মনে রেখো! আপন ইজ্জতের জন্য বীরপুরুষ নিজের জান কুরবান করতে পারে, কিন্তু অন্যকে ধোকা দিতে পারে না। তোমরা একজন ধোকাবাজ থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য যাচ্ছ। সেই ধোঁকাবাজ হল, আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিক। তোমাদেরকে প্রথমেই বলা হয়েছে, রডারিক হল আমাদের দুশমন। তোমরা তার উপর একবার আক্রমণ করেছ। আমি তোমাদেরকে শুধু একটি কথার উপরই বেশি গুরুত্ব দিতে বলব, তা হল মুসলমানরা যেন এটা মনে না করে যে, তোমরা ভীরু, কাপুরুষ। তোমরা ধোকাবাজ।”
***
জুলাই ৭১০ খ্রিস্টাব্দের কোন এক রাত্রির শেষ প্রহর। সুবহে সাদেকের আলো-আঁধারে মুসা বিন নুসাইর ও জুলিয়ানের সম্মিলিত বাহিনী কয়েকটি বিশাল আকৃতির রণতরীতে আরোহণ করল। ঐতিহাসিক সন্ধিপত্রে জুলিয়ানের বাহিনীর কোন সংখ্যা লেখা হয়নি, তবে মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা ছিল, চারশ পদাতিক, আর একশ অশ্বারোহী।
এগোসিরাস আয়তনের দিক থেকে ছোট্ট একটি দ্বীপ। গুপ্তচরের মাধ্যমে পূর্বেই সেখানকার যাবতীয় সামরিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেখানে আন্দালুসিয়ার সৈন্যসংখ্যা কত? কোথায় কোথায় প্রতিরক্ষা চৌকি আছে–এসব সম্পর্কে সম্মিলিত বাহিনী পূর্ব থেকেই অবহিত ছিল।
সম্মিলিত বাহিনী এমন এক স্থানে তাদের যুদ্ধ-জাহাজ নোঙর করল, যে স্থানটি গাছগাছালিতে আচ্ছাদিত হয়ে আছে। তার চতুর্পাশে বহু দূর পর্যন্ত বড় বড় পাথরের টিলা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এসব উঁচু উঁচু টিলার কারণে সেনাচৌকি থেকে সমুদ্র তীরের এই স্থানটি ভালো করে দেখা যায় না। এই স্থানটিতেই সম্মিলিত বাহিনীর সৈন্যরা অবতরণ করল।
সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও সম্মিলিত বাহিনী তাদের অবস্থান গোপন রাখতে সক্ষম হল না। সম্মিলিত বাহিনীর রণতরীগুলো যখন যুদ্ধ সাজে সজ্জিত হয়ে খোলা সমুদ্রে দ্বীপটির দিকে এগিয়ে আসছিল তখন বহু দূর থেকেই সেই দৃশ্য দ্বীপবাসীদের দৃষ্টি গোচর হয়েছিল।
রণতরী সমুদ্র তীরে নোঙর করার সাথে সাথে ঘোড়াগুলো নিচে নামানো হল। পদাতিক বাহিনীও নিচে নেমে এলো; কিন্তু অশ্বারোহীরা তখনও ঘোড়ায় চড়ে বসেনি। পদাতিক বাহিনীও সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য কোন রকম প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি। এমন সময় আচমকা টিলার পিছন থেকে তাদেরকে লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি তীর বৃষ্টি শুরু হল।
আন্দালুসিয়ার তীরন্দাজ বাহিনী পূর্ব থেকেই গাছের পিছনে ও ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে ওঁত পেতে ছিল। মাত্র কয়েকদিন আগে আন্দালুসিয়ার সমুদ্রতীরবর্তী একটি এলাকা জুলিয়ানের বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। একারণে সীমান্ত এলাকা ও সমুদ্রতীরবর্তী দ্বীপাঞ্চলগুলোতে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। টহলদার বাহিনী পূর্ব থেকেই প্রস্তুত হয়েছিল।
তীরের আঘাত থেকে বাঁচার জন্য যে সকল অশ্বারোহী এদিক-সেদিক ছড়িয়ে পড়েছিল। সেনাপতি তুরাই তাদেরকে হুকুম দিলেন, তারা যেন তীরবৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষা করে চতুর্দিক থেকে টিলাগুলো ঘিরে ফেলে।
