কেবলমাত্র মুসলমানদের পক্ষ থেকেই ভয় ছিল। এই সম্ভাবনাও ছিল যে, তারা সিউটার রাস্তা ত্যাগ করে বহু দূরের সমুদ্র তীর ঘুরে এসে আক্রমণ করতে পারে কিন্তু আরবদের ব্যাপারে এটা প্রসিদ্ধ ছিল যে, তারা রণতরী পরিচালনায় অনভিজ্ঞ। সামুদ্রিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও তাদের নেই। বাস্তবতাও ছিল তাই। আরবদের তখন পর্যন্ত নৌযুদ্ধের কোন সুযোগই আসেনি। এটাই ইসলামের প্রথম নৌযুদ্ধের ঘটনা।
আন্দালুসিয়ায় সীমান্তরক্ষীবাহিনী শত্রুর আক্রমণ সম্পর্ক একেবারেই বেখবর ছিল। তারা সব ধরনের বিপদ থেকে নিশ্চিন্ত ছিল। পূর্ব নির্দেশ অনুযায়ী জুলিয়ানের সৈন্যবাহিনী নিঃশব্দে রণতরী থেকে নেমে তীরে উঠে এলো। কমান্ডার আউপাস আগে থেকেই জানত, কোথায় কোথায় সীমান্তরক্ষা চৌকী আছে। সে তার অধীনস্থ বাহিনীকে সেসকল চৌকিতে দ্রুত আক্রমণের নির্দেশ দিল।
নৈশ প্রহরীরা শুধু দেখতে পেল, কিছু ছায়ামূর্তি তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। ব্যাস, এ পর্যন্তই। কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই তাদের উপর কেয়ামত সংঘটিত হয়েগেল। চৌকিতে গভীর ঘুমে অচেতন সিপাহীদের জাগ্রত হওয়ার সুযোগই হল না। তারা বেঘোরে মারা পড়ল।
প্রতিরক্ষা চৌকীগুলো একটির চেয়ে আরেকটি বেশ দূরে অবস্থিত ছিল। সুবহে সাদেক উদিত হওয়ার পূর্বেই প্রতিটি চৌকিতে আক্রমণ করে সিপাহীদের হত্যা করা হল। তাদের মাঝে এমন কেউ ছিল না, যে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গিয়ে কোন বড় শহরে পৌঁছে এই সংবাদ দেবে যে, আন্দালুসিয়া শত্রুসেনা দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে।
ভোরের আলো ফুটার সাথে সাথে জুলিয়ানের বাহিনী আশ-পাশের আরো দুই-তিনটি শহরে আক্রমণ করে বসল। তারা সেখানে লুটতরাজ, খুন-খারাবী ও ত্রাস সৃষ্টি করল। সৈন্যদের প্রতি জুলিয়ানের নির্দেশ ছিল–কোন গির্জা যেন অক্ষত না থাকে। তার নির্দেশ অনুযায়ী সৈন্যরা কয়েকটি গির্জা ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিল। আর কয়েকটিতে আগুন লাগিয়ে দিল।
সন্ধ্যা পর্যন্ত সিউটার সৈন্যবাহিনী এই ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত রাখল। তাদের সামনে কোন সুন্দরী যুবতী মেয়ে এসে পড়লে তাকেও তারা উঠিয়ে নিত। জুলিয়ান তাদেরকে আরো নির্দেশ দিয়েছিল যে, হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞের সময় এই ঘোষণা করতে হবে যে, এটা সিউটার বাহিনী। তাই হানাদার বাহিনী নিজেদেরকে সিউটার বাহিনী বলে পরিচয় দিচ্ছিল, আর রক্তের হোলী খেলায় মেতে উঠছিল।
সিউটার হানাদার বাহিনীর অতর্কিত হামলায় আন্দালুসিয়ার সমুদ্রতীরবর্তী কয়েকটি শহর একেবারে বিপর্যস্ত ও লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। সারা দিনের লুটতরাজ আর হত্যাযজ্ঞ শেষে সিউটা-বাহিনী যেমন আকস্মিকভাবে আক্রমণ করে ছিল তেমনি আকস্মিকভাবে রণতরীতে চেপে আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকত ত্যাগ করে সিউটার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল।
হানাদার বাহিনী সিউটায় ফিরে এলে জুলিয়ান মুসলিম সেনাপতি তুরাইফকে জিজ্ঞেস করলেন, এখন কি আপনাদের এই সন্দেহ দূর হয়েছে যে, আমি রডারিককে জানের দুশমন মনে করি?
