***
কোন কোন উপাসনালয় থেকে এ জাতীয় কোন ঘোষণাই প্রচার করা হল। এগুলো ছিল ইহুদিদের উপাসনালয়। এ সকল উপাসনালয়ের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। আন্দালুসিয়ায় ইহুদিরা ছিল সবচেয়ে নির্যাতিত। ব্যবসা-বাণিজ্য ও কারিগরি বিদ্যায় ইহুদিদের একচেটিয়া প্রভাব ছিল। কিন্তু কোন অর্থ-সম্পদ তাদের ছিল না। তাদের থেকে এত বেশি টেক্স ও রাজস্য আদায় করা হতো যে, পেট ভরে খাওয়ার জন্য তাদের নিকট খুব সামান্য উপার্জনই অবশিষ্ট থাকত। আন্দালুসিয়ায় ইহুদিদেরকে অশ্বাস্য মনে করা হতো।
অর্টিজা যখন আন্দালুসিয়ার বাদশাহ ছিলেন তখন ইহুদি ও খ্রিস্টানরা সমান মর্যাদার অধিকারী ছিল। তিনি ইহুদিদের টেক্স কমিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি তার এক আদেশের মাধ্যমে এই কালো আইনও নিষিদ্ধ করে দেন যে, জবরদস্তি ইহুদি সুন্দরী মেয়েদেরকে গির্জায় সোপর্দ করা যাবে। শুধু ইহুদিদের জন্যই নয়, বরং জনসাধারণের জন্যও অর্টিজা জীবন যাপনের মান অনেক উন্নত করেছিলেন।
অর্টিজার এই সংস্কারনীতি ও জনসাধারণের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ অনুভূতিই তার জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যার ফলে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ও পাদ্রিদের সহায়তায় রডারিক অর্টিজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সে আন্দালুসিয়ার সিংহাসন দখল করে বাদশাহ বনে বসে। রডারিক বাদশাহ হওয়ার সাথে সাথে অর্টিজাকে হত্যার নির্দেশ দেয়।
ভিনদেশী শত্রুদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ফলে যখন প্রতিটি পাড়া ও মহল্লায় ঘোষণা করা হচ্ছিল, ভিনদেশী হানাদার বাহিনীকে ধ্বংস করার জন্য সেনাবাহিনীতে যোগদান করুন তখন ইহুদি উপাসনালয়গুলোতে ভিন্ন ধরনের চিন্তা-ভাবনা চলছিল। একদিন ইহুদিদের পাঁচ-ছয়জন ধর্মগুরু এক উপাসনালয়ে একত্রিত হয়ে ভাবতে লাগল, কীভাবে ইহুদিদেরকে সৈন্যবাহিনীতে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রাখা যায়। তারা যে কোন মূল্যে রডারিককে সহায়তা করা থেকে বিরত থাকতে চাচ্ছিল।
‘রডারিকের বাহিনীতে শামিল হওয়াই প্রধান সমস্যা নয়। ইহুদিদের এক ধর্মগুরু বললেন। বরং এ ব্যাপারে চিন্তা করা উচিত যে, কীভাবে আমরা রডারিকের ক্ষতিসাধন করতে পারি।’
‘সেনাবাহিনীতে তো পূর্ব থেকেই ইহুদি সৈন্য রয়েছে। অন্য জন বললেন। ‘তাদেরকে সেনাবাহিনী থেকে কীভাবে বের করা যায়–এ ব্যাপারে চিন্তা করা হোক।
‘আমি ভিন্ন কিছু চিন্তা করছি।’ আরেকজন বলল। ইহুদি সৈনিকদেরকে সেনাবাহিনীতেই থাকতে দেওয়া হোক এবং তাদেরকে রডারিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হোক।
‘এটা কি জানা গিয়েছে যে, আক্রমণকারী কারা? ধর্মগুরুদের মধ্যে অন্য আরেকজন জিজ্ঞেস করলেন।
‘এটা এখনও কেউ বলতে পারছে না। তাদের একজন উত্তর দিলেন।