পদাতিক বাহিনী প্রথমেই এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। অধিকাংশ সৈন্য পিছে হটে সমুদ্রের দিকে চলে এসেছিল। অনেকে রণতরীতে গিয়ে আত্মগোপন করেছিল। সম্মুখভাগে শুধু আহত সৈনিকরাই প্রাণপণে লড়ে যাচ্ছিল।
জুলিয়ান-বাহিনীর কমান্ডার আউপাস এদিক-সেদিক ছুটোছুটি করে নিজ বাহিনীকে একত্রিত করে নির্দেশ দিচ্ছিল। তার সিপাহীরা নির্দেশ পাওয়ামাত্র টিলা লক্ষ্য করে ছুটতে লাগল।
আন্দালুসিয়ার তীরন্দাজরা সমুদ্রতীরের হানাদার সিপাহীদের লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি তীর নিক্ষেপ করছিল। আউপাসের সৈন্যরা অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিল। তারা ডানে-বাঁয়ে ও পিছনে ছড়িয়ে পড়ে টিলা, গাছপালা ও ঝোঁপঝাড়ের আড়াল খুঁজতে লাগল। ফলে তীরন্দাজদের তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে লাগল।
আউপাস পিছন দিক থেকে সিপাহীদেরকে উত্তেজিত করছিল। সিপাহীরাও অসম সাহসিকতার সাথে তীরবৃষ্টি উপেক্ষা করে টিলার উপর চড়তে শুরু করল।
সেনাপতি তুরাইফ আউপাসের সিপাহীদের নির্ভীক সাহসিকতা দেখে নিজ বাহিনীর তীরন্দাজদের নির্দেশ দিলেন, তারা যেন টিলার নিচের গাছগুলোতে আরোহণ করে প্রতিপক্ষের তীরন্দাজদের নিশানা বানায়। নির্দেশমতো গাছে আরোহণ করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের তীরের আঘাতে কয়েকজন মুসলিম তীরন্দাজ আহত হলেও অন্যরা গাছে আরোহণ করতে সক্ষম হল। তারা গাছে আরোহণ করে টিলার পিছনে অবস্থানরত আন্দালুসিয়ার তীরন্দাজদের লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়তে লাগল। উপায়ন্তর না দেখে আন্দালুসিয়ার তীরন্দাজরা পিছে হটতে বাধ্য হল।
মুসলিম অশ্বারোহীরা টিলাগুলো পূর্বেই ঘেরাও করে নিয়েছিল। প্রতিপক্ষের কোন তীরন্দাজই সেখান থেকে প্রাণ নিয়ে পালাতে পারল না। আন্দালুসিয়ার সৈন্যরা আক্রমণকারী সৈন্যদেরকে প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত ছিল। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরে সেনাপতি তুরাইফ তার অশ্বারোহীদেরকে টিলার পিছনে আত্মগোপন করে থাকতে বললেন। তিনি কমান্ডারদেরকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিলেন।
উভয় বাহিনী মুখোমুখি যুদ্ধে অবতীর্ণ হল। আন্দালুসিয়ার বাহিনী খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পিঠটান দিতে বাধ্য হল। সেনাপতি তুরাইফ আত্মগোপন করে থাকা অশ্বারোহীদেরকে পলায়মান সৈন্যদের পিছু ধাওয়া করার ইঙ্গিত দিলেন। অশ্বারোহীরা টিলার পিছন থেকে বের হয়ে অত্যন্ত ক্ষিপ্র গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে পলায়নরত বাহিনীকে ধরে ফেলল। আন্দালুসিয়ার বাহিনী এমন হঠাৎ আক্রমণের আশঙ্কা করেনি। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে এদিক-সেদিক ছুটোছুটি করতে শুরু করল। মুসলিম বাহিনী তাদের উপর চূড়ান্ত আঘাত হানতে লাগল। শত্রুপক্ষ ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের শিকার হল। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। বিজিত বাহিনী এই দ্বীপের নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম রাখল আল-খাযরা বা সবুজ দ্বীপ।
