***
সেনাপতি নির্বাচন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বেশ কয়েকটি কারণে মুসা বিন নুসাইর সেনাপতি তুরাইফকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করতে চাচ্ছিলেন না। তন্মধ্যে একটি কারণ হল, বাহিনীর প্রায় একশ ভাগ সৈন্যই হল বার্বার। তাই মুসা বিন নুসাইরও চাচ্ছিলেন, প্রধান সেনাপতিও হবে বাবার সম্প্রদায়ভুক্ত। আরব সেনাপতি তার অধীনস্থ হবেন।
সে সময় বাবার সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে এমন কয়েকজন ব্যক্তির উন্মেষ ঘটেছিল, যারা রণাঙ্গণে নেতৃত্ব প্রদানের যোগ্যতা রাখতেন। তারা সকলেই নিজ
নিজ যোগ্যতা বলে কমান্ডারের পদবী অর্জন করেছিলেন। তাদের মধ্যে একজন। ছিলেন, তারিক বিন যিয়াদ।
প্রধান সেনাপতি নিযুক্তির ব্যাপারে মুসা বিন নুসাইর তন্ময় হয়ে ভাবছিলেন। তাঁর স্মৃতির পর্দায় অতীত দিনের ঘটনাগুলো মূর্ত হয়ে উঠছিল। তিনি যেন সবকিছু দেখতে পাচ্ছিলেন।
এই তো সে দিনের কথা। তখনও বেশিরভাগ বার্বার ইসলাম গ্রহণ করেনি। তারা আরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত ছিল। এই বার্বারদের সাথেই মুসা বিন নুসাইরকে অনেক লড়াই করতে হয়েছে। তিনি তাদের অন্তরে যেমন যুদ্ধের আতঙ্ক ছড়িয়ে ছিলেন, তেমনি প্রেম-ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধের অনুভূতিও সৃষ্টি করে ছিলেন। তিনি এক দিকে তাদের উপর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন, অপর দিকে বন্ধুত্বের সুনিবিড় বন্ধনে তাদেরকে আবদ্ধ করেছেন।
সে সময় অনেক বার্বারই মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয়। তাদের অনেককেই উচ্চপদস্থ মুসলিম কর্মকর্তাগণ গোলাম বা কর্মচারী হিসেবে নিজেদের কাছে রেখে দেন। মুসা বিন নুসাইরও এক বার্বার নওজোয়ানকে পছন্দ করেন। তিনি সেই নওজোয়ানকে নিজের কাছে রেখে দেন। সেই নওজোয়ান মুসা বিন নুসাইরের নিকট একজন গোলামের মতোই ছিল।
সেই গোলামের কথা শুনে, তার কাজ দেখে, মুসা বিন নুসাইরের মনে হল, এই গোলাম কোন মামুলী বংশের হতে পারে না। তার মাথার চুল ঈষৎ লাল। চেহারায় এক ধরনের ঔজ্জ্বল্য। এক দিন মুসা বিন নুসাইর তাকে তার বাব-দাদা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, সে ভাণ্ডাল’ বংশোদ্ভূত।
ভাণ্ডাল বংশ বার্বারদের মাঝে অন্যান্য বংশের তুলনায় বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিল। বংশগত কারণেই হয়তো এই গোলাম অত্যন্ত বিচক্ষণ, বুদ্ধিদীপ্ত ও অনন্য গুণাবলীর অধিকারী ছিল। ফৌজী কলা-কৌশল রপ্ত করার প্রতি তার বিশেষ ঝোঁক ছিল। ঘোড়সওয়ারিতেও সে ছিল অত্যন্ত দক্ষ। তীরন্দাজী ও তরবারী চালনায় তার কোন সমকক্ষ ছিল না। বার্বারদের বিদ্রোহী গোত্রগুলোকে দমন করার জন্য মুসা বিন নুসাইর যখন বের হতেন তখন সেও তার সাথে বের হতো। সিউটা অবরোধের সময়ও সে মুসার সাথে গিয়েছিল।
