এমন সময় আসার পূর্বেই আমাদের বিদ্রোহ সফল হয়ে যাবে।’ এজেলুনা বলল। আপনি কি জানেন না যে, মালাগা ও গ্রানাডায়ও বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেছে? বিদ্রোহের এই আগুন আরও ছড়িয়ে দিতে হবে। এটা আপনাদের কাজ। আমার দায়িত্ব হল, উপযুক্ত সময়ে বিষ প্রয়োগ করে বা অন্য কোন উপায়ে আমার স্বামীকে হত্যা করা। কিন্তু এখন আমার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হল, আমার স্বামীর চোখে ধুলো দিয়ে আপনাদের সকলকে গ্রেফতারির হাত থেকে রক্ষা করা। এই শহর ত্যাগ করা আপনাদের জন্য একান্ত জরুরি। এযাবত যারা গ্রেফতার হয়েছে, তাদের কেউ জীবন বাঁচানোর জন্য আপনাদের নাম বলে দিতে পারে। এখান থেকে বের হয়ে আপনাদেরকে নিশ্চিন্তে বসে থাকলে চলবে না। আন্দালুসিয়ার প্রতিটি ঘরে বিদ্রোহের আগুন জ্বালাতে হবে আপনাদের।
‘এ ছাড়া আমাদের আর কোন উপায়ও নেই। একজন ইহুদি বলল। মুসলিম বাহিনীর কাছে এত বিপুল সংখ্যক সিপাহী নেই যে, তারা সমগ্র দেশের বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হবে।’
‘আমি একটা কথা বলতে চাই। অন্য ইহুদি বলল। যেখানেই বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছে, সেখানেই ইহুদিরা মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। আমরা বাদশাহ রডারিকের আচরণে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আপনি ভালভাবেই জানেন, সমাজে আমাদের অবস্থান কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল? আমরা মুসলমানদের সাথে মিলে রডারিককে সিংহাসন থেকে উচ্ছেদ করেছি। এখন আমরা মুসলমানদের মূলোৎপাটন করছি। তাদেরকে আমরা শান্তিতে থাকতে দেব না। তবে আমরা এখানে আমাদের রাজত্বও প্রতিষ্ঠা করব না। রাজত্ব থাকবে খ্রিস্টানদের। আমরা শুধু এতটুকু চাই যে, এই রাজ্যে এবং রাজ দরবারে খ্রিস্টানদেরকে যতটা সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করা হয়, ততটা সম্মান ও মর্যাদা যেন ইহুদিদেরকেও প্রদান করা হয়।
এর চেয়েও বেশি সম্মান তোমাদেরকে প্রদান করা হবে। এক খ্রিস্টান লিডার বলল। তোমরা যে কাজ করতে পার, খ্রিস্টানরা তা করতে পারে না। ইহুদিদের এই কাজের প্রতিদান, তাদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দেওয়া হবে।
‘আপনারা নিশ্চিন্ত মনে কাজ করে যান।’ এজেলুনা বলল। ‘অধিকার ও প্রাপ্তির বিষয়টি পরে বিবেচনা করা হবে। এখন আপনারা সকলে এই শহর থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। আমি আপনাদেরকে বলছি, কোন্ ছদ্মবেশে আপনারা এখান থেকে বের হবেন।’
ইতিহাসের বিভিন্ন রেকর্ড থেকে জানা যায় যে, এজেলুনা তাদেরকে বলেছিল, তারা যেন ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে পনের-বিশটি খচ্চরে কাঁচা তরকারি ও বিভিন্ন সামানপত্র বোঝাই করে শহরের ফটকের দিকে রওনা হয়। এ রাজ্যের বড় ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে তিন-চারজন লোক তাদের সাথে থাকবে। তারা ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে বলবে, তারা হলেন, কর্ডোভার সম্মানিত বণিক দল। তারা তাদের ব্যবসায়ী পণ্য বিক্রি করে এখান থেকে পণ্য ক্রয় করে নিজ দেশে চলে যাচ্ছে।’
