আমি তীরন্দাজ বাহিনীকে গাছগাছালি ও পাহাড়ের আড়ালে আত্মগোপন করে থাকার নির্দেশ দেই। আর অশ্বারোহীদেরকে পাহাড়ী টিলার পিছনে পালিয়ে থাকতে বলি। অতঃপর পশ্চাৎপসারণের ছলে শক্র বাহিনীকে সামনে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ দিয়ে তাদেরকে মরণফাঁদের দিকে টেনে নিয়ে আসি। তারা আমাদের ফাঁদে পা দেওয়ার সাথে সাথে আমাদের তীরন্দাজ বাহিনী তাদের উপর তীরবৃষ্টি শুরু করে দেয়। তীরন্দাজ বাহিনীর আক্রমণের তীব্রতায় শত্রুবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।
এমন সময় ‘মড়ার উপর খাড়ার ঘা’র মতো আমাদের আত্মগোপন করে থাকা অশ্বারোহী বাহিনী পিছন দিক থেকে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এমনি সুপরিকল্পিত আক্রমণের ফলে সাত হাজার মৰ্দেমুজাহিদ পনের হাজার কাফেরের উপর বিজয় লাভ করতে সক্ষম হয়।
রণাঙ্গনের যে বিজয়-দৃশ্য আমি দেখেছি, সম্মানিত আমীর সে দৃশ্য দেখলে আপনি আনন্দিত হতেন। খলীফাতুল মুসলিমীন ওলিদ বিন আবদুল মালেক সে দৃশ্য দেখলে অভিভূত হতেন। শত্রু পক্ষের এতো অধিক সংখ্যক যোদ্ধা মারা পড়েছে যে, তাদের লাশ গুনে শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। যুদ্ধবন্দীরা সেসব লাশ উঠিয়ে সমুদ্রে নিক্ষেপ করছে। খানা-খন্দকগুলো লাশে পরিপূর্ণ করে তার উপর মাটি ফেলে সমতল করা হয়েছে। তারপরও লাশের সংখ্যা কমছে না। চতুর্দিকে শুধু লাশ আর লাশ। যুদ্ধলব্ধ ছয়শত ঘোড়া আমাদের হস্তগত হয়েছে। নিহত শত্রু সেনাদের বিপুল পরিমাণ অস্ত্রসস্ত্রও আমরা জমা করেছি।
এখন সামরিক সাহায্যই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। আমার নিকট সংবাদ পৌঁছেছে যে, আন্দালুসিয়ার সৈন্যসংখ্যা অনেক বেশি। সামনের প্রতিটি শহরই দুৰ্গসদৃশ। আমি সামনে অগ্রসর হচ্ছি, তবে সেনা-সাহায্যের অপেক্ষায় আছি। আমাদের সফলতার জন্য দুআ করবেন। আমরা যদি পরাজিত হই তাহলে আর ফিরে আসব না। কেননা, ফিরে আসার কোন উপায়ই আমাদের নিকট অবশিষ্ট নেই। যে চারটি রণতরীতে আরোহণ করে আমরা এসেছিলাম, সেগুলো আমি আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছি।’
‘সাব্বাস! মুসা বিন নুসাইর অবচেতন মনে বলে উঠলেন। এই ব্যক্তিকে কোন শক্তিই পরাস্ত করতে পারবে না।’
মুসা বিন নুসাইর তৎক্ষণাৎ খলীফা ওলিদ বিন আবদুল মালেকের উদ্দেশ্যে একটি পয়গাম লেখান, তাতে তিনি তারিক বিন যিয়াদের প্রথম সফলতার পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরেন এবং সেনাসাহায্য পাঠানোর অনুরোধ করেন।
.