মুসা বিন নুসাইর লক্ষ্য করতেন, এই গোলাম শুধু তাঁর সেবাই করে না, বরং কখনও কখনও কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ রণকৌশল সম্পর্কেও সঠিক পরামর্শ দিয়ে থাকে। আরবী ভাষা সে আপন মাতৃভাষার মতোই শিখে নিয়েছিল।
রণ-পটুতার কারণে মুসা বিন নুসাইর মুসলিম ফৌজের মাঝে তাকে এক বিশেষ পদ প্রদান করেন। তার মাঝে নেতৃত্ব প্রদানের মতো তেজোদ্দীপ্ত কিছু গুণাবলী ছিল। মুসা বিন নুসাইর তাকে কোন এক রণাঙ্গনে পাঠিয়ে দিয়ে পরীক্ষা করেন। সে পরীক্ষায় কৃতকার্য হলে মুসা তার প্রতি খুশী হয়ে তাকে একটি বাহিনীর কমান্ডার বানিয়ে দেন। এর পর অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই সে আপন যোগ্যতা বলে সহকারী সেনাপতি পদে পদোন্নতি লাভ করে।
এই পর্যায়ে পৌঁছার অনেক পূর্বেই সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। মুসা তার নাম রাখেন তারিক, আর তার বাবার নাম যিয়াদ। তারিক বিন যিয়াদ।
তারিক বিন যিয়াদ এখন মুসলিম বাহিনীর এক সম্মানিত সেনাপতি। আন্দালুসিয়া আক্রমণের নেতৃত্ব প্রদান করার জন্য সেনাপতি নির্বাচনের প্রয়োজন দেখা দিলে বারবার মুসার দৃষ্টি এই আযাদকৃত গোলাম তারিক বিন যিয়াদের উপরই নিবদ্ধ হতে লাগল।
তাঁকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করার জন্য মুসা তার মাঝে যে বিশেষ বৈশিষ্ট্য প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তা হল তাঁর আপোষহীন নেতৃত্ব। তারিক বিন যিয়াদ রণাঙ্গনে শুধু সামনে এগিয়ে যেতেই অভ্যস্ত ছিলেন। পশ্চাৎপসারণ জাতীয় কোন শব্দের সাথে তাঁর কোন পরিচয় ছিল না।
***
হঠাৎ এক দিন মুসা তারিক বিন যিয়াদকে ডেকে বললেন, আন্দালুসিয়া আক্রমণের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তোমাকে নির্বাচন করা হয়েছে। মুসা তারিক বিন যিয়াদকে পরীক্ষা করার জন্য তাঁর সামনে আন্দালুসিয়ার ম্যাপ রেখে বললেন, এই হল আন্দালুসিয়া, তুমি কীভাবে এই রাজ্য আক্রমণ করবে, আমাকে বুঝিয়ে বল? মনে রেখো, তোমার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা বেশির চেয়ে বেশি সাত হাজার হবে। কমও হতে পারে, তবে বেশি হবে না।’
তারিক বিন যিয়াদ ম্যাপ ভাঁজ করে এক পার্শ্বে রেখে দিয়ে বললেন, ‘সম্মানিত আমীর! আমি এমন এক প্রতিশ্রুতি এবং এমন এক নীতিমালার উপর ভিত্তি করে আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকতে সৈন্যবাহিনীকে অবতীর্ন হতে বলব যে, তারা শুধু সামনেই অগ্রসর হবে, পিছে হটার কথা কেউ চিন্তাও করবে না। ‘বাঁচলে গাজী মরলে শহীদ’ এই হবে তাদের মূলমন্ত্র।
তারিক বিন যিয়াদের কথা শুনে মুসার বার্ধক্য পীড়িত অভিজ্ঞ ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসির রেখা ফুটে উঠল।
