তারিক বিন যিয়াদের এই যুদ্ধ-কৌশল থিয়োডুমিরের ধারণার অতীত ছিল। তার ধারণা ছিল, তার পিছন দিক নিরাপদ। এই হামলার নেতৃত্ব তারিক বিন যিয়াদ নিজেই দিচ্ছিলেন। তাঁর অন্য দুই সেনাপতি মুগীস আর-রুমী, আর আবু যারু’আ তুরাইফ সম্মুখভাগে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর মোকাবেলা করছিলেন। তারা পিছন দিক থেকে তারিকের আক্রমণের অপেক্ষা করছিলেন।
তারিক বিন যিয়াদ তিনশ’ অশ্বারোহী আর প্রায় দুই হাজার পদাতিক সৈন্য নিয়ে পিছন দিক থেকে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এই আচানক বিপদ সম্পর্কে থিয়োডুমির অবগত হওয়ার পূর্বেই তার বাহিনীর প্রায় দুই হাজার যোদ্ধা মৃত্যুর শিকারে পরিণত হল। আর যারা আহত হল, তাদের ভয়ঙ্কর চিৎকার, আর মর্মভেদী আর্তনাদ অন্যান্য সৈনিকদেরকে হতবিহ্বল করে তুলল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই আন্দালুসিয়ার বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। তারা উদ্দেশ্যহীনভাবে ছুটোছুটি করতে শুরু করল। তারিক বিন যিয়াদের প্লান অনুযায়ী মুগীস আর-রুমী, আর আবু যারু’আ তুরাই তাদের বাহিনীকে পূর্বের চেয়ে অধিক বিক্রমে আক্রমণ করার নির্দেশ দিলেন।
আক্রমণের তীব্রতায় দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে আন্দালুসিয়ার বাহিনী রণাঙ্গন ছেড়ে ভাগতে লাগল। অশ্বারোহীরা আহত হয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে গেলে আরোহীবিহীন ঘোড়াগুলো এলোপাথাড়ি ছুটোছুটি করে এক ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করল।
এ সময় তারিক বিন যিয়াদ নির্দেশ দিলেন, ‘শত্রুপক্ষের ঘোড়াগুলোর যেন কোন ক্ষতি না হয়। ঘোড়াগুলোকে অক্ষত অবস্থায় ধরতে হবে। এগুলো পরবর্তীতে আমাদের কাজে লাগবে।’
মুহুর্মুহু রণহুঙ্কার আর ঢাল-তলোয়ারের ঝনঝনানিতে ভীতসন্ত্রস্ত ঘোড়াগুলো এলোপাথাড়ি ছুটোছুটি করছিল। ছুটন্ত ঘোড়ার খুরের আঘাতে অনেক পদাতিক সৈন্য নিহত হল।
তারিক বিন যিয়াদের তীরন্দাজ বাহিনী আন্দালুসিয়ার সৈন্যদের জন্য মৃত্যুদূত হয়ে আবির্ভূত হল। তারা এক গাছ থেকে নেমে অন্য গাছে আরোহণ করত, আর একেবারে কাছ থেকে তীর নিক্ষেপ করত।
থিয়োডুমির বাহিনীর শৃঙ্খলা একেবারেই তছনছ হয়ে গেল। সৈনিকরা একজন একজন করে রণাঙ্গন ছেড়ে ভাগতে শুরু করল। কোন সৈনিকই থিয়োডুমিরের নির্দেশের প্রতি ক্ষেপও করল না। তার বাহিনীর প্রায় অর্ধেক সৈন্য মারা পড়ল। কোন সৈনিক যদি আহত হয়ে মাটিতে পড়ে যেতো তাহলে সেও পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করত।
***
‘মুগীস!’ জুলিয়ান ও আউপাস হন্তদন্ত হয়ে মুগীস আর-রুমীর নিকট এসে বললেন। কয়েকজন জানবাজ যযাদ্ধাকে নির্দেশ দাও, তারা যেন থিয়োর্ভুমিরকে জীবিত গ্রেফতার করে।’
‘রণাঙ্গনের পরিস্থিতি দেখছেন?’ মুগীস বলল। এই পরিস্থিতিতে তার নিকট পৌঁছা সম্ভব নয়।’
‘পাঁচ-ছয়জন বার্বার যোদ্ধা আমাকে দাও।’ আউপাস বলল।
‘আমি আপনাকে আমার বাহিনীর চারজন অশ্বারোহী দিচ্ছি।’ মুগীস আউপাসকে বললেন।
আউপাস চারজন অশ্বারোহী যোদ্ধাকে সাথে নিয়ে চলে গেল।
আন্দালুসিয়ার সেনাবাহিনীর এক সহকারী সেনাপতি থিয়োডুমিরকে লক্ষ্য করে বলল, “থিয়োডুমির, আপনি কি শক্রর হাতে নিহত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন? আমাদের আর কী করার আছে?
