***
সবুজ দ্বীপ থেকে ফিরে সেনাপতি তুরাইফ মুসা বিন নুসাইরের নিকট যুদ্ধ জয়ের পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি জুলিয়ান ও তার সৈন্যবাহিনী সম্পর্কে বলেন, ‘আমার বিশ্বাস জুলিয়ান আমাদেরকে ধোঁকা দিচ্ছে না। তার বাহিনীও অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেছে।’ তিনি আরো বলেন। ‘আন্দালুসিয়ার সৈন্যদের মাঝে যুদ্ধ করার স্পৃহা খুবই কম। তাদের নেতৃত্ব দানকারী কমান্ডারদের মাঝেও এমন কোন বিশেষত্ব নেই, যা আমাদেরকে পেরেশান করতে পারে।
মুসা বিন নুসাইর যুদ্ধ জয়ের রিপোর্ট শুনে আন্দালুসিয়ার চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য পরিপূর্ণ প্লান তৈরি করতে মনোনিবেশ করেন। এই সময় জুলিয়ান মুগীস আর-রুমী নামক এক নওমুসলিমকে সাথে নিয়ে মুসা বিন নুসাইরের সাথে। সাক্ষাৎ করতে আসেন।
জুলিয়ান মুসলিম বাহিনীর সাথে আন্দালুসিয়া যাওয়ার ইচ্ছায় এসেছিল। সে মুগীস আর-রুমীকেও সাথে নিয়ে যেতে চাচ্ছিল। কিন্তু মুসা বিন নুসাইর অনুমতি দিতে ইতস্তত করছিলেন।
জুলিয়ান কিছুটা বিরক্ত হয়ে অনুযোগের স্বরে বললেন, ‘মুসা! এখনও কি আমার প্রতি আপনার বিশ্বাস জন্মেনি? আমি এমনটিই সন্দেহ করছিলাম। আপনাদের আস্থা অর্জন করার জন্য আমি আরেকটি উপায় সাথে করে এনেছি।’
এ কথা বলেই জুলিয়ান দরবার থেকে বের হয়ে গেলেন। সিউটা থেকে তার বেশ বড় একটি কাফেলা এসেছিল। সেই কাফেলায় তার অধীনস্থ কর্মচারী, দেহরক্ষী সেনাকর্মকর্তা ও উপদেষ্টাবৃন্দ ছিলেন। তাদের সাথে রাজবংশের মহিলারাও ছিল।
জুলিয়ান পুনরায় যখন দরবারে প্রবেশ করলেন তখন তার সাথে অনিন্দ্য সুন্দর দু’টি মেয়ে ছিল। তারা ছিল অসাধারণ রূপসী, আর মোহনীয় দেহ-সৌষ্ঠবের অধিকারিনী।
জুলিয়ান দরবারে প্রবেশ করেই বললেন, এরা আমার মেয়ে। এই হল ফ্লোরিডা, আর এ হল তার বোন মেরী। মুসা! আমি এই দুজনকে আপনার নিকট পণবন্দী হিসেবে অর্পণ করতে চাই। এরাই হল আমার মান ও সম্মান। ফ্লোরিডা আমার সেই মেয়ে, যার জন্য আমি আমার এক ক্ষমতাধর পুরাতন দোস্তকে দুশমন, আর এক পুরাতন দুশমনকে দোস্ত বানিয়েছি।
আপনি দেখেছন, আমি আমার আত্মমর্যাদা হারিয়ে কতটা উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলাম। বিরাট ক্ষমতাধর এক বাদশাহর রাজত্বে আক্রমণ করে আমি নিজের জন্য কত বড় বিপদ ডেকে এনেছি। তারপরও আমি ক্ষান্ত হয়নি। তোমার বাহিনীর সাথে আমার নিজের বাহিনীকে পাঠিয়ে ছিলাম তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ দখল করার জন্য। মুসা বিন নুসাইর! আজ আমি আমার সেই ইজ্জত আপনার হাতে পণ হিসেবে তুলে দিচ্ছি। আমি অথবা মুগীস যদি আপনাদেরকে সামান্য ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করি, তাহলে আমার মেয়েদেরকে দাসী বানিয়ে নিবেন অথবা হিংস্র বার্বারদের হাতে ছেড়ে দেবেন।’
