মিসর ও আফ্রিকার রাজধানী কায়রোয়ান। সেনাপতি নিযুক্ত হওয়ার সাথে সাথে রাজধানী কায়রোয়ানের অলিগলিতে তীর-ধনুক-বর্শাসহ নানা ধরনের যুদ্ধাস্ত্র তৈরির হিড়িক পড়ে গেল। সবচেয়ে বেশি বানানো হল, তীর ও হাতে নিক্ষেপযোগ্য বর্শা।
মুসা বিন নুসাইর নির্দেশ দিলেন, ‘তীর ও হাতে নিক্ষেপযোগ্য বর্শার এত বিপুল পরিমাণ মওজুদ গড়ে তুলো, যেন আন্দালুসিয়া থেকে এই পয়গাম না আসে–তীর ও বর্শা শেষ হয়ে গেছে। কারণ, আন্দালুসিয়া যেতে হলে সমুদ্র পাড়ি দিতে হবে। শত্রুপক্ষ আক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে রসদ সরবরাহের একমাত্র মাধ্যম সমুদ্রপথ বন্ধ করে দেবে। তখন কিছুতেই যুদ্ধাস্ত্র সরবাহ করা সম্ভব হবে না।’
তারিক বিন যিয়াদ তার অধীনস্থ সৈন্যদেরকে কঠোর ট্রেনিং-এর মাধ্যমে প্রস্তুত করতে লাগলেন। আন্দালুসিয়ার যে এলাকায় যুদ্ধ হবে সেখানকার ভৌগোলিক অবস্থা সম্পর্কে তিনি জুলিয়ানের নিকট জানতে চাইলেন। জুলিয়ান তাঁকে সেখানকার ভৌগোলিক অবস্থা সম্পর্কে সবিস্তারে অবহিত করলেন।
ভৌগোলিক দিক থেকে আন্দালুসিয়া উত্তর আফ্রিকার চেয়ে একেবারেই ভিন্ন রকম। দৃষ্টির শেষ সীমানা পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা সবুজের সমারোহ, আর সবুজ চাদরে ঢাকা উঁচু-নিচু পাহাড়ের সারি, খরস্রোতা নদী আর পাহাড়ী ঝর্নার নৈসর্গিক দৃশ্যে ভরা অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি আন্দালুসিয়া।
জুলিয়ানের তথ্য অনুযায়ী তারিক তার বাহিনীকে আন্দালুসিয়ার ভৌগোলিক অবস্থার অনুপাতে ট্রেনিং দিতে লাগলেন। অবশেষে এক দিন যুদ্ধে যাওয়ার দিনক্ষণ উপস্থিত হল। তারিক বিন যিয়াদকে যে বাহিনী দেওয়া হয়েছিল তার সৈন্যসংখ্যা ছিল মাত্র সাত হাজার। তাদের মধ্যে কয়েকশ অশ্বারোহীও ছিল। সাত হাজারের এই বাহিনীর সকল সদস্যই ছিল বার্বার সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত।
জুলিয়ান মুসলিম বাহিনীকে চারটি বড় বড় রণতরী প্রদান করেছিলেন। রণতরীর নাবিক ও ক্যাপ্টেনও তিনিই দিয়েছিলেন। এই রণতরীগুলো এত বড় ছিল যে, সাত হাজার সৈন্য, কয়েকশ ঘোড়া ও অন্যান্য যুদ্ধ-সামগ্রী অনায়াসেই তাতে বহন করা সম্ভব হয়েছিল।
রণাঙ্গনে রওনা হওয়ার পূর্বে তারিক বিন যিয়াদ বিদায়ী সাক্ষাতের জন্য মুসা বিন নুসাইরের নিকট এসে তাঁকে বললেন, ‘মুহতারাম আমীর! আপনার নিকট শুধু বিজয়ের সুসংবাদ পৌঁছবে।
‘ইবনে যিয়াদ! মুসা বললেন। ভুলে যেয়োনা শক্ৰসংখ্যা এক লক্ষেরও অধিক হতে পারে।’
‘আমাদের শক্ৰসংখ্যা যুদ্ধের ময়দান সর্বদা বেশিই হয়ে থাকে। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। আমি আপনাকে একটি সুসংবাদ দিতে চাই, আমি গতরাত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখেছি, তিনি আমাকে এই বলে সুসংবাদ দিয়েছেন, “হিম্মতহারা হয়ো না, নিজের প্রতি আস্থা রেখো, দায়িত্ব পালনে অবিচল থেকো; বিজয় তোমারদেরই হবে।”
