কে এই ব্যক্তির তারিক বিন যিয়াদ জুলিয়ানকে জিজ্ঞেস করলেন। কোন বার্বার সৈনিক তো মনে হচ্ছে না।’
‘এ আমার লোক। জুলিয়ান বললেন। তার নাম হেনরি।
জুলিয়ান হেনরিকে জিজ্ঞেস করলেন তুমি এখানে কীভাবে এলে? ‘আমি আপনাদের সাথে আসতে চাচ্ছিলাম, তাই মুসলমানদের পোশাক পরিধান করে সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। হেনরি বলল। পদাতিক বাহিনী ও অশ্বারোহীরা যখন জাহাজে আরোহণ করছিল তখন আমি সুযোগ বুঝে অশ্বারোহীদের জাহাজে উঠে পড়ি।
এখানে পৌঁছে দেখি, সৈনিকরা যার যার কাজে ব্যস্ত হয়ে আছে। এখানকার ফৌজ যে আমাদের পথ আগলে বসে আছে, সেদিকে কারো কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। এই এলাকা আমার পরিচিত। আমি এক পাহাড়ী ঝোঁপের আড়ালে আমার ঘোড়া রেখে সামনে অগ্রসর হই। কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পরই এখানকার ফৌজ আমার দৃষ্টিগোচর হয়। আমি এটা দেখতে চাচ্ছিলাম যে, এখানকার বাহিনী আমাদের আগমন সম্পর্কে অবগত আছে কি না?
***
এ বিষয়টি তারিক বিন যিয়াদের মতো জাদরেল সেনাপতির দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। তিনিও এখানকার বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাচ্ছিলেন। তাই তিনি এই এলাকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তত্ত্ব সংগ্রহ করছিলেন। কিছুক্ষণ পূর্বেই মুগীস আর-রুমী জেলে ও মাঝিদের থেকে এই অঞ্চলের নৌবাহিনী সম্পর্কে যে তত্ত্ব পেয়েছিল, তা তারিক বিন যিয়াদকে অবহিত করা হয়েছিল। তিনি হেনরির তত্ত্ব শুনে অত্যন্ত খুশি হয়ে তাকে মোবারকবাদ জানান।
এই সেই হেনরি যাকে ফ্লোরিডা মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত। সেও ফ্লোরিডাকে নিজের প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসত। ফ্লোরিডার বিরহ-বেদনা সইতে না পেরে সে টলেডো চলে গিয়েছিল। আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিক ফ্লোরিডার শ্লীলতাহানী করলে হেনরি শাহী আস্তাবলের ঘোড়া চুরি করে টুলেডো থেকে পালিয়ে যায়। তারপর সিউটা পৌঁছে ফ্লোরিডার বাবা জুলিয়ানকে সবকিছু খুলে বলে।
এই ঘটনার পর জুলিয়ানের আহ্বানে যৌথবাহিনী যখন আন্দালুসিয়ার মাটিতে পরীক্ষামূলক আক্রমণ চালায় তখন ফ্লোরিডাও সেই বাহিনীতে অংশগ্রহণ করে নিজ হাতে আপন শ্লীলতাহানীর প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল। কিন্তু জুলিয়ান তাকে অনুমতি দেয়নি। এরপর যখন তারিক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে আন্দালুসিয়া আক্রমণের জন্য মুসলিম বাহিনী প্রেরণ করা হয় তখন জুলিয়ান ও আউপাস মুসলিম বাহিনীর সাথে রওনা হন।
ফ্লোরিডা ভালো করেই জানত যে, জুলিয়ান কিছুতেই তাকে সাথে নিবেন না। উপায়ন্তর না দেখে সে হেনরিকে বলল, আমি মুসলিম বাহিনীর সাথে যেতে চাই।’
হেনরিকেও মুসলিম বাহিনীর সাথে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এই যুদ্ধে জুলিয়ানের বাহিনীর অংশগ্রহণ করার সুযোগ থাকলে হেনরিকে অনুমতি দেওয়া হতো। কারণ, তার বাবা ছিল শাহী আস্তাবলের বড় অফিসার।
‘তুমি আমাকে মুসলিম বাহিনীর পোশাক এনে দাও।’ ফ্লোরিডা হেনরিকে বলল। আমি সেই পোশাক পরে জাহাজে আরোহণ করব। আমি নিজ হাতে রডারিক থেকে প্রতিশোধ নেব।’
হেনরি তাকে বুঝাতে চেষ্টা করল, কিন্তু সে আরো বেশি উত্তেজিত হয়ে উঠল। হেনরি প্রমাদ গণলো। তার ধারণা হল, এই মেয়ে যা বলছে, তা করেই ছাড়বে।
‘ফ্লোরা!’ হেনরি তাকে বলল। উত্তেজিত হয়ো না। আমি তোমার মনের কথা বুঝতে পারছি। কিন্তু তুমি একরোখা চিন্তা করছ। অন্য দিকটি এখনও ভেবে দেখনি। তুমি কীভাবে মনে করলে যে, তুমি রডারিক পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে এবং নিজ হাতে তাকে হত্যা করতে সক্ষম হবে?’