প্রশ্নকারী পুনরায় বললেন, ‘আক্রমণকারীদের পরিচয় জানা গেলে আমি তাদের সাথে মিলে বড় সুন্দর একটা নীলনকশা তৈরি করতে পারতাম।
ইহুদি মস্তিষ্ক ষড়যন্ত্র পাকানোর জন্য অতি উর্বর ক্ষেত্র। পর্দার অন্তরালে থেকে আঘাত হানতে তারা এতটাই পারঙ্গম যে, অন্য কোন সম্প্রদায়ের পক্ষে সেই পারঙ্গমতা প্রদর্শন করা একেবারেই অসম্ভব।
সমবেত এই ধর্মগুরুগণ–যাদেরকে রব্বানী বলা হতো–এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, প্রত্যেক ইহুদির ঘরে এই সংবাদ পৌঁছে দেওয়া হবে, যেন কোন ইহুদি রডারিকের বাহিনীতে যোগদান না করে।
এই সিন্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রতিজ্ঞা নিয়ে সেদিনের মতো ধর্মগুরুদের পরামর্শসভা মুলতবি ঘোষণা করা হল।
***
মেরিনা এক মধ্যবয়সী নারী। তার যৌবনে ভাটার টান ধরেছে, কিন্তু তার লম্বা শারীরিক গঠন আর অতুলনীয় দেহ-সৌষ্ঠব অনেক নারীর জন্য ঈর্ষার কারণ ছিল। তার চেহারার আকর্ষণীয় রূপ-লাবন্যের মাঝে তখনও এমন জাদুকরী প্রভাব ছিল যে, তার চোখের রহস্যময় চাহনি যে কোন পুরুষের মন কেড়ে নিতো।
মেরিনা কোন সাধারণ মেয়ে মানুষ নয়। সে শাহীমহলের একজন বেগম হিসেবে পরিগণিত হতো। সে রডারিকের স্ত্রী ছিল না, ছিল রক্ষিতা। সেই ছিল একমাত্র রক্ষিতা, যে মধ্যবয়স্কা হওয়া সত্ত্বেও শাহীমহলেই অবস্থান করত।
শাহীমহলের যে সকল রক্ষিতার বয়স ত্রিশ বছরের নিকটবর্তী হতে তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়া হতো অথবা কোন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে উপহার হিসেবে প্রদান করা হতো।
মেরিনা ছিল ইহুদি। অন্যান্য ইহুদিদের মতো তার মস্তিষ্কও ছিল ষড়যন্ত্রের উর্বর ক্ষেত্র। সে ছিল অতুলনীয় রূপের অধিকারিনী, আর তীক্ষ্ণ মেধা ও সূক্ষ্ম বিবেক-বুদ্ধির মালিক। এ কারণে শাহীমহলে সে এক বিশেষ সম্মানের অধিকারিনী ছিল। রানী না হয়েও সে রাজরানীর মতো সম্মানের পাত্রী ছিল। সে তার চোখের চাহনি, আর ঠোঁটের দুই হাসিতে রডারিককে তার অনুরাগী করে রেখেছিল।
টলেডোর শাহীমহল থেকে এক-দেড় মাইল দূরে একটি ঝিল ছিল। সেই ঝিলের চতুর্দিকে ছিল ঘন বৃক্ষরাজি। ঝিলের এক পার্শ্বে সজুজ পত্র-গুলো আচ্ছাদিত একটি টিলাও আছে। কোন পুরুষের এই ঝিলের নিকটবর্তী হওয়ার অনুমতি ছিল না। এটি শাহীমহলের প্রমোদবালাদের জন্য নির্ধারিত ছিল। সাঁঝের বেলায় তারা সেখানে জলকেলি খেলতে ও নৃত্য-গীত করতো।
একদিন সাঁঝের বেলা। তখনও সূৰ্য্য অস্ত যায়নি। পঁচিশ-ত্রিশজন অপরূপ রূপসী রমণী ঝিলের মধ্যে জলকেলি খেলছিল, আর হাসতে হাসতে একজন আরেকজনের শরীরে গড়িয়ে পড়ছিল। তাদের মধ্যে যুবতী মেয়েও আছে, মধ্যবয়স্ক নারীও আছে। এটাই হল এখানকার সাধারণ চিত্র। এ সকল রমণীর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব ছিল মেরিনার উপর। সেই সন্ধ্যায় মেরিনাও সেখানে উপস্থিত ছিল।
