একেই বলে ভালোবাসা! একেই বলে প্রেম! সেই প্রেমের দাবি পূরণ করার জন্য হেনরি জীবনবাজি রাখতেও প্রস্তুত হয়ে গেল। সেই প্রেমের বলে বলিয়ান হয়ে সে তার প্রেমিকাকে কথা দিল, তার শ্লীলতা হরণকারী এক প্রতাপশালী বাদশাহর মাথা কেটে এনে তার পদতলে রাখবে।
হেনরি তার প্রেমের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য এক মুসলিম সৈনিকের বেশে জাহাজে চড়ে আন্দালুসিয়া এসে পৌঁছল। মুসলিম বাহিনী আন্দালুসিয়া পৌঁছার পর যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম বাঁধাঘাদার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লে সে সুযোগ বুঝে সেখান থেকে সরে পড়ে। তারপর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য সামনে অগ্রসর হয়।
তারিক বিন যিয়াদের বাহিনী রওনা হওয়ার পর থেকে ফ্লোরিডা প্রতিদিন নিয়মিত উপাসনালয়ে যেত, আর উপাসনা শেষে শুধু এই প্রার্থনাই করত, হে ঈশ্বর! মুসলমানরা যেন বিজয়ী হয়, আর হেনরি যেন রডারিকের কর্তিত মস্তক নিয়ে জীবিত ফিরে আসে।
***
আন্দালুসিয়ার বাহিনী একত্রিত হওয়ার সংবাদ পাওয়ামাত্রই তারিক বিন যিয়াদ তৎক্ষণাৎ তাঁর বাহিনীকে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি নিজে জাবালুতারিকের একটি উঁচু টিলার উপর উঠে গভীর দৃষ্টিতে চতুর্দিক পর্যবেক্ষণ করেন। সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তাঁর অনুসন্ধানী দৃষ্টি তড়িগতিতে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছিল।
তাঁর সাথে মুগীস আর-রুমী এবং অভিজ্ঞ সেনাপতি আবু যারু’আ তুরাইফ বিন মালেকও উপস্থিত ছিলেন। তারা নিজেদের পছন্দনীয় যুদ্ধ ক্ষেত্র নির্বাচনে ব্যস্ত ছিলেন। তারিক বিন যিয়াদ এমন একটি স্থানের প্রতি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যে স্থানটি উঁচু উঁচু টিলা এবং সবুজ গাছগাছালিতে আচ্ছাদিত ছিল।
‘সকল অশ্বারোহীকে টিলা ও গাছগাছালিতে আচ্ছাদিত ঐস্থানটিতে পাঠিয়ে দাও। তারিক তার অধীনস্থ সেনাপতিদেরকে বললেন। অশ্বারোহীদের কমান্ডারকে বলে দাও, সে যেন অশ্বারোহীদেরকে নিয়ে ইঙ্গিতের অপেক্ষায় থাকে।
তারিক তাঁর সেনাপতিদেরকে নিজ নিজ বাহিনী বিন্যস্ত করার নির্দেশনা দিয়ে নিচে চলে এলেন। যে সকল জেলে ও মাঝিদেরকে আটকে রাখা হয়েছিল তাদেরকে এই বলে ছেড়ে দেওয়া হল যে, তোমরা নিজ নিজ গৃহে চলে যাও, সেখান থেকে বের হয়ো না।’
তীরন্দাজ বাহিনীর কমান্ডারকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হল। ইতিমধ্যেই সংবাদ এলো, আন্দালুসিয়ার বাহিনী এসে গেছে। তারিক বিন যিয়াদ তাঁর সাথে কয়েক প্লাটুন সৈন্য নিয়ে সামনে অগ্রসর হলেন।
কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পর থিয়োডুমিরের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হল। নিরাপত্তারক্ষীরা থিয়োডুমিরকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রেখে ছিল। তারা উন্নতমানের রণপটু ঘোড়ায় চড়ে এসেছিল।
‘তোমরা কারা? কোত্থেকে এসেছো?’ থিয়োডুমির বুলন্দ আওয়াজে জানতে চাইল। এখানে কি জন্য এসেছ?
