এমন নির্দেশ একমাত্র সেই সেনাপতিই দিতে পারেন, যার মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটেছে। নাবিকরা অবাক হয়ে তাঁর দিকে চেয়ে রইল।
এবার তারিক আরেকটু উঁচু আওয়াজে তাঁর বাবার সৈন্যদের লক্ষ্য করে বললেন, হে বার্বার ভাইসকল, তোমরা জাহাজে আগুন লাগিয়ে দাও। আমরা এখান থেকে জীবন নিয়ে ফিরে যেতে চাই না।’
বাবার সিপাহীরা তার নির্দেশমতো সবগুলো জাহাজে আগুন লাগিয়ে দিল। আগুনের লেলিহান শিখা অতি দ্রুত সবগুলো জাহাজে ছড়িয়ে পড়ল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই জাহাজের পাল, মাস্তুল, কড়িকাঠ ও পাটাতন আগুনের গ্রীসে পরিণত হল। জ্বলন্ত কাষ্ঠখণ্ডগুলো সমুদ্রে ছিটকে পড়তে লাগল। ধোঁয়ায় আন্দালুসিয়ার আকাশ-সীমা আচ্ছাদিত হয়ে গেল।
তারিক বিন যিয়াদ জলদগম্ভীর কণ্ঠে লুঙ্কার দিলেন। গোটা বাহিনী তার প্রতি মনোনিবেশ করল। তিনি সকলকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও জ্বালাময়ী এক বক্তৃতা প্রদান করলেন। তার কণ্ঠ থেকে শব্দগুলো যেন বিদ্যুত্তরঙ্গের ন্যায় মর্মভেদী আওয়াজ তুলে ছিটকে পড়ছিল, আর সৈন্যদের মর্মমূলে আঘাত হেনে চলছিল।
তারিক বিন যিয়াদ নিজে ছিলেন বাবার বংশীয়, গোটা বাহিনীও ছিল বার্বার বংশোদ্ভূত, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি মাতৃভাষার পরিবর্তে আরবী ভাষায় এক ঐতিহাসিক জ্বালাময়ী ভাষণ প্রদান করেন। তাঁর সেই ভাষণ ইতিহাসের পাতায় আজও সংরক্ষিত রয়েছে; কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে।
তারিক বিন যিয়াদ তার ভাষণে বলেন :
‘প্রিয় নওজোয়ান বন্ধুগণ! এখন পিছে হটার বা রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে যাওয়ার আর কোন উপায় নেই। তোমাদের সামনে রয়েছে তোমাদের জানের দুশমন, আর তোমাদের পিছনে রয়েছে কূল-কিনারাহীন অথৈ সমুদ্র। সামনের দিকেও তোমাদের পালানোর কোন পথ নেই, পিছনের দিকেও কোন পথ নেই। এখন বাঁচতে হলে তোমাদের করণীয় হল, ধৈর্য, হিম্মত, আর অবিচলতার পরিচয় দেওয়া।
এই রাজ্যে তোমাদের দৃষ্টান্ত হল, কৃপণের দুয়ারে অনাথের আগমনের ন্যায়। এখানে কেউই তোমাদের সাহায্য করবে না। তোমাদের সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি, আর কাপুরুষতা তোমাদের নাম-নিশানা পর্যন্ত নিশ্চিহ্ন করে দেবে। তোমাদের শক্ত সংখ্যা তোমাদের চেয়ে অনেক বেশি। তাদের যুদ্ধাস্ত্র তোমাদের যুদ্ধাস্ত্রের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি।
শত্রুপক্ষের নিকট যুদ্ধ-রসদ পৌঁছার অনেক উপায় রয়েছে। আর তোমাদের যুদ্ধ-রসদ ফুরিয়ে গেলে নতুন যুদ্ধ-রসদ পাওয়ার কোন সম্ভাবনাও নেই।
