তারা গাছের আড়াল থেকে, পাথরের আড়াল থেকে অনরবত তীর নিক্ষেপ করে চলছিল। তাদের একটি তীরও লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছিল না। তাদের একজন অশ্বারোহী দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল না; কিন্তু হঠাৎ পিছন দিক থেকে তাদের অশ্বারোহীরা আমার বাহিনীর উপর আক্রমণ করে বসে। তারা আমাদের উপর এমন চূড়ান্ত আঘাত হানে যে, আমরা তাদের আঘাত প্রতিহত করে পিছু হটে আসার মতো কোন অবকাশই পাইনি।’
বিয়োডুমির তার এই পত্রে পরাজয়ের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার পর এমন একটি তথ্য উল্লেখ করে, যা আজও ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত হয়ে আছে। সে লেখেছে :
‘এটা জানা সম্ভব হয়নি যে, এরা কারা? আর কোথা থেকেই বা এসেছে? তারা যেই হোক, আর যেখান থেকেই আসুক, বাস্তব সত্য হল, তারা অত্যন্ত রক্তপিপাসু ও ভয়ঙ্কর এক জাতি। হতে পারে তারা দস্যুবাহিনী, লুটতরাজ করাই তাদের কাজ। লুটতরাজ শেষে হয়তো তারা তাদের রাজ্যে ফিরে যাবে; কিন্তু এখানেই তাদেরকে নিঃশেষ করে দেওয়া উচিত। আমার সৈন্যসংখ্যা তাদের দ্বিগুণ ছিল। এখন আমার আরো বেশি সৈন্যের প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হল, আমাদের করদ-রাজা সিউটার জুলিয়ান, আর অর্টিজার ভাই আউপাসও এই অদ্ভুত বাহিনীর সাথে আছে।
‘জুলিয়ান! রডারিক অবাক হয়ে হুঙ্কার ছেড়ে বলল। উপাস! মৃত্যু তাদেরকে এখানে টেনে এনেছে। আমি বুঝতে পেরেছি।
রডারিক রাগে-গোসায় লম্বা লম্বা পা ফেলে কামরার এক কোণ থেকে আরেক কোণে পায়চারী শুরু করল।
‘থিয়োডুমির কাপুরুষতার পরিচয় দিয়েছে। রডারিক দাঁত কিড়মিড় করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল। তার বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। আক্রমণকারী কারা–এটা দেখার মতো হুঁশও তার ছিল না। জুলিয়ান আর আউপাস আমার থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এসেছে। তাদের নিজস্ব বাহিনীর সাথে তারা বার্বারদেরকেও হয়তো নিয়ে এসেছে। থিয়োড়িমিরের সাহায্যে সেখানে আমি আর কোন সৈন্য পাঠাব না। আমি নিজেই ওখানে যাব। জুলিয়ানের মেয়ে ফ্লোরিডারকে আমার মহলে নিয়ে আসব। এসব বদনসিবদের জানা নেই, আমি গাদ্দারীর কী শাস্তি দিয়ে থাকি?’
