‘তুমি কি তোমার স্বামীকে বলবে, তাদেরকে ক্ষমা করে দিতে। পাদ্রি বলল।
‘না, ফাদার!’ এজেলুনা বলল। আমার স্বামী কাউকে ক্ষমা করবেন না। আমার স্বামীর অবস্থা হল এমন যে, তার কাছে কেউ যদি কারও নাম পেশ করে তাহলে তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে তার উপর এমন নির্যাতন করা হয় যে, দুই-তিন দিনের মধ্যে সে মারা যায়। কেউ যদি না মরে তাহলে তাকে হত্যা করা হয়। আমি এমন ব্যবস্থা করে রেখেছি যে, সকলকে এখান থেকে বের করে দিতে পারব। আপনি হয়তো দেখেছেন যে, শহরের একটি মাত্র ফটক খোলা আছে। যারা বাইরে যেতে চায় তাদের সকলের ব্যাপারে ভালোভাবে খোঁজ-খবর নেওয়া হয়। আমি এসকল লোকদেরকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় এখান থেকে বের হতে সাহায্য করব।’
‘সবার আগে আমাকে এখান থেকে বের কর। পাদ্রি বলল। “এ গির্জাই হল, বিদ্রোহের প্রধান ঘাটি।
‘আমি এটা জানি।’ এজেলুনা মিথ্যা বানিয়ে বলল। আমি এই ঘাটিকে বহাল রাখতে চাই। আমার ব্যাপারে আপনার বিশ্বাস থাকা উচিত যে, আমি সালার আবদুল আযীযকে শুধু এজন্য বিয়ে করেছি, যাতে ইসলামী সালতানাতকে অন্তঃসারশূন্য করে চিরতরে খতম করে দিতে পারি। আমি এটা কীভাবে করব, সে প্রশ্ন আমাকে করবেন না। শুধু এতটুকু বলছি যে, আমি আমার শ্বশুরকে আমার রূপের মোহে আবদ্ধ করে তার সাথে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তুলব। তারপর আমি এমন নাটক শুরু করব যে, বাপ-বেটা একজন আরেকজনের খুনপিয়াসী হয়ে যাবে।
‘তোমার প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। পাদ্রি বলল।
এজেলুনা তার রূপ-যৌবনের মোহজালে আর মিষ্টি কথার মাধুর্যে পাদ্রিকে একেবারে অভিভূত কলে ফেলল।
‘এ বিদ্রোহের নেতৃত্ব যদি তুমি তোমার হাতে তুলে নাও তাহলে আশা করা যায় আমরা কামিয়াব হতে পারব।’ পাদ্রি বলল।
‘আমরা অবশ্যই কামিয়াব হব।’ এজেলুনা বলল। আমাদেরকে অবশ্যই কামিয়াব হতে হবে। যদি আমরা কামিয়াব হতে না পারি তাহলে আমি জানি, খ্রিস্টবাদ ও আমাদের পরণতি কী হবে? আপনার মিশনে যারা রয়েছে, তাদের সাথে আমার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিন। তারা কি আগামীকাল এ সময় এখানে আসতে পারবে?
