বৃদ্ধের নিকট আরো কয়েকজন জেলে ও মাঝি এসে দাঁড়াল। তাদের মধ্য থেকে আরেক বৃদ্ধ সামনে অগ্রসর হয়ে বলল, তোমাকে এই নৌসেনাদের সরদার মনে হচ্ছে, তোমরা আমাদের ইজ্জত রক্ষা করার ওয়াদা করেছ, তাই আমরাও তোমাদেরকে স্থানীয় সৈন্যদের হাত থেকে রক্ষা করার ওয়াদা করছি। তোমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে, কেননা আমাদের ফৌজ এখান থেকে বেশি দূরে নয়।
বৃদ্ধ মুগীস আর-রুমীকে বলল, এই এলাকায় কয়েক জায়গায়ই ফৌজী চৌকী রয়েছে। সবচেয়ে নিকটতম চৌকী এখান থেকে ছয় মাইল দূরে। এটাই এখানকার জেনারেলের হেডকোয়াটার। এই এলাকার সকল চৌকী মিলে সৈন্যসংখ্যা আট-দশ হাজার হবে। এখানকার জেনারেলের নাম হল, থিয়োডুমির।
ঐতিহাসিকদের মতে এই জেনারেল ছিল অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ।
***
তারিক বিন যিয়াদ মনে করেছিলেন, আন্দালুসিয়ার বাহিনী তাদের আগমন সম্পর্কে অবগত হওয়ার পূর্বেই তিনি আচমকা তাদের উপর আক্রমণ করে তাদেরকে পর্যুদস্ত করে দেবেন। কিন্তু এটা ছিল তার একটা ভুল ধারণা। মুগীস যখন জেলে ও মাঝিদেরকে এই বলে সান্তনা-বাক্য শুনাচ্ছিলেন যে, তাদের নারীদের ইজ্জতের উপর হামলা করা হবে না, সেই সময় আন্দলুসিয়ার এক ফৌজী গুপ্তচর হাঁপাতে হাঁপাতে তাদের জেনারেল থিয়োডুমিরের নিকট এসে পৌঁছল। সে তাকে অত্যন্ত হতভম্ব কণ্ঠে সংবাদ দিল :
এইমাত্র আমি দেখে এসেছি, আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকতে চারটি বিশাল রণতরী থেকে এক বিশাল সৈন্যবাহিনী অবতরণ করেছে।
মুসলিম বাহিনীর জাহাজগুলো যখন সমুদ্রসৈকতে নোঙর করে তখন এক গুপ্তচর ক্যাপেলো নামক স্থানে এক পাহাড়ী চূড়ায় পাহারারত ছিল। এই গুপ্তচর থিয়োডুমিরের নিকট বিস্তারিত রিপোর্ট পেশ করল।
সে তাকে বলল, আমি দেখলাম, সিউটার দিক থেকে চারটি বিশাল রণতরী আমাদের সমুদ্রসৈকতে এসে নোঙর ফেলল। তারপর সৈন্য-সামন্ত, যুদ্ধ-রসদ ও ঘোড়া নামানো হলে তারা নিজেরাই নিজেদের রণতরীগুলোতে আগুন লাগিয়ে দিলো।
‘আগুন লাগিয়ে দিয়েছে?’ থিয়োডুমির হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
‘আমি নিজ চোখে জাহাজগুলো জ্বলতে দেখেছি।’ গুপ্তচর বলল। তারা সকলেই সৈনিক। তাদের সংখ্যা দশ হাজারের চেয়ে কিছু কম হবে।’
‘তাহলে তো তারা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর সৈনিক।’ থিয়োডুমির হতভম্ব হয়ে বলল। ‘মনে হয়, এই সৈনিকদের সকলেই উন্মাদ। একমাত্র উন্মাদরাই নিজেদের জাহাজে আগুন দিতে পারে।’
থিয়োডুমির তৎক্ষণাৎ কয়েকজন ঘোড়সওয়ারকে এই নির্দেশ দিয়ে চৌকীগুলোর উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিলো, যেন পদাতিক ও অশ্বারোহীসহ সকল বাহিনী তাদের যুদ্ধ-সামগ্রী ও রসদপত্র নিয়ে অতিসত্বর হেডকোয়ার্টারে একত্রিত হয়।
