রডারিক বিলাসপ্রবণ ও চরিত্রহীন হলেও যুদ্ধের ময়দানে প্রতিপক্ষের জন্য ছিল এক মূর্তিমান আতঙ্ক। শক্তিধর শত্রুর উপরও সে বজ্রের ন্যায় হুঙ্কার ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত। তার শাহী গাম্ভির্য বিনষ্ট হয় এমন কোন আচরণ সে বরদাস্ত করতে পারত না। বিদ্রোহীদের জন্য সে ছিল সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত। পাম্পালুনায় বিদ্রোহের সংবাদ পেয়ে কোন জেনারেলকে বিদ্রোহ দমনের নির্দেশ না দিয়ে সে নিজেই সেখানে গিয়ে উপস্থিত হল।
বিদ্রোহীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল ঠিকই, কিন্তু রডারিকের বিক্রম আর প্রতাপের সামনে তারা একেবারে অসহায় হয়ে পড়ল। যুদ্ধে পরাজিত একজন বিদ্রোহীকেও রডারিক প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে দিল না।
বিদ্রোহীদের লিডারকে গ্রেফতার করা হল। সে আন্দালুসিয়ার অধিবাসী ছিল না। তার কয়েকজন সঙ্গী-সাথীকেও গ্রেফতার করা হল। গ্রেফতারের পর তাদের উপর যে গজব নেমে এসেছিল, তা থেকে তাদের ঘরের নারীরাও বাঁচতে পারেনি। বন্দী বিদ্রোহীদের উপর এমন নির্মম নির্যাতন চালানো হতো যে, তাদের বেঁচে থাকার কোন আশা করা যেতো না। কিন্তু তাদেরকে মরতেও দেওয়া হতো না।
রডারিক তাদেরকে নির্যাতন করে আধমরা করে রাখত। বিদ্রোহীরা যখন রডারিকের অসহনীয় নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বেহুঁশ হয়ে পড়ত তখন তাদেরকে এক উন্মুক্ত প্রান্তরে নিক্ষেপ করা হতো। তার পর শহরের অধিবাসীদের সেখানে একত্রিত করে একজন ঘোষকের মাধ্যমে ঘোষণা করা হতো,
এরা রাষ্ট্রদ্রোহী, এরা গাদ্দার, আন্দালুসিয়ার মহামান্য বাদশাহর শৌর্য-বীর্য সম্পর্কে এরা অবগত ছিল না। প্রতিদিন এসে এদের করুণ পরিণতি দেখে যেয়ো। এদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। এরা রাষ্ট্রদ্রোহী এরা গাদ্দার …।
এসকল বিদ্রোহীদের স্ত্রী-কন্যাদের সাথে অত্যন্ত লজ্জাজনক আচরণ করা হতো। রাতের অন্ধকার নেমে আসার সাথে সাথে এ সকল নারীদেরকে উলঙ্গ করে রডারিকের সাধারণ মজলিসে নাচতে বাধ্য করা হতো। সামান্য অবাধ্য হলে তাদেরকে চাবুকের আঘাত সহ্য করতে হতো।
রডারিক স্বয়ং সেই মজলিসে উপস্থিত থাকত। সেখানে সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও সেনা অফিসাররাও উপস্থিত থাকত। এ সকল লোকেরা নির্যাতিতা মহিলাদের সাথে অশোভন আচরণ করত, আর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ত। অবশেষে মদ খেয়ে উন্মাদ হয়ে সকল অফিসারই একজন করে মহিলাকে ধরে নিয়ে যেতো।
ঐতিহাসিক ওয়েলম্যাকার ‘উসতোরিয়া নামক এক অল্প বয়স্কা বালিকার ঘটনা সবিস্তারে লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি লেখেছেন,
‘উসতোরিয়ার বয়স তখন চৌদ্দ কি পনের হবে। সে ছিল বিদ্রোহীদের সরদারের কন্যা। এই অল্প বয়স্কা বালিকাকে রডারিক নিজের জন্য রেখে দিয়েছিল। সে তার সাথে এমন পাশবিক আচরণ করত যে, বনের পশুরাও লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিত। পাম্পালুনার যে স্থানটিতে সে ছাউনি গেড়ে ছিল সেখান থেকে প্রায়ই সেই অল্প বয়স্কা বালিকার মরণচিত্তার শুনা যেতো।