জুলিয়ান মুসলিম সেনাপতিকে বললেন, হে মুসলিম সেনাপতি! অবশ্যই আপনি বুঝতে পারছেন, আমি নিজের জন্য এক বিপদজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছি। এখন রডারিক সিউটায় পাল্টা হামলা করবে।’
‘তার হামলা করা উচিত। সেনাপতি তুরাইফ বললেন। সে এটা কীভাবে বরদাশত করবে যে, তার অধীন সামান্য এক করদ-রাজা তার রাজ্যে এসে তার বাহিনীর নওজোয়ানদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। তার অধীনস্থ প্রজাদের ঘর লুণ্ঠন করেছে, গ্রামের পর গ্রাম ভস্মিভূত করেছে।
তবে কাউন্ট জুলিয়ান, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আমরা কখনই আপনাকে একা ছেড়ে দেব না। আমার এই বাহিনী এখন থেকে এখানেই থাকবে। তারা সদা সতর্ক থাকবে। আপনি এখনই আমাদের আমীর মুসা বিন নুসাইরের নিকট চলে যান। আপনি তার সাথে বন্ধুত্বের চুক্তি করুন। আর এই চুক্তির সংবাদ আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিকের নিকট পৌঁছে দিন।’
মুসলিম সেনাপতির পরামর্শ অনুযায়ী সেই দিনই জুলিয়ান মুসার সাথে বন্ধুত্বের চুক্তি সম্পাদন করার জন্য রওনা হয়ে গেলেন।
***
প্রথম থেকেই মুসার এই ধারণা ছিল যে, জুলিয়ান তাঁকে ধোকা দিচ্ছে না। তথাপি তিনি তার এই ধারণাকে বিশ্বাসে রূপান্তরিত করতে চাচ্ছিলেন। তাই তিনি সম্মিলিত বাহিনীর মাধ্যমে আন্দালুসিয়ার সমুদ্রতীরবর্তী আরেকটি দ্বীপশহর–এগোসিস আক্রমণের প্লান তৈরি করেন। এই সম্মিলিত বাহিনীর আক্রমণ দ্বারা মুসা বিন নুসাইর বুঝতে চেষ্টা করছিলেন, জুলিয়ান ও তার বাহিনীর উপর কতটা নির্ভর করা যায়। সেই সাথে তিনি এটাও পরখ করতে চাচ্ছিলেন, আন্দালুসিয়ার বাহিনী কতটা রণ-নিপুন। তাদের কমান্ডারইবা কতটা যুদ্ধ-পারদর্শী।
মুসা বিন নুসাইর আবু যারু’আ তুরাইফ বিন মালেক আল-মু’আফেরীকে সম্মিলিত বাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত করেন। বাহিনী রওনা হওয়ার পূর্বে মুসা বিন নুসাইর সেনাপতিকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘ইবনে মালেক, খুব সতর্ক থেকো, চারদিকে চোখ-কান খোলা রেখো। তোমার অধীনস্থ সালারদেকেও সতর্ক থাকতে বললো। তোমরা জুলিয়ানের বাহিনীর কমান্ডারদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখবে। লক্ষ্য করবে, তারা আমাদেরকে ধোঁকা তো দিচ্ছে না? এটাও খেয়াল করতে হবে যে, তারা সাহসী না ভীরু।
আমি জুলিয়ানকে বলতে শুনেছি, সে তার কমান্ডারদেরকে বলছিল, “তোমরা মুসলমানদেরকে এ কথা বলার সুযোগ দেবে না যে, জুলিয়ানের বাহিনী ভীরু, কাপুরুষ। তোমরা এমন কোন আচরণও করবে না, যার কারণে মুসলমানদের এই সন্দেহ হয় যে, আমরা তাদেরকে ধোঁকা দিচ্ছি। মুসলমানদের আমীরের মনে এখনও আমাদের প্রতি পুরোপুরি বিশ্বাস জন্মেনি।
