‘এদেরকে জীবন নিয়ে পালিয়ে যেতে দিওনা।’ ঢাল-তলোয়ারের বিকট আওয়াজ আর আহত সৈনিকদের মর্মবেদী আর্তনাদ ছাপিয়ে থিয়োডুমির হুঙ্কার ছেড়ে বলতে লাগল। এরা পালিয়ে যাচ্ছে, এরা যেন কিছুতেই পালাতে না পারে। এদের পিছু ধাওয়া কর। প্রত্যেককে টুকরো টুকরো করে ফেল।’
তারিক বিন যিয়াদ আরো ক্ষিপ্রগতিতে তার বাহিনী পিছে সরিয়ে আনলেন। শত্রুবাহিনীও ততোধিক ক্ষিপ্রগতিতে পিছু ধাওয়া করে সামনে অগ্রসর হতে লাগল।
তারিক তার বাহিনীকে তিন ভাগে বিভক্ত করে ছিলেন। মধ্যভাগের কমান্ড ছিল তাঁর নিজের হাতে। এই অংশের সৈন্যদের দিয়েই তিনি আক্রমণ রচনা করে ছিলেন। এদেরকে নিয়েই তিনি পিছু হটে আসছিলেন। সৈন্যরা দ্রুত পিছু হটে আসছিল। তাদের মুখের ‘নারায়ে তাকবীর’ ধ্বনি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মুসলিম বাহিনী পিছু হটতে হটতে এমন এক স্থানে এসে পৌঁছল, যেখানে গাছগাছালির আধিক্য ছিল। আর অপর দিকে ছিল উঁচু উঁচু পাহাড়ী টিলার সারি।
আন্দালুসিয়ার বাহিনী যখন মুসলিম বাহিনীকে পিছু ধাওয়া করতে করতে সেই গাছগাছালিতে আচ্ছাদিত স্থানে এসে পৌঁছল তখন গাছের আড়াল থেকে তাদের উপর তীরবৃষ্টি শুরু হল। টিলার পিছনেও মুসলিম তীরন্দাজরা আত্মগোপন করেছিল। তারাও শত্রুবাহিনীর উপরে তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করল।
আন্দালুসিয়ার এই বাহিনীতে পদাতিক সৈন্যদের সাথে অশ্বারোহীও ছিল। তীরন্দাজ বাহিনী একেবারে নিকট থেকে তীর নিক্ষেপ করছিল। তাই তাদের কোন তীরই লক্ষ্য ভ্রষ্ট হচ্ছিল না। প্রতিটি তীরই উদ্দিষ্ট শত্রুর বুকে সমূলে বিদ্ধ হচ্ছিল।
আন্দালুসিয়ার বাহিনীর আগমনের সংবাদ শুনে তারিক বিন যিয়াদ তীরন্দাজ বাহিনীকে যে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছিলেন–এটাই হল তার নিগুঢ় রহস্য। তারিক বিন যিয়াদের নির্দেশমতো তীরন্দাজ বাহিনীর সদস্যগণ পূর্ব থেকে গাছের আড়ালে, টিলার পিছনে ওঁতপেতে ছিল।
তারিক বিন যিয়াদের পিছু হটার উদ্দেশ্য ছিল, শত্রুবাহিনীকে তীরন্দাজদের তীরের নিশানার মধ্যে নিয়ে আসা। তার এই কৌশল সফল হল। পিছু ধাওয়া করে আসা সৈনিকদের সকলেই বেঘোরে মারা পড়ল।
‘ঘোষণা করে দাও, ঘোড়াগুলোকে যেন নিশানা বানানো না হয়। তারিক বিন যিয়াদ নির্দেশ দিলেন। আমাদের ঘোড়ার প্রয়োজন আছে। তবে একজন সওয়ারীও যেন জীবন নিয়ে ফিরে যেতে না পারে।
সুউচ্চ আওয়াজে তারিক বিন যিয়াদের নির্দেশ ঘোষিত হল। থিয়োডুমির তার পদাতিক ও অশ্বারোহীদের করুণ পরিণতি নিজ চোখে অবলোকন করল। তার নিকট তখনও অনেক সৈন্য ছিল।
এদিকে মুসলিম বাহিনীর অন্য দুই অংশের একটি ডাইনে ও অপরটি বায়ে দাঁড়িয়ে ছিল। থিয়োডুমির একই সাথে তিন বাহিনীর উপর আক্রমণের নির্দেশ দিল। তারিক বিন যিয়াদের পূর্ব নির্দেশনা অনুযায়ী ডান পার্শ্ব ও বাম পার্শ্বের বাহিনী আরো পিছু হটে এলো। উদ্দেশ্য হল, রণাঙ্গন যেন প্রশস্ত হয় এবং শত্রুপক্ষ যেন বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