***
পাম্পালুনায় রডারিকের নির্দেশে ঘোষণা করা হল যে, আন্দালুসিয়ায় একটি ভিনজাতি অনুপ্রবেশ করেছে। তারা এতটাই হিংস্র ও রক্তপিপাসু যে, তারা তাদের থেকে দ্বিগুণ সৈন্যবাহিনীকে কেটে টুকরো টুকরো করে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছে।
রডারিক স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে বহিঃশত্রু সম্পর্কে ভীতি ছড়ানোর নির্দেশ দেয়। সে জনসাধারণকে এই বলে সতর্ক করে দিতে বলে যে; এই লুটেরা বাহিনী তোমাদের ধন-সম্পদ ও তোমাদের কন্যা সন্তানদেরকে নিয়ে যাবে। আর তোমাদেরকে হত্যা করে তোমাদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেবে।’
নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে সরকারি বার্তাবাহকরা গ্রাম-গঞ্জে-শহরে-বন্দরে সর্বত্র এই সংবাদ পৌঁছে দিতে লাগল। রাজধানী টলেডোতেও এই সংবাদ এসে পৌঁছল। প্রত্যেক গির্জায়, প্রতিটি জনসমাগম স্থলে এবং সকল চায়ের আসরে এই একই বার্তা ঘোষিত হতে লাগল।
‘হে লোক সকল! অজানা এক রাজ্য থেকে লুণ্ঠনকারী ও হত্যাকারীদের বিশাল এক বাহিনী আমাদের রাজ্যে অনুপ্রবেশ করেছে। তারা আমাদের এক বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করেছে। প্রলয়ঙ্করি ঝড়ের ন্যায় তারা সম্মুখ দিকে অগ্রসর হয়ে চলছে। তারা জবরদস্তি ঘরে প্রবেশ করে স্বর্ণ-অলঙ্কার-টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিচ্ছে। যুবতী মেয়েদেরকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। হত্যা ও লুণ্ঠনের পর ঘর-বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। উপাসনালয় ধ্বংস করে ফেলছে। তারা এতটাই নিষ্ঠুর যে, নিষ্পাপ শিশুদেরকে বর্ষাবিদ্ধ করে উদ্দাম নৃত্য করে, আর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।’
আন্দালুসিয়ার মহামান্য বাদশাহ এই ভয়ঙ্কর বাহিনীকে ধ্বংস করার জন্য যুদ্ধে রওনা হয়েছেন। বাদশাহ রডারিক বলেছেন, যে ব্যক্তি তীর ও বর্ষা নিক্ষেপ করতে পারে এবং তরবারী চালাতে পারে, সে যেন সৈন্যবাহিনীতে অংশগ্রহণ করে। যে সৈন্যবাহিনীতে অংশগ্রহণ করবে তাকে বেতন-ভাতা দেওয়া হবে। তাকে লুটেরাদের থেকে উদ্ধারকৃত সম্পদের অংশীদার করা হবে। সবচেয়ে বড় পাওনা হল, আমাদের জান-মাল ও ঘর-বাড়ি নিরাপদ থাকবে এবং আমাদের স্ত্রী-কন্যাদের সতীত্ব সংরক্ষিত হবে।
হে লোক সকল! তোমরা প্রস্তুত হয়ে যাও, অস্ত্র ধর, তোমাদের ধন-সম্পদ লুটেরাদের হাত থেকে রক্ষা কর। আর যদি তোমরা এজন্য প্রস্তুত না হও তাহলে আজই বাল-বাচ্চা নিয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যাও। দুর্বল পশুর ন্যায় পালিয়ে পালিয়ে দিন অতিবাহিত কর। পরে যখন ফিরে আসবে তখন তোমাদের ঘর-বাড়ির ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কোন কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’
যুবক শ্রেণী ও মধ্যবয়স্ক পুরুষরা ভিনদেশী শত্রুদের মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হতে লাগল। তাদেরকে বলা হল, বাদশাহ রডারিক পাম্পালুনা থেকে অমুক রাস্তা দিয়ে টলেডো যাচ্ছেন। সৈন্যবাহিনীতে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক লোকেরা যেন সেই রাস্তায় বাদশাহর আগমনের অপেক্ষা করে।
