ঝিল থেকে সামান্য দূরে ঘন বৃক্ষরাজির আড়ালে রমণীদের ঘোড়াগাড়ি রাখা আছে। কোচোয়ানদের সকলেই পুরুষ। একজন কোচোয়ান দেখতে পেল বাগানবাড়ির সীমানায় একজন অপরিচিত লোক প্রবেশ করেছে। কোচোয়ান তাকে ইঙ্গিতে সামনে অগ্রসর হতে নিষেধ করল। কিন্তু লোকটি বাধা উপেক্ষা করে সামনে অগ্রসর হতে লাগল। কোচোয়ান তাকে বাধা দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল। সে রাস্তা পরিবর্তন করে ঝিলের দিকে তার গতি বাড়িয়ে দিল। কোচোয়ান তার নিকট পৌঁছার আগেই সে ঝিলের নিকট পৌঁছে গেল। কোচোয়ান দৌড়ে এসে তাকে ধরে ফেলল।
আগন্তুক তার মুখমণ্ডল চাদর দ্বারা ঢেকে রেখেছিল। শুধু চোখ দেখা যাচ্ছিল। সে চটের দ্বারা তৈরি লম্বা জুব্বা পরে ছিল। কোচোয়নি তাকে ধরার সাথে সাথে সে চিৎকার করতে শুরু করল। অদূরে জলকেলিরত রমণীদের কানে চিৎকারের আওয়াজ পৌঁছলেও তারা সেদিকে কোন ভ্রূক্ষেপ করল না। তারা আনন্দ-ফুর্তি আর উচ্ছলতায় বিভোর হয়ে রইল।
মেরিনার দৃষ্টি সেদিকে আকৃষ্ট হল। সে কাপড় পাল্টিয়ে আওয়াজ লক্ষ্য করে অগ্রসর হল। অগ্রসর হয়ে সে দেখতে পেল, কয়েকজন কোচোয়ান পাগল মতো দেখতে এক ব্যক্তিকে টেনেহেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর সে ব্যক্তি অদ্ভুতভাবে চিৎকার করছে।
মেরিনাকে দেখতে পেয়ে সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। তারপর ঐ তো রানী এসে গেছে বলে সজোরে কোচোয়ানদেরকে ধাক্কা মেরে মেরিনার দিকে দৌড়ে গেল। কোচোয়ানরা তার পিছনে দৌড় লাগাল। সে অতি দ্রুতগতিতে মেরিনার নিকট পৌঁছে তার পায়ে লুটিয়ে পড়ল। মেরিনা দু-এক পা পিছে সরে এলো।
‘মেরিনা!’ আগন্তুক মাথা উঠিয়ে বলল। আমি আউপাস, তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি।’
ইতিমধ্যে কোচোয়ানরা সেখানে পৌঁছে গেল। তারা তাকে টেনেহেঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগল।
থামো, মেরিনা কোচোয়ানদেরকে লক্ষ্য করে বলল। বেচারা পাগল মানুষ, কারো কোন ক্ষতি করবে না; তোমরা চলে যাও।’
‘আমি পাগল নই, রানী! আউপাস করুণ কণ্ঠে বলল। আমি মাজলুম, ফরিয়াদি হয়ে আপনার নিকট এসেছি।’
***
রডারিক যখন বিদ্রোহের মাধ্যমে বাদশাহ অর্টিজাকে সিংহাসনচ্যুত করে হত্যা করে তখন অর্টিজার ভাই আউপাসের বয়স ছিল সতের বা আঠার। আর মেরিনার বয়স ছিল ষোল।
মেরিনা এক ইহুদি ব্যবসায়ীর মেয়ে। আউপাস তাকে এক পলকের জন্য দেখেই তার হৃদয়-মন্দিরে ঠাই দিয়েছিল। কিন্তু মেরিনা নিজেকে আউপাসের যোগ্য মনে করত না। সে তার ভালোবাসা গ্রহণ করতে ভয় পেতো। তাই সে একদিন আউপসিকে বলেছিল,
‘ক্ষণিকের এই মোহকে ভালোবাসা বলছ কেন? আমি এক ইহুদি কন্যা, তা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত শাহীখান্দানের সুলোপ দৃষ্টি থেকে কীভাবে বেঁচে আছি–তা আমি নিজেও জানি না। তুমি তোমার গোলামদেরকে হুকুম করলেই তো পার। তারা আমাকে জবরদস্তি তোমার স্বপ্নপুরিতে পৌঁছে দেবে। তুমি রাজপুত্র, তুমি বর্তমান বাদশাহর ভাই; ভবিষ্যৎ বাদশাহ। তোমাকে বাঁধা দেয়–এমন ক্ষমতা কার আছে?