‘এই লোক কি বলছে?’ তারিক বিন যিয়াদ জিজ্ঞেস করলেন।
‘থামুন, ইবনে যিয়াদ!’ জুলিয়ান তারিক বিন যিয়াদকে বললেন। আমিই তার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি।’
জুলিয়ান তার ঘোড়া সামনে অগ্রসর করে বুলন্দ আওয়াজে বললেন, ‘জানতে চাচ্ছ, আমরা কে, কোত্থেকে এসেছি, আর কেন এসেছি? শুনে রাখ, আমরা আন্দালুসিয়া দখল করার জন্য এসেছি।’
‘নিমক হারাম!’ থিয়োডুমির হুঙ্কার ছেড়ে বলল। ‘তুই আমাদের করদ-রাজা হয়ে আমাদের রাজ্যে হামলা করতে এসেছিস। তুই কাদেরকে তোর সাথে করে এনেছিস। এরা তোর বাহিনী নয়। তুই ইতিপূর্বে এখানে এসে লুটতরাজ করেছিস। তাই তোর সাহস বেড়ে গেছে। ভেবেছিস, এবারও জান নিয়ে পালিয়ে যেতে পারবি। এখনও সুযোগ আছে, তোর এই নির্বোধ সৈন্যদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে যা। আমার বাহিনীর দিকে তাকিয়ে দেখ, তোর কাছে তো দেখছি, কোন অশ্বারোহীও নেই। আমার বাহিনী তোর বাহিনীর চেয়েও সংখ্যায় দ্বিগুণ।
তারিক বিন যিয়াদকে দোভাষীর মাধ্যমে জুলিয়ান ও থিয়োডুমিরের কথোপকথন তরজমা করে ওনানো হচ্ছিল। তারিক বিন যিয়াদ যুদ্ধের ডঙ্কা বাজাতে বললেন। যুদ্ধের ডঙ্কা বাজার সাথে সাথে তারিক তার বাহিনীকে হামলার নির্দেশ দিলেন।
থিয়োডুমির এই আত্মপ্রশান্তিতে নিমগ্ন ছিল যে, তার নিকট মুসলিম বাহিনীর তুলনায় দ্বিগুণ সৈন্য ও এক হাজার অশ্বারোহী আছে। মুসলিম পদাতিক বাহিনী নারায়ে তাকবীর বলে সামনে অগ্রসর হল।
থিয়োডুমির তার রক্ষী বাহিনীর সাথে পিছে হটে এলো। তার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কোন প্রয়োজন ছিল না। তার বিশ্বাস ছিল, বিজয় তার বাহিনীরই হবে। অপর দিকে তারিক বিন যিয়াদ আক্রমণকারী বাহিনীর সর্বাগ্রে ছিলেন। থিয়োডুমির তার এক হাজার অশ্বারোহীকে পদাতিক বাহিনীর পিছনে রেখে দিল।
উভয় বাহিনী সংঘর্ষে লিপ্ত হল। মুসলিম বাহিনীর জানা ছিল, এই যুদ্ধে তাদের জীবন-মরণের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। ফিরে যাওয়ার কোন উপায়ই তাদের নেই। তারা নিজ হাতে তাদের রণতরীগুলো জ্বালিয়ে দিয়েছে।
সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদের জ্বালাময়ী ভাষণ তাদের প্রাণে নতুন এক আশার সঞ্চার করেছিল। সৈন্যদের সকলেই ছিল উদ্দীপ্ত ও উৎসর্গিতপ্রাণ।
তারিক বিন যিয়াদ অল্প কিছু সৈন্য নিয়ে প্রচণ্ড বিক্রমে শত্রুপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি পিছু হটতে বাধ্য হলেন। তার অধীনস্থ কমান্ডারগণও পিছু হটতে লাগলেন।
