়ে সিউটা গিয়ে পৌঁছে। জুলিয়ান তাদেরকে সেখানে আশ্রয় দেন। জুলিয়ান হলেন অর্টিজার মেয়ের জামাই। অন্যথায় তারা এখানেও কোন আশ্রয় পেতে না। কারণ, জুলিয়ান হলেন আন্দালুসিয়ার একজন সাধারণ করদ-রাজা।
***
প্রায় বিশ বছর পর মেরিনা ও আইপাস একজন আরেকজনকে সামনে থেকে দেখছে। মেরিনার নির্দেশে কোচোয়ানরা যার যার গাড়ির নিকট চলে গেল। মেরিনা আউপাসকে নিয়ে টিলার পিছনে এক নির্জন স্থানে চলে এলো। তাদের কারো পক্ষেই হৃদয়ের আবেগ-উচ্ছ্বাস গোপন রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। তাদের চোখে ছলকে উঠা তপ্ত আঁস্ অনেক্ষণ পর্যন্ত তাদের হৃদয়াবেগের ধারাভাষ্য দিচ্ছিল। আবেগের আতিশয্যে তারা পারস্পরকে জড়িয়ে ধরে বেশ কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মেরিনাই প্রথমে নীরবতা ভাঙ্গল। সে আউপাসকে জিজ্ঞেস করল,
‘তুমি কীভাবে জানলে যে, আমি টলেডোতে আছি?
‘আমি তোমার সম্পর্কে সব খবরই রাখি। আউপসি বলল। ‘জুলিয়ানের লোকজন তোমাদের এখানে প্রায়ই আসা-যাওয়া করে। তাদের একজন আমাকে বলেছে, যে মেরিনার জন্য তুমি আপন বড় ভাইকে অসন্তুষ্ট করেছিলে, যার জন্য তুমি রাজমুকুট আর রাজসিংহাসন ত্যাগ করতে চেয়েছিলে, সেই মেরিনা এখন রডারিকের বাগানবাড়ির শুভা বর্ধন করছে। তোমার ব্যাপারে সব খবরই আমার নিকট পৌঁছত।