‘কেন, তুমি কি জান না? শাহীখান্দানের লুলোপ দৃষ্টি থেকে তুমি কেন এখনও বেঁচে আছ?’ আউস বলল। “তোমার কি জানা নেই, আমার ভাই সিংহাসনে আরোহণ করার পরই এ নির্দেশ জারি করেছেন যে, ইহুদি কোন কন্যাকে জবরদস্তি কোন গির্জায় বা শাহীখান্দানের কোন সদস্যের গৃহে অর্পণ করা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। এ নির্দেশ অমান্যকারীদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে।
আমি তোমাকে এ জন্য শাহীমহলে নিয়ে যাব না যে, আমি বাদশাহর ভাই, আর তুমি একজন সাধারণ ইহুদির কন্যা। আমি সেদিনই তোমাকে শাহীমহলে নিয়ে যাব যেদিন আমি তোমাকে পবিত্র গির্জায় নিয়ে গিয়ে বিবাহ করতে পারব। মেরিনা, আমি তোমাকে ভালোবাসি। যত দিন আমার এ স্বপ্ন পূরণ না হবে তত দিন শাহীমহলের বাহিরে আমি তোমার সাথে সাক্ষাৎ করব।’
মেরিনার হৃদয়েও আউপাসের জন্য ভালোবাসা জন্মেছিল। এর পর থেকে তারা দুজন শাহীমহলের বাহিরে দেখা-সাক্ষাৎ করতো। একদিন আউপাসের ভাই বাদশাহ অর্টিজা তাদের এ দেখা-সাক্ষাৎ সম্পর্কে জানতে পারলেন। তিনি আউপাসকে ডেকে বললেন,
‘তোমার কি এতটুকু অনুভূতিও নেই যে, তুমি শাহীখান্দানের একজন সদস্য? কে সেই মেয়ে, যার সাথে তুমি প্রায়ই দেখা-সাক্ষাৎ কর।
সে এক ইহুদির মেয়ে। আউপাস বিনীত স্বরে বলল। আমাদের এ সম্পর্ক দৈহিক নয়। আমি যখন তার সাথে সাক্ষাৎ করি তখন আমি নিজেকে বাদশাহর ভাই মনে করি না।’
‘না, তুমি কেবল সেই মেয়ের সাথেই মেলামেশা করবে, যার সাথে আমরা তোমাকে বিবাহ দেব বলে স্থির করেছি।’ অর্টিজা বললেন। আর তুমি ভালোভাবেই জান, আমরা কার সাথে তোমার বিবাহ ঠিক করেছি।’
‘যে মেয়ের সাথে আপনারা আমার বিবাহ ঠিক করেছেন, আমি সেই মেয়ের সাথে মেলামেশা করব না। আউপাস বিনীত অথচ দৃঢ়কণ্ঠে বলল। আমি সেই ইহুদি মেয়েকেই বিবাহ করব।’
‘তা হলে তুমি এই শাহীমুকুট, আর এই শাহীসিংহাসন থেকে বঞ্চিত হবে। অর্টিজা ক্রুদ্ধস্বরে বললেন। তুমি হয়তো ভুলে গেছ, আমার পর তুমিই হবে এই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। তোমার রানী হবে গোথ বংশীয়া। সে কোন ইহুদি-কন্যা হতে পারবে না।’
‘আমি রাজমুকুট ও রাজসিংহাসনের দাবি পরিত্যাগ করব।’ আউপাস অবিচল কণ্ঠে বলল। ‘তবুও আমি মেরিনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না।’
