বসতির নারী-পুরুষ-শিশু-কিশোর সকলে মিলে আগুন লক্ষ্য করে ছুটতে লাগল। যে স্থানটিতে আগুন লেগে জাহাজগুলো জ্বলছিল, উৎসুক নারী-পুরুষ যখন সেখানে এসে পৌঁছলো তখন তারা স্বশস্ত্র সৈন্যদেরকে দেখে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারিক বিন যিয়াদ তখন সৈন্যদেরকে লক্ষ্য করে ভাষণ দিচ্ছিলেন।
আগুন দেখতে আসা উৎসুক লোকেরা যে জায়গায় ভিড় করছিল সেখানে মুগীস আর-রুমী তার বাহিনী নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মুগীস আর-রুমী তাঁর অশ্বারোহীদেরকে নির্দেশ দিলেন,
‘কৌতূহলী ও উৎসুক এই লোকদেরকে ঘিরে ফেলল। একটি শিশুও যেন পালিয়ে যেতে না পারে।’
অশ্বারোহী সৈন্যরা তৎক্ষণাৎ চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। কৌতূহলী লোকদের মধ্যে উঠতি বয়সের কিশোরী ও যুবতী মেয়েও ছিল। তারা হৈচৈ করে পালানোর চেষ্টা করল। শিশুরাও ভয়ে চিৎকার করতে লাগল। পুরুষরা নারী ও শিশুদেরকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করল। অশ্বারোহী সৈন্যরা তাদের সকলকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে এক পার্শ্বে নিয়ে একত্রিত করলো।
তারিক বিন যিয়াদের ভাষণ শেষ হলে মুগীস আর-রুমী ঘোড়া ছুটিয়ে তার নিকট এসে দাঁড়াল।
‘আমি জানি, তুমি তাদেরকে কেন আটকে রেখেছ। তারিক বিন যিয়াদ মুগীসকে বললেন। তাদেরকে ফিরে যেতে দিলে আন্দালুসিয়ার অধিবাসীরা আমাদের আগমন সম্পর্কে জেনে যাবে, কিন্তু আমরা তাদেরকে অজ্ঞতার মাঝে রাখতে চাই। তারা যেন আমাদের গতিবিধি সম্পর্কে কিছুই জানতে না পারে। তাদেরকে এখানেই আটকে রাখো। আমরা এই স্থান ছেড়ে অনেক দূর চলে যাওয়ার পর তাদেরকে ছাড়বে। শুন মুগীস, ভালোভাবে লক্ষ্য রাখবে, কোন নারীর সাথে যেন অসদাচরণ করা না হয়।’
‘ঠিক আছে, ইবনে যিয়াদ! মুগীস বললেন। তবে আমাদের সম্পর্কে এই গরীব-অসহায় লোকদের অন্তরে যে ভীতি জন্মেছে তা এখনই বিদূরিত করতে হবে। আপনি হয়তো জানেন না, এরা আন্দালুসিয়ায় কত বড় জুলুমের শিকার। আমি তাদের সাথে এমন আচরণ করব যে, তারা আমাদের সাহায্যকারী হয়ে যাবে। আমি তাদের থেকে জেনে নিতে পারব, এখানে আন্দালুসিয়ার বাহিনী কোথায় অবস্থান করছে।
মুগীস আর-রুমী একজন নওমুসলিম ছিলেন। তাঁর বাবা-মা ছিল ইহুদি। কয়েক বছর পূর্বে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তার স্বভাব-প্রকৃতি ইহুদিদের মতো ছিল না। ফেত্না সৃষ্টি করা, ষড়যন্ত্র পাকানো, ইবলিসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করাই হল ইহুদি স্বভাব-প্রকৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য।