বার্বার জাতি ছিল রক্তপিপাসু যোদ্ধা। প্রতিপক্ষের রক্ত ঝড়ানোই ছিল তাদের নেশা। ইসলাম তাদেরকে লড়াই করার জন্য নতুন মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিল। তাদের সামনে তুলে ধরে ছিল জীবনের এক নতুন উদ্দেশ্য। ফলে তাদের লড়াই করার ভঙ্গিই পাল্টে গিয়েছিল। খ্রিস্টান ঐতিহাসিকগণ লেখেছেন :
‘আন্দালুসিয়ার বাহিনীর মাঝে লড়াই করার সেই উদ্যম আর উদ্দিপনা ছিল না, যে উদ্যম আর উদ্দিপনা মুসলিম বাহিনীর মাঝে ছিল। আন্দালুসিয়ার সৈনিকরা বাদশাহর অধীনস্থ চাকর ছিল। তারা বেতন পেয়ে লড়ত, আর বেতন পাওয়ার জন্য বেঁচে থাকতে চাইতো। তাদের বড় বড় ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও পাদ্রিরা রাজা-বাদশাহ ও আমীর-উমারাদের মতো বিলাসবহুল জীবন যাপন করত।
আন্দালুসিয়ায় ইহুদি সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক বসবাস করত। কিন্তু খ্রিস্টানরা তাদেরকে গোলাম বানিয়ে রেখেছিল। ইহুদি নারীদের মান-ইজ্জতের কোন নিরাপত্তা ছিল না। কোন রূপসী ইহুদি মেয়ের প্রতি পাদ্রির কুদৃষ্টি পড়লে তাকে গির্জার সম্পত্তি গণ্য করা হতো। বলা হতো, এই মেয়েকে গির্জার ‘নান বানানো হবে, কিন্তু বাস্তবে তাকে পাদ্রির রক্ষিতা করে রাখা হতো।
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও ধর্মগুরুদের স্বভাব-আচরণ সাধারণ সৈনিকদের মাঝেও মন্দ প্রভাব বিস্তার করেছিল। জেলে ও মাঝিরা একারণেই মুগীস আর-রুমীকে বলেছিল, তাদের রাজ্যের সৈন্যরা কোন সুশ্রী যুবতী মেয়েকে দেখলে জবরদস্তি তাকে উঠিয়ে নিয়ে যেতো।’
মুসলিম বাহিনী অত্যন্ত বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর মোকাবেলা করছিল। তারা সংখ্যায় ছিল অল্প, কিন্তু সুশৃঙ্খল রণকৌশল, আর অসম সাহসিকতার কারণে তারা শত্রুপক্ষের নিকট মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
থিয়োডুমিরের ধারণা ছিল, তার বিশাল বাহিনী অল্প সংখ্যক মুসলিম সৈন্যদেরকে কেটে টুকরো টুকরো করে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেবে; কিন্তু পিছন দিকের অতর্কিত হামলা থিয়োডুমির বাহিনীর মাঝে কেয়ামতের বিভীষিকা ছড়িয়ে দিল।
তারিক বিন যিয়াদ পূর্বেই এর ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। তিনি অশ্বারোহী বাহিনীকে শত্রুপক্ষের পিছনে অবস্থিত টিলাসমূহের মাঝে আত্মগোপন করে থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারিক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে যে সকল সৈনিক রণাঙ্গন থেকে পিছু হটে এসেছিল, তিনি তাদেরকে ঘুরপথে টিলার আড়ালে অপেক্ষারত অশ্বারোহী বাহিনীর নিকট নিয়ে এলেন। অশ্বারোহী বাহিনীর সদস্য ছিল মাত্র তিনশ’। তিনি পদাতিক ও অশ্বারোহী উভয় বাহিনীকে নির্দেশ দিলেন, তারা যেন অতি ক্ষিপ্রগতিতে টিলার আড়াল থেকে বের হয়ে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর পিছনের অংশে আক্রমণ চালায়।