এজেলুনা একটি জায়গা নির্দিষ্ট করে দিয়ে তাদেরকে সেখানে সমবেত হতে বলল।
দ্বিতীয় দিন এগারজনের একটি বণিক দল সতের-আঠারটি খচ্চর নিয়ে সীমান্তবর্তী একটি জায়গায় দাঁড়াল। এই বণিক দলের সাথে আরও তিন-চারজন ব্যক্তি এসে মিলিত হল। এরাও বিদ্রোহের সাথে জড়িত ছিল। তারা সকলেই ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশধারী লোকদের জন্য অপেক্ষা করছিল। কথা ছিল, ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশধারী লোকেরা এসে তাদেরকে ফটক পার হওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করবে। এজেলুনা তাদেরকে বলেছিল, ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশ ধারণকারী লোকেরা তার নিজস্ব লোক হবে।
বিদ্রোহী নেতারা ব্যবসায়ীদের পথ চেয়ে অপেক্ষা করছিল। এমন সময় হঠাৎ চল্লিশ-পঞ্চাশজনের একটি অশ্বারোহী দল সেখানে এসে উপস্থিত হল। তাদেরকে দেখে বিদ্রোহী নেতারা মুখ ঘুরিয়ে নিল। অশ্বারোহী দলটি দুজন দুজন করে বিদ্রোহী নেতাদের নিকট দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। অশ্বারোহী দলের প্রায় অর্ধেক সদস্য বিদ্রোহী নেতাদেরকে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে গেল। এমন সময় হঠাৎ তারা পেছন ফিরে বিদ্রোহী নেতাদেরকে ঘিরে ফেলল। সকল অশ্বারোহীর কাছে বর্শা ছিল। তারা তাদের বর্শার অগ্রভাগ বিদ্রোহী নেতাদের বুকের উপর চেপে ধরল।
‘তোমরা সকলে বন্দী। অশ্বারোহী দলের কমান্ডার বলল। নীরবে আমাদের সামনে সামনে চলতে থাকে।
অশ্বারোহী দলটি বিদ্রোহী নেতাদেরকে নিয়ে আবদুল আযীযের সামনে উপস্থিত হল।
সকলকে হত্যা করে ফেলে।’ আবদুল আযীয নির্দেশ দিলেন।
সাথে সাথে নির্দেশ পালন করা হল। আর সেই সাথে বিদ্রোহের আশঙ্কা একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেল।
‘এখন নিশ্চয় আমার প্রতি আপনার পূর্ণ আস্থা সৃষ্টি হয়েছে? এজেলুনা আবদুল আযীযকে বলল। আমি আমার সম্প্রদায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরকে ধোকা দিয়ে হত্যা করিয়েছি। আপনাকে বিয়ে করে যদিও আমি আপনার ধর্ম গ্রহণ করেনি, তাতে কী হয়েছে? আমার ভালোবাসাই আমার ধর্ম। আমি আপনার উপাসনা করি।’
আবদুল আযীয শুরু থেকেই এজেলুনার জন্য জীবন উৎসর্গ করে বসেছিল। তিনি এজেলুনার প্রতি এতটাই আসক্ত ছিলেন যে, বিয়ের পরও তাকে খ্রিস্টান থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন। আর এখন এজেলুনার এই বিশাল কৃতিত্বের জন্য তিনি তার আজ্ঞাবহ কৃতদাসে পরিণত হয়ে গেলেন। এজেলুনা বিদ্রোহের সকল নেতাকে ধরিয়ে দিয়ে সমূলে বিদ্রোহের মূলোৎপাটন করল। বিদ্রোহ সৃষ্টির অপরাধে অভিযুক্তদের মধ্যে বড় পাদ্রিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। অন্যান্য বিদ্রোহীদের সাথে তাকেও হত্যা করা হল।