***
অল্প সময়ের মধ্যেই সকল বাহিনী হেডকোয়ার্টারে এসে একত্রিত হল। এদের সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় পনের হাজার। যুদ্ধ-রসদ ও অস্ত্রসস্ত্রের বিবেচনায় এই বাহিনী তারিক বিন যিয়াদের বাহিনীর তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল।
আন্দালুসিয়ার বাহিনীর সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল, তারা আপন দেশে অবস্থান করছে। সব সময় তাদের নিকট যুদ্ধ-রসদ ও সাহায্য পৌঁছা সম্ভব। তাছাড়া তাদের সকলের উর্ধাঙ্গ কঠিন লৌহবর্মে আবৃত ছিল।
তারিক বিন যিয়াদের সৈন্যসংখ্যা হল মাত্র সাত হাজার। অশ্বারোহী মাত্র তিনশ’। তাদের কেউই লৌহবর্ম পরিহিত নয়। তারিক বাহিনীর অস্ত্রসস্ত্রও হল পুরনো ও অনুন্নত। তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল, তারা শত্রুভূমিতে অবস্থান করছে, যেখানের প্রতিটি ধূলিকণা, আকাশ-বাতাস, এমনকি ছোট ছোট শিশুরাও তাদের শত্রু। কোথাও থেকে যুদ্ধ-রসদ পাওয়ার কোন সম্ভাবনাও তাদের নেই। সেনাসাহায্য পৌঁছাও অনেকটা অসম্ভব। কারণ, তাদের পিছনে বার মাইল বিস্তৃত সুবিশাল উত্তাল সমুদ্র।
তারিক বিন যিয়াদের সাথে অর্টিজার ভাই আউপাস এবং জুলিয়ানও এসেছিলেন। তারা উভয়েই গাইডের কাজ করছিলেন। আন্দালুসিয়ার প্রতিটি অলিগলি ছিল তাদের নখদর্পণে।
তারিক বিন যিয়াদ তাদেরকে নিকটে বসিয়ে জিজ্ঞেস করে জেনে নিচ্ছিলেন আন্দালুসিয়ার কোথায় কী আছে? কোথায় কোথায় দুর্গ আছে? এখান থেকে শহর কত দূর? এক শহর থেকে আরেক শহরের দূরত্ব কেমন? ইত্যাদি। আউপাস ও জুলিয়ান তাঁর প্রতিটি প্রশ্নের পুঙ্খানুপুঙ্খ উত্তর দিচ্ছিলেন।
‘আমাদের প্রথম সংঘর্ষ হবে সমুদ্রসৈকতের নৌসেনাদের সাথে। জুলিয়ান বললেন। আমাদের আক্রমণের পূর্বেই এই সৈনিকরা যদি সংঘবদ্ধ হয়ে যায় তাহলে আমাদের জন্য বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। তাদের সংখ্যা আমাদের চেয়ে বেশি; তাদের অস্ত্রসস্ত্রও উন্নত। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা আমাদের আগমনের সংবাদ পায়নি। আশা করি, আমরা প্রতিটি প্রতিরক্ষা চৌকী পৃথক পৃথকভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম হব।’
মুসলিম বাহিনী যুদ্ধ-জাহাজ থেকে অবতরণ করে সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম গোছগাছ করে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তারিক বিন যিয়াদ তাদেরকে বললেন, ‘এখানে অল্প সময়ের জন্য আমরা অবস্থান করব। তাঁবু টনানো হবে না।’
এমন সময় একজন অশ্বারোহী ঝড়ের বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে তারিক বিন যিয়াদের সামনে এসে ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরল। আগন্তুক দ্রুতপদে ঘোড়া থেকে নেমে তারিককে লক্ষ্য করে বলল,
‘এখনই প্রস্তুত হয়ে নিন। আগন্তক হাঁপাতে হাঁপাতে উচ্চস্বরে বলল। ‘আন্দালুসিয়ার বাহিনী আমাদের আগমন সম্পর্কে জেনে গেছে। প্রতিরক্ষা চৌকীগুলোর সৈন্যরা একত্রিত হচ্ছে, তারা আমাদের থেকে বেশি দূরে নয়, এখনই এখানে পৌঁছে যাবে।