রডারিক হঠাৎ নীরব হয়ে বিদ্রোহীদের উলঙ্গ স্ত্রী-কন্যাদের দিকে ফিরে তাকাল। তারপর কঠিনম্বরে নির্দেশ দিল, ভোর হওয়ার সাথে সাথে এ সকল বিদ্রোহীদেরকে ময়দানে জড়ো করে তাদের উপর ঘোড়া ছুটিয়ে দাও। ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট করে এদেরকে মেরে ফেল। আর মেয়েদেরকে এখানকার গির্জার পাদ্রির নিকট সোপর্দ কর।’
রডারিকের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে সকল মেয়েরা আহাজারী শুরু করে দিল। দুই-তিনজন রডারিকের পা জড়িয়ে ধরে বলতে লাগল। আপনি আমাদেরকে অনেক শাস্তি দিয়েছেন। এবারের জন্য আমাদেরকে মাফ করেদিন।’
‘বাদশাহ সালামত। আমার বাবার অপরাধের শাস্তি আমাকে কেন দিচ্ছেন? একটি যুবতী মেয়ে মিনতিভরা কণ্ঠে বলল। আমার বাবার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আমি তো কিছুই জানতাম না। আমাকে ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট করে মেরে ফেলুন, তবুও আমাকে পাদ্রিদের হাতে সোপর্দ করবেন না।’
আরেকটি মেয়ে বলল, ‘আমার ভাইকে ছেড়ে দাও, তার পরিবর্তে আমাকে মেরে ফেলো।
রডারিক সকলকে লাঠিপেটা করে তাড়িয়ে দিল।
‘আন্দালুসিয়ার বাদশাহ! আমাদের উপর আরও বেশি করে জুলুম কর।’ অল্প বয়স্কা উসতোরিয়া চিৎকার করে বলল। তোমার পাপের বোঝা আরো রি করে নাও। আমাদের লোকদের উপর ঘোড়া ছুটিয়ে দাও। তোমার যা ইচ্ছা তুমি তাই করে নাও। তবে এক অসহায় মেয়ের আর্তনাদ শুনে রাখো, তোমার এই বাদশাহীর উপরও একদিন ঘোড়া দৌড়ানো হবে। তোমার নাম-নিশানাও সেদিন অবশিষ্ট থাকবে না। তোমার আর তোমার বাদশাহীর দিন শেষ হয়ে এসেছে।
‘সাব্বাস!’ রডারিক অট্টহাসি দিয়ে বলে উঠল। আমি তোমার সাহসিকতার প্রশংসা করছি। তুমি এক বিশাল সাম্রাজ্যের বাদশাহকে ভয় পাওনি। কাছে এসো মেয়ে! আমি তোমাকে পুরস্কৃত করব।’
মেয়েটি রডারিকের সামনে এসে দাঁড়ালো।
‘লোকদের দিকে মুখ ফিরাও। রডারিক বলল। সকলেই দেখুক, এই মেয়ে কতটা সাহসী?
মেয়েটি রডারিকের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়ালো। রডারিকের সভাসদবর্গ তাকে দেখতে পাচ্ছিল। রডারিকের তরবারী তার শাহীকুরসির পাশেই রাখা ছিল। সে হঠাৎ তরবারী কোষমুক্ত করে পিছন দিক থেকে এক আঘাতে মেয়েটির মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল।
মুণ্ডহীন দেহটি কিছুক্ষণ ছটফট করতে থাকল। তার পর চিরতরে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। পরদিন সকালে বিদ্রোহীদেরকে ময়দানে এনে একত্রিত করা হল। তাদের বিপরীত দিকে পঞ্চাশ-ষাটজন ঘোড়সওয়ার দাঁড়িয়ে ছিল। ইঙ্গিত পাওয়ার সাথে সাথে অশ্বারোহীরা বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে ছুটতে লাগল। বিদ্রোহীরা আত্মরক্ষার জন্য এদিক-সেদিক দৌড়াতে লাগল। অশ্বারোহীরাও তাদের পিছু নিয়ে ঘোড়ার গতি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে তাদেরকে ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট করে হত্যা করে ফেলল।
***
উত্তর আফ্রিকার রাজধানী কায়রোয়ান। মিসরের আমির মুসা বিন নুসাইর তাঁর পরিষদবর্গকে নিয়ে কায়রোয়ানে এক জরুরি মিটিংয়ে বসেছেন। তিনি তারিক বিন যিয়াদের পয়গাম পাঠ করে তাদেরকে শুনাচ্ছিলেন। তারিক বিন যিয়াদ প্রথম যুদ্ধ জয়ের কথা উল্লেখ করে লেখেছেন :
‘আল-হামদুলিল্লাহ্! আমরা আমাদের চেয়েও দ্বিগুণ সৈন্যবাহিনীর উপর প্রথম যুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছি। আমাদের তিনশ অশ্বারোহীর মোকাবেলায় তাদের এক হাজার অশ্বারোহী ছিল। আন্দালুসিয়ার প্রতিটি সৈন্যের মাথায় লৌহনির্মিত শিরস্ত্রান ছিল। তাদের অস্ত্রসস্ত্র আমাদের হাতিয়ারের তুলনায় অনেক উন্নত ছিল। আল্লাহ তাআলার প্রত্যক্ষ মদদে আমরা বিজয় লাভ করতে সক্ষম হয়েছি।