***
কিছুক্ষণ হয় সূর্য অস্ত গেছে। রাতের অন্ধকার অতিদ্রুত যুদ্ধ বিধ্বস্ত পালুনাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। রোজকার মতো আজও সাধারণ মজলিসের আয়োজন জমকালোরূপ ধারণ করছিল। বিদ্রোহীদের স্ত্রী-কন্যাদেরকে উলঙ্গ অবস্থায় নাচতে বাধ্য করা হচ্ছিল। অল্প বয়স্কা উসতোরিয়াকে রডারিক তার কোলে বসিয়ে রেখেছিল। উপস্থিত সকলের হাতেই ছিল পানপাত্র। দাস-দাসীরা সূরাহী হাতে শরাব পরিবেশন করছিল। এমন সময় রডারিককে সংবাদ দেওয়া হল, টলেডো থেকে থিয়োডুমিরের বার্তাবাহক এসেছে। সে এখনই রডারিকের সাথে সাক্ষাৎ করতে চায়।
রডারিকের ইঙ্গিতে বার্তাবাহককে তার সামনে এনে দাঁড় করানো হল। বার্তাবাহক লিখিত ফরমান তার নিকট সোপর্দ করল। সে তার এক সভাসদকে বলল, বার্তাটি পড়ে শুনানোর জন্য। আর অন্যদের লক্ষ্য করে সে তালি বাজাল। সাথে সাথে সেখানে এমন পিনপতন নীরবতা ছেয়ে গেল যে, মনে হল সেখানে কোন মানুষের অস্তিত্ব নেই।
সভাসদ বার্তাটি পড়তে লাগল, ‘আন্দালুসিয়ার মহামান্য শাহানশাহের দরবারে শত সহস্র ভক্তি ও শ্রদ্ধা নিবেদন করছি, মহানুভবের এই অধম গোলাম আজীবন শাহীখান্দানের মান-মর্যাদা ও রাজত্বের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছে। এই অধম সকল যুদ্ধেই বিজয়ের মালা ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। সভাসদ কিছুটা উচ্চ আওয়াজে বার্তাটি পড়ে শুনাচ্ছিল।
‘যেখানেই বিদ্রোহীরা মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে, শাহীখান্দানের এই আজ্ঞাবাহী গোলাম সেখানেই মৃত্যুদূত হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। সে বিদ্রোহীদেরকে জীবনের পরপারে পৌঁছে দিয়ে তবেই ক্ষান্ত হয়েছে। অতিবড় নিন্দুকও বলতে পারবে না যে, থিয়োডুমির কোন যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে। কিন্তু তারা হয়তো কোন জিন-ভূত হবে। তারা আমার অর্ধেক সৈন্যকে হত্যা করেছে, আর বাকি অর্ধেক তাদের ভয়ে রণাঙ্গন ছেড়ে পালিয়ে গেছে।
‘তুমি ঠিক পড়ছ তো? রডারিক তার কোলে বসিয়ে রাখা মেয়েটিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো। অর্ধেক সৈন্য নিহত হয়েছে, আর অন্যরা পালিয়ে গেছে, কী আবোল-তাবোল পড়ছ? তারা জিন-ভূত ছিল! ভালো করে পড়।’
সভাসদ পুনরায় পড়তে শুরু করল,
‘তারা চারটি বিশাল আকৃতির রণতরীতে করে এসেছিল। সমুদ্রসৈকতে অবতরণ করামাত্রই তারা সেগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয়। তৎক্ষণাৎ আমাকে সংবাদ দেওয়া হয়। আমি আমার সকল সৈন্য নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হই। শত্রুবাহিনীর সংখ্যা আমার বাহিনীর অর্ধেক ছিল। সংখ্যাধিক্যের কথা বিবেচনা করলে আমার সৈন্যদের উচিত ছিল, তাদেরকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা। কিন্তু তারা এমন সুশৃঙ্খলভাবে লড়াই করছিল যে, আমার সৈন্যরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।