তারিক বিন যিয়াদের এই স্বপ্নের কথা খ্রিস্টান ঐতিহাসিকগণও লেখেছেন। এ থেকে বুঝা যায়, এটা কোন মুসলিম ঐতিহাসিকের উর্বর মস্তিষ্ক প্রসূত কাল্পনিক কোন আবিষ্কার নয়।
***
৭১১ খ্রিস্টাব্দের ৯ই জুলাই-এর এক সুন্দর বিকাল। রণতরী রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত। সকল সৈনিক রণতরীতে উঠে নিজ নিজ অবস্থান বুঝে নিয়েছে। মুসলিম বাহিনীকে বিদায় জানাতে শত-সহস্র নারী-পুরুষ-শিশু-কিশোর সমুদ্রসৈকতে সমবেত হয়েছে। সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে তারা সকলে হাত উঠিয়ে মুসলিম বাহিনীর বিজয় কামনা করে দু’আ করে। দু’আ শেষে তারা তাকবির ধনীর মাধ্যমে মুসলিম বাহিনীকে বিদায়সম্ভাষণ জানায়।
তাদের মুহুর্মুহু তাকবির ধ্বনীতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠে। নিস্তরঙ্গ জলৰাশিতেও যেন উচ্ছ্বাসের ঢেউ লাগে। মুজাহিদগণ তাকবির বলতে বলতে ধীরে ধীরে নোঙর তুলে নেন। রণতরীর মাস্তুলে হাওয়া লেগে পাল ফুলে উঠে। ধীরে ধীরে জাহাজগুলো সমুদ্রসৈকত থেকে দূরে সরে যেতে থাকে।
মুসলিম বাহিনীকে বিদায় জানাতে আসা নর-নারীদের চোখ থেকে অঝোরে অশ্রু ঝরে পড়তে লাগল। তাদের মধ্যে কেউ হলেন সৈন্যদের মা-বাবা, কেউ স্ত্রী-কন্যা, আর কেউ আদরের ছোট ভাই-বোন।
এই সাত হাজার মুজাহিদের মধ্য থেকে কেউ হয়তো আর কোন দিন আন্দালুসিয়া থেকে ফিরে আসবেন না। আল্লাহর পয়গামকে সমুদ্রের ওপারে পৌঁছানোর জন্য জানের নাযরানা দিতে আজ তারা রওনা হয়েছেন, হয়তো তাঁরা আজীবনের জন্য দৃষ্টির আড়ালে চলে যাবেন। তাদের সাথে আর কোন দিন হয়তো আপনজনের দেখাও হবে না।
***
মুসলিম বাহিনীর যুদ্ধ-জাহাজ ‘ক্যাপেল’ নামক স্থানে সমুদ্র-তীরবর্তী একটি অঞ্চলে নোঙর করল। মুসলিম বাহিনী সেখানে অবতরণ করার পর সেই স্থানের নাম রাখা হল, জেলেটার বা জাবালুতারিক। সেই স্থানের নাম আজও অপরিবর্তীত আছে।
সকল সৈন্য জাহাজ থেকে নেমে আসলে তারিক বিন যিয়াদ তাদেরকে সামরিক শৃঙ্খলার সাথে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন। তিনি জাহাজের নাবিকদেরকে পৃথকভাবে দাঁড়াতে বলেন। তিনি একটি উঁচু স্থানে ঘোড়র উপর বসে ছিলেন। ঘোড়র উপর বসে থেকেই তিনি নাবিকদেরকে বললেন, ‘চারটি জাহাজের সব কটিতেই আগুন লাগিয়ে দাও।
নাবিকরা আশ্চর্য হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তিনি পুনরায় চিৎকার করে বললেন, ‘যুদ্ধজাহাজ থেকে সকল সৈন্য নেমে এসেছে। যুদ্ধ-রসদও নামিয়ে আনা হয়েছে। এখন আমাদের জাহাজের আর কোন প্রয়োজন নেই। সুতরাং তাতে আগুন লাগিয়ে দাও।’