‘আমি মুসলিম সেনাদের পোশাক পরে থাকব।’ ফ্লোরিডা বলল।
‘আবেগ নয়; বিবেক দিয়ে চিন্তা কর, ফ্লোরা! হেনরি বলল। তুমি কি ভেবে দেখেছ, যুদ্ধের ময়দানে তুমি আহত হতে পার, এমন কি নিহতও হতে পার। আর যদি তুমি জীবিত গ্রেফতার হও তাহলে তুমি নিজেই ভেবে দেখ, রডারিকের ফৌজ তোমার সাথে কী আচরণ করবে? তারাও তোমার সাথে রডারিকের মতোই আচরণ করবে। তখন তুমি কয়জন থেকে তোমার শ্লীলতাহানীর প্রতিশোধ নিবে?
ফ্লোরিডা কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে চুপ হয়ে গেল। মনে হল, সে বিষয়টি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে।
‘তা হলে এক কাজ কর হেনরি, তুমি নিজ হাতে রডারিককে হত্যা কর। আমি তোমার আমানত ছিলাম। সে তোমার আমানতের খেয়ানত করেছে। আমার সতীত্ব, আমার দেহ-মনের একমাত্র অধিকারী তুমি। চরিত্রহীন রডারিক আমার এই দেহকে অপবিত্র করেছে। আমার মনে প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে। বল হেনরি! তুমি আমার অশান্ত আত্মাকে শান্ত করবে?
‘হ্যাঁ করব, আমি তোমার মনের শান্তি ফিরিয়ে আনব ফ্লোরা, আমি অবশ্যই তোমার ইজ্জতের বদলা নেব।’
হেনরি ফ্লোরিডার হাত দুটি নিজের হাতে নিয়ে গভীরভাবে চুমো খেল। তারপর নিজের বুকের উপর ফ্লোরিডার হাত দুটি রেখে বলল। ‘তোমার ভালোবাসার কসম, রডারিকের মৃত্যু আমার হাতেই হবে।
‘কথা দাও, আমার জন্য আরেকটা কাজ করবে?’ ফ্লোরিডা মিনতিভরা কণ্ঠে বলল। “তুমি রডারিকের মাথা কেটে এখানে নিয়ে আসবে। আমি তার মাথা পাগলা কুকুরের সামনে নিক্ষেপ করব।’
‘কথা দিলাম, রডারিকের মাথা নিয়েই আমি ফিরে আসব।’ হেনরি বলল।
***
হায়রে প্রেম! হায়রে ভালোবাসা! রূপের রানী ফ্লোরিডা নির্দ্বিধায় এক শক্তিধর বাদশাহর প্রেম-প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করল। অপর দিকে তারই আস্তাবলের এক সাধারণ কর্মচারীকে তার হৃদয়মন্দিরে সাদরে গ্রহণ করল।