‘তুমি কি আমাকে রণাঙ্গন থেকে পলায়নের পরামর্শ দিচ্ছ?’ থিয়োডুমির তার সহকারীকে বলল।
‘এখনই পতাকা গুটিয়ে এখান থেকে সরে পড়ন। সহকারী সালার বলল। ‘আমাদের অর্ধেক সৈন্য নিহত হয়েছে। অন্যরা রণাঙ্গন ছেড়ে পলায়ন করছে।
থিয়োডুমির সবকিছুই দেখতে পাচ্ছিল। মুসলমানদের প্রবল বিক্রম আর শৌর্য-বীর্যও সে স্বচক্ষে অবলোকন করছিল। সে খোলা চোখেই দেখতে পাচ্ছিল, কীভাবে মুসলমানরা তাদের তুলনায় দ্বিগুণ সৈন্যের বিশাল বাহিনীর উপর আতঙ্ক ছড়িয়ে তাদেরকে অবলিলায় হত্যা করে চলছে।
থিয়োডুমির নিজেও ভয়ে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছিল। তার বাঁচার একটি মাত্র উপায়ই অবশিষ্ট ছিল, আর তা হল রণাঙ্গন ছেড়ে পলায়ন করা। সে পরিস্থিতির নাযুকতা মেনে নিয়ে পতাকা বাহককে নির্দেশ দিল, পতাকা গুটিয়ে নেওয়ার জন্য। কারণ, উত্তোলিত পতাকা শত্রুপক্ষের নিকট তার অবস্থান চিহ্নিত করছিল।
পতাকা গুটিয়ে নেওয়ার সাথে সাথে থিয়োডুমিরের অবশিষ্ট সৈন্যরা মনোবল হারিয়ে ফেলল। তারা তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলল। দেখতে দেখতে গোটা রণাঙ্গন লাশের স্তূপে পরিণত হল। যারা আহত হয়ে এদিক-সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, তারা কোন রকমে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। আবার পরক্ষণেই মাটিতে আছড়ে পড়ছিল। যারা উঠে দাঁড়াতে পারছিল না, তারা হামাগুড়ি দিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছিল। আন্দালুসীয়দের আরোহীবিহীন ঘোড়াগুলো সেই ভয়ানক দৃশ্য থেকে উদাসী হয়ে এদিক-সেদিক ছুটোছুটি করছিল, আর খড়কুটা কুড়িয়ে খাচ্ছিল।
‘ঘোড়াগুলো ধরে নিয়ে এসো। তারিক বিন যিয়াদ নির্দেশ দিলেন। আর গনিমতের সম্পদ একত্রিত কর।
আন্দালুসিয়ার অভিজ্ঞ জেনারেল থিয়োডুমির রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে গিয়ে জীবন বাঁচাতে সক্ষম হল।
***
কয়েকদিন পরের কথা। আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিক জেনারেল থিয়োডুমিরের পলায়নের সংবাদ শুনে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল। রডারিক সে সময় রাজধানী টলেডোতে ছিল না। সে তখন পাম্পালুনা শহরে অবস্থান করছিল। পাম্পালুনা রাজধানী টলেডো থেকে কয়েক দিনের দূরত্বে অবস্থিত একটি ছোট্ট শহর। সেখানে জার্মান বংশোদ্ভূত কিছু লোক বসবাস করত। তারা স্থানীয় লোকদের উপর প্রভাব বিস্তার করে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল, ফলে সেখানকার পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে পড়েছিল।