কোন ঐতিহাসিকই এই বিষয়টি স্পষ্ট করে লেখেননি যে, মুসা বিন নুসাইর জুলিয়ানের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, নাকি তাদের মাঝে অন্য কোন কথা হয়েছিল? ঐতিহাসিকগণ শুধু এতটুকুই লেখেছেন যে, জুলিয়ান পণ হিসেবে তার দুই মেয়েকে মুসলমানদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। হয়তো মুসা বিন নুসাইর তার সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।
জুলিয়ান দ্বিতীয় যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তা হল সে তার পূর্ণ বাহিনী মুসলিম বাহিনীর সাথে আন্দালুসিয়া পাঠাবেন। মুসা বিন নুসাইর তার এই প্রস্তাব দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে প্রত্যাখ্যান করেন। তবে তিনি জুলিয়ানের নিকট এতটুকু সহযোগিতার আশা পোষণ করেন যে, মুসলিম বাহিনীর কাছে যুদ্ধ-রসদ প্রেরণ করার ক্ষেত্রে সিউটা ট্রানজিট সুবিধা প্রদান করবে। সেই সাথে মুসলিম বাহিনী আন্দালুসিয়া যাওয়া-আসার পথে সিউটার দুর্গে থাকা-খাওয়াসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাবে।
সবশেষে জুলিয়ানের নিকট এই প্রস্তাব দেওয়া হয় যে, আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকত পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য রণতরীর ব্যবস্থা যেন জুলিয়ান করে দেন।
জুলিয়ান সব ধরনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। তিনি এই আশ্বাসও দেন যে, তার বাহিনী সর্বদা সাহায্যের জন্য প্রস্তুত থাকবে।
মুসা বিন নুসাইর সেই দিনই খলীফা ওলিদ বিন আবদুল মালেকের নামে একটি পয়গাম লেখে একজন কাসেদকে দামেস্ক পাঠিয়ে দেন। খলীফা পূর্বেই আন্দালুসিয়া আক্রমণের অনুমতি দিয়েছিলেন; কিন্তু মুসা বিন নুসাইর ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দূরদর্শী। তিনি সার্বিক পরিস্থিতি উল্লেখ করার পর লেখেন :
‘আন্দালুসিয়া আক্রমণের জন্য পুনরায় অনুমতি নেওয়া আমার নিকট সময়ের অপচয় ব্যতীত আর কিছুই মনে হয় না, কিন্তু আপনি হিন্দুস্তানে সৈন্য প্রেরণ করেছেন। তাদের প্রয়োজন হয়তো এমন কোন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে, যার কারণে আপনি আমাকে আন্দালুসিয়ার মিশন মুলতবী করার নির্দেশ দিতে পারেন। অথবা উভয় রণাঙ্গনে সমানতালে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে যে, উভয় রণক্ষেত্রেই মুসলিম বাহিনী দুর্বল হয়ে যেতে পারে অথবা একটিতে দুর্বল হয়ে যেতে পারে…। তাই অধীনের পক্ষ থেকে আরয এই যে, মহামান্য খলীফা বিষয়টির গভীরতা চিন্তা করে দেখবেন।’ খলীফার পক্ষ থেকে অত্যন্ত উৎসাহব্যাঞ্জক উত্তর আসে। তিনি লেখেন :
‘আল্লাহর নাম নিয়ে সকল প্রস্তুতি পূর্ণ করো এবং যথা সম্ভব দ্রুত রণাঙ্গনের উদ্দেশ্যে সৈন্য পাঠিয়ে দাও। তবে খুব ভেবে-চিন্তে সেনাপতি নির্বাচন করবে।’