যদি তোমরা সাহসিকতার পরিচয় না দাও তাহলে তোমাদের মান-সম্মান মাটির সাথে মিশে যাবে। তোমাদের শ্রেষ্ঠত্ব ভূলুণ্ঠিত হবে। তোমাদের মান-সম্মান তোমাদেরকেই অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। তোমাদের শৌর্য-বীর্য তোমাদেরকেই বজায় রাখতে হবে। শত্রুপক্ষকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে হবে। তাদের শক্তির ভিত্তিমূল ধসিয়ে দিতে হবে। প্রথম আঘাতেই তাদেরকে বিপর্যস্ত ও লণ্ডভণ্ড করে দিতে হবে।
আমি তোমাদেরকে এমন কোন বিষয় সম্পর্কে ভয় দেখাচ্ছি না, স্বয়ং আমি যার সম্মুখীন হবো না। তোমাদেরকে এমন কোন স্থানে লড়াই করার জন্যও উদ্বুদ্ধ করছি না, স্বয়ং আমি যেখানে লড়াই করব না। আমি সার্বক্ষণিক তোমাদের সাথেই থাকব। যদি তোমরা অটল-অবিচল থাকো তাহলে এই রাজ্যের ধন-দৌলত, মান-সম্মান তোমাদের পদচুম্বন করবে। যদি তোমরা সাময়িক কষ্টকে বরদাস্ত করো তাহলে এই রাজ্যের প্রতিটি বস্তু তোমাদের হবে।
আমিরুল মুমিনীন ওলিদ বিন আবদুল মালেক তোমাদের মতো নওজোয়ান বীরপুরুষদেরকে এক মহান কাজের জন্য নির্বাচন করেছেন। যদি তোমরা এই কাজে সফল হতে পার তাহলে তোমরা এখানের রাজ-রাজাদের জামাতা হতে পারবে। এখানকার অপরূপ রূপসী নারীদের স্বামী হতে পারবে। যদি তোমরা এই রাজ্যের শাহসওয়ারদেরকে রাজিত করতে পার তাহলে আল্লাহর দ্বীন ও রাসূলের আদর্শ এখানেও সমাদৃত হবে।
মনে রেখো, আমার কথা ভালোভাবে বুঝতে চেষ্টা করো, আমি তোমাদেরকে যেদিকে নিয়ে যাচ্ছি, সেদিকে গমনকারী সর্বপ্রথম ব্যক্তি আমি নিজেই। যুদ্ধের ময়দানে সর্বপ্রথম আমার তরবারিই কোষমুক্ত হবে।
এই যুদ্ধে আমি যদি শাহাদাত বরণ করি তাহলে তোমরা তোমাদের বিবেক-বুদ্ধি অনুযায়ী কাউকে সিপাহসালার বানিয়ে নিবে। তবে কোন পরিস্থিতিতেই আল্লাহর রাস্তায় জীবন কুরবান করা থেকে বিমুখ হবে না। যত দিন পর্যন্ত এই রাজ্য বিজিত না হবে তত দিন পর্যন্ত তোমরা হিম্মত হারা হয়ে দুঃখ-ভারাক্রান্ত মনে বসে থেকো না।’
৩. তারিক বিন যিয়াদের নির্দেশ
০৩.
তারিক বিন যিয়াদের নির্দেশে চারটি জাহাজের সবকটিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হল। প্রতিটি জাহাজই ছিল বিশাল আকৃতির। এ সকল জাহাজের মাধ্যমে সাত হাজার সৈন্য, বিপুল পরিমাণ যুদ্ধ-রসদ ও কয়েকশ’ ঘোড়া বহন করে নিয়ে আসা হয়েছিল।
এই বিশাল আকৃতির জাহাজগুলোতে আগুন লাগানোর সাথে সাথে আগুনের শিখা দাউ দাউ করে উপরে উঠতে লাগল। ধোঁয়ায় গোটা সীমান্ত আচ্ছন্ন হয়ে গেল।
যে স্থানটিতে যুদ্ধ-জাহাজগুলো জ্বলছিল তার অনতিদূরেই জেলেদের একটি গ্রাম ছিল। সমুদ্রসৈকতে ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশের দিকে উঠতে দেখে জেলেদের বসতিতে হৈচৈ পড়ে গেল, তারা একজন আরেকজনকে চিৎকার করে বলতে লাগল, ঐ দেখো, কোন বিদেশী বণিকের জাহাজে হয়তো আগুন লেগেছে। জলদি চলে, সবকিছু জ্বলে যাওয়ার পূর্বেই আমরা নিজেদের জন্য কিছু নিয়ে আসি।