মুগীস আর-রুমী হয়তো এজন্যই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন যে, তাঁর বিবেক ইহুদিবাদকে মেনে নিতে পারছিল না। তিনি মুসা বিন নুসাইরের ক্ষমতা গ্রহণের পূর্বেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তার মাঝে নেতৃত্ব প্রদানের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল।
ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণ থেকে জানা যায়, মুগীস আন্দালুসিয়ার অধিবাসী ছিলেন। সে সূত্রে জুলিয়ানের সাথে তার পরিচয় ছিল। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি সিউটা এসে বসবাস করতে থাকেন।
আগুন দেখতে আসা কৌতূহলী লোকদেরকে যেখানে আটকে রাখা হয়েছিল, মুগীস সেখানে ফিরে আসেন। তাঁকে দেখতে পেয়ে জেলেপাড়ার এক বৃদ্ধ সামনে অগ্রসর হল। বার্ধক্যজনিত রোগে বৃদ্ধের মাথা ও হাত কাঁপছিল।
বৃদ্ধ মুগীসের ঘোড়ার নিকটে এসে বলল, “হে ফৌজীদের সরদার, তোমরা যেই হওনা কেন, আর যেখান থেকেই আসনা কেন, আমাকে বলো, তোমরাও কি গরীবদের মান-সম্মানকে এতটাই তুচ্ছ মনে করো যেমন এদেশের ধনীরা তুচ্ছ মনে করে? আমি জানি, এখন তুমি নির্দেশ দেবে, পুরুষদেরকে বন্দী করতে, আর মেয়েদেরকে তাদের থেকে পৃথক করতে। তোমরা কি আমাদের উপর অনুগ্রহ করবে না? আমরা তো এজন্য দৌড়ে এসেছিলাম যে, তোমাদের জাহাজে আগুন লেগেছে, তোমাদের সাহায্যের প্রয়োজন।’
‘ভয় পেয়ো না, হে বৃদ্ধ! মুগীস বললেন। আমাদের জাহাজে আগুন লাগেনি, আমরা নিজেরাই আমাদের জাহাজে আগুন লাগিয়েছি।
‘তাহলে তো তোমাদেরকে আরো বেশি ভয় করা উচিত। বৃদ্ধ বলল। ‘তোমরা নিশ্চয় ডাকাত বা লুটেরা, অন্যের জাহাজ ডাকাতি করে এনে তাতে আগুন দিয়েছ। নিজেদের জাহাজে কি কখনও কেউ আগুন দেয়?
‘আমাদেরকে ডাকাত-লুটেরা, যা ইচ্ছা তাই বলতে পার।’ মুগীস বললেন। ‘কিন্তু আমি তোমাকে আশ্বাস দিচ্ছি, আমাদের কেউ তোমাদের মেয়েদের শরীরে হাত লাগাবে না।’
‘তোমাদের কথা আমরা বিশ্বাস করলাম। বৃদ্ধ বলল। কিন্তু আমরা এতটাই ভাগ্যহত যে, আমাদের ভাগ্য-বিড়ম্বনার কথা শুনলে হয়তো তোমরা আমাদের প্রতি অনুকম্পা দেখাবে। তাই বলছি, আমাদের মান-ইজ্জতের হেফাতকারী ফৌজই হল, আমাদের মান-ইজ্জত লুণ্ঠনকারী। আমাদের নিজ দেশের ফৌজ যখন এদিকে আসে তখন আমাদের যুবতী মেয়েদেরকে জোর-জবরদস্তী উঠিয়ে নিয়ে যায়। পরের দিন তাদেরকে ফিরত পাঠায়।
মুগীস আর-রুমী তাদেরকে আশ্বস্ত করার জন্য বললেন। এখন থেকে তোমাদের মান-সম্মান ও ইজ্জত-আবরু রক্ষা করা হবে।’
‘তাহলে অশ্বারোহীরা আমাদেরকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রেখেছে কেন?’ বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করল।
‘তোমরা যেন তোমাদের ফৌজকে এই সংবাদ দিতে না পার যে, অন্য দেশের ফৌজ তোমাদের দেশে প্রবেশ করেছে। তাই তোমাদেরকে আটকে রাখা হয়েছে। মুগীস বললেন। আমরা বেশ কিছু দূর অগ্রসর হলে তোমরা তোমাদের বাড়ি-ঘরে চলে যেও। নিকটে কোথাও তোমাদের ফৌজ আছে কি?