‘তারা সকলে এসে পড়বে। পাদ্রি বলল।
‘আমিও আসব।’ এ কথা বলেই এজেলুনা উঠে দাঁড়াল। পাদ্রিও উঠে দাঁড়াল। এজেলুনা তার দুই বাহু প্রসারিত করে দিল। পাদ্রি ধারণ করতে পারেনি যে, এজেলুনা এতটা সাহসের পরিচয় দেবে। পাদ্রি প্রথমে কিছুটা ইতস্তত করছিল, তারপর এজেলুনার বাহু-বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেল। এজেলুনা পাদ্রিকে জড়িয়ে ধরে তার ঠোঁটে চুমু খেল।
‘আমি এই গির্জার সেবিকা হতে চাই।’ এজেলুনা বলল। তবে আন্দালুসিয়ার বিজয় নিশ্চিত করার পর। এটাই আমার জীবনের একমাত্র মিশন।
এজেলুনা পাদ্রির বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে চলে গেল। পাদ্রি পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল। সে এজেলুনার গোড়াগাড়ির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল। ঘোড়ার খুড়ের আওয়াজও তার কানে আসছিল। কিন্তু পাদ্রির চেহারায় এমন এক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পাচ্ছিল যে, মনে হচ্ছিল, সে এখনও এজেলুনার শরীরের উষ্ণতা অনুভব করছে।
***
দ্বিতীয় দিন এজেলুনা সেই গির্জায় এসে উপস্থিত হল। এজেলুনা গতকাল যে কামরায় পাদ্রির সাথে দেখা করেছিল, সে কামরার পরিবর্তে অন্য এক কামরায় এসে উপস্থিত হল। এ কামরাটি চতুর্দিক থেকে বেশ কয়েকটি কামরা দ্বারা বেষ্টিত ছিল। গির্জার বাইরে আট-দশজন প্রহরী পাহারা দিচ্ছিল। তারা এজন্য পাহারা দিচ্ছিল যে, সন্দেহভাজন কেউ এসে পড়লে সাথে সাথে ভিতরে সংবাদ পৌঁছাবে।
আজকের এই আলোচনা সভায় বার-তেরজন ব্যক্তি উপস্থিত হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজন হল ইহুদি। বিদ্রোহ সৃষ্টির পিছনে এদের সকলেরই হাত আছে। এখনও পর্যন্ত তাদের টিকিটির সন্ধান পাওয়া যায়নি।
‘রানী এজেলুনা!’ একজন ইহুদি প্রথমে কথা বলল। আমরা আপনাকে এ ব্যাপারে সতর্ক করতে চাচ্ছি যে, আপনি যদি আমাদেরকে ধোঁকা দেন তাহলে আমরা গ্রেফতার হব এবং আমাদেরকে হত্যা করা হবে। কিন্তু আপনিও বেঁচে থাকতে পারবেন না। আমরা এমন ব্যবস্থা করে রেখেছি। আমাদের লোকেরা আপনাকে সাথে সাথে হত্যা করবে না; বরং আপনাকে অপহরণ করা হবে। আপনি নিশ্চয় ভাবতে পারছেন, অপহরণ করার পর আপনার সাথে কী ধরনের আচরণ করা হবে? আপনাকে তখনই ছাড়া হবে যখন আপনার নির্মম মৃত্যু হবে।’
‘আপনাদেরকেও হত্যা করা হবে না এবং আমাকেও অপহরণ করার প্রয়োজন হবে না।’ এজেলুনা বলল। আমার মনে হয়, ফাদার আমার সম্পর্কে আপনাকে সব কিছু খুলে বলেননি।
“তিনি সবকিছু বলেছেন।’ ইহুদি বলল। অন্যথায় আমরা এখানে উপস্থিত হতাম না। তারপরও আপনাকে সতর্ক করা আমাদের কর্তব্য। এটা আমরা কীভাবে ভুলতে পারি যে, আপনি একজন মুসলমান কমান্ডারের বিবাহিতা স্ত্রী। স্বাভাবিকভাবেই আপনি আপনার স্বামীর সাথে বিশ্বস্ততার পরিচয় দেবেন।
‘আমার বিশ্বস্ততা একমাত্র গির্জার সাথে।’ এজেলুনা বলল। আমার স্বামীকে আমি আমার প্রতি আস্থাশীল করে গড়ে তুলেছি। সে আমার প্রতি এতটাই দুর্বল যে, আমি যে কোন কথাই তাকে বিশ্বাস করাতে পারি।’
‘আমার মনে হয়, আপনি স্বপ্ন দেখছেন। অন্য একজন বলল। আপনার এই স্বামী কিছু দিন পর যখন অন্য কোন শহর বা রাজ্য জয় করবে তখন সেখানে আপনার মত কোন সুন্দরী তার পছন্দ হলে, তার প্রতি সে দুর্বল হয়ে পড়বে। আর আপনি তখন তার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে যাবেন।
