যুদ্ধবন্দীরা ভয় পেয়ে অস্বীকার করল। আবদুল আযীয দুজন আরব প্রশাসসকে দায়িত্ব দিলেন, তারা যেন একেকজন যুদ্ধবন্দীকে উদ্বুদ্ধ করে অপরজন সম্পর্কে তথ্য প্রদান করতে। সহজে যদি তারা মুখ না খুলে তাহলে তাদেরকে মুখ খুলতে বাধ্য করবে। প্রয়োজনে তাদেরকে মৃত্যুর হুকমী দেবে কিংবা এই লোভ দেখাবে যে, যারা সঠিক তথ্য দেবে তাদেরকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হবে।
আবদুল আযীযের এই পলিসি বেশ সফলই মনে হচ্ছিল। চারজনকে চিহ্নিত করা হল। তিনজন খ্রিস্টান, আর একজন ইহুদি। অস্ত্র-শস্ত্র একটি গির্জায় একত্রিত করা হচ্ছিল। চিহ্নিত চারজনকে গ্রেফতার করা হল। এই ষড়যন্ত্রের সাথে যারা জড়িত তাদেরকে খুঁজে বের করার জন্য গ্রেফতারকৃতদেরকে কঠোর শস্তি দেওয়া হল। তারা আরও দুইজনের কথা স্বীকার করল। তাদেরকেও গ্রেফতার করা হল।
এজেলুনা লক্ষ্য করছিল, আবদুল আযীয এত বেশি অস্থিরতা আর পেরেশানীর মাঝে সময় অতিবাহিত করছিলেন যে, রাতে ভালোমত তার ঘুমও আসছিল না।
‘আযীয! এক রাতে এজেলুনা তার স্বামীকে বিদ্রি রজনী যাপন করতে দেখে বলল। সকল প্রশাসকরা দিন-রাত বিদ্রোহীদের খুঁজে দৌড়-ঝাঁপ করছে। তারপরও আপনি এত পেরেশান হচ্ছেন কেন? আপনি যখনই যে নির্দেশ দিচ্ছেন, তখনই তা পালন করা হচ্ছে।’
‘বিদ্রোহের ছোট্ট একটা স্ফুলিঙ্গ গোটা রাজ্যে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে। আবদুল আযীয বললেন। আমার দায়িত্ব হল এই রাজ্যকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করা। তুমি তো জান, এ রাজ্যে আমরা অনেক জান কুরবান করেছি। সেসকল শহীদানের সামনে এবং মহান আল্লাহর সামনে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে। সেদিনই আমার চোখে ঘুম আসবে, যেদিন বিদ্রোহীদের সর্বশেষ ব্যক্তিকে আমার সামনে হত্যা করা হবে। একটু চিন্তা করে দেখ, যদি বিদ্রোহীরা সফল হয়ে যায় তাহলে আমাদের পরিণতি কী হবে? আমাকে হত্যা করা হবে, আর বিদ্রোহীদের সরদার তোমার সাথে পাশবিক আচরণ করবে। তুমি তো রানী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে, তাই না? একটু ভেবে দেখ, আমরা পরাজিত হলে তোমার সেই স্বপ্ন কি সত্য হবে?
আবদুল আযীয পরিস্থিতির ভয়াবহতা এমনভাবে তুলে ধরলেন যে, এজেলুনার শরীর শিহরে উঠল।
‘আমি আপনাকে সাহায্য করতে চাই।’ এজেলুনা বলল। ‘অনুমতি হলে আমি এই ষড়যন্ত্রের শিকড় খুঁজে বের করতে সক্ষম হব।
‘তুমি কী করবে?’ আবদুল আযীয জিজ্ঞেস করলেন।
‘আমি আগামীকাল বড় গির্জায় যাব।’ এজেলুনা বলল। আমি বড় পাদ্রিকে বলব, আমি এক মুসলমানকে বিয়ে করেছি ঠিক, কিন্তু খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করিনি। তারপর আমি যা কিছু করব, তা আপনি জানতে পারবেন।
আবদুল আযীয তাকে অনুমতি দিলেন।
***
পরদিন সকালে এজেলুনা বড় গির্জায় চলে গেল। বড় পাদ্রি তাকে দেখে হতবাক হয়ে গেল।
‘আমি তো শুনেছি, আপনি এক মুসলিম কমান্ডারকে বিয়ে করেছেন। পাদ্রি বলল। এখন গির্জায় আপনার আবার কি কাজ?
‘গির্জায়-ই তো আমার কাজ।’ এজেলুনা মুচকি হেসে বলল। গির্জার সম্মান রক্ষার্থে আমি যে কাজ করেছি, আপনারা সকল পুরুষ মিলেও তা করতে পারেননি।
এ কথা বলেই এজেলুনা বৃদ্ধ পাদ্রির হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। এজেলুনার মুচকি হাসিতে ছিল জাদুময়ী আকর্ষণ। সেই জাদুকে অট্টহাসি আরও বেশি মোহনীয় করে তুলল। তার উপর এজেলুনা পাদ্রির হাতকে নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে নিল। সে যুগের পাদ্রিরা গির্জার সেবিকাদেরকে নিজেদের রক্ষিতা বানিয়ে রাখত। এজেলুনা ছিল অসাধারণ সুন্দরী এবং আকর্ষণীয় যৌবনের অধিকারী। পাদ্রির চেহারার রং মুহূর্তে বদলে গেল। পলকের জন্য তার চোখ দুটি জ্বলসে উঠল। তার ঠোঁটের কোণে এমন এক রহস্যময় হাসি ছড়িয়ে পড়ল, যা কোন নতুন সেবিকাকে দেখলে ছড়িয়ে পড়ত।
‘তাহলে কি তুমি অন্য কোন অভিপ্রায়ে ঐ সালারকে বিয়ে করেছ?’ পাদ্রি এজেলুনাকে জিজ্ঞেস করল।
‘হা!’ এজেলুনা প্রতিউত্তরে বলল। সর্বপ্রথম আমি এ ব্যাপারে আশ্বস্ত হতে চাই যে, আপনি আমার সব কথা গোপন রাখবেন। আমি উপাসনা করার বাহানায় গির্জায় আপনার কাছে এসেছি। আমাকে একজন বন্ধু মনে করে কথা বলতে পারেন। আমাকে কোন বাদশাহর বিধবা স্ত্রী বা কোন বিজয়ী সালারের বিবাহিতা স্ত্রী মনে করবেন না।
‘একি বলছ তুমি, এজেলুনা! পাদ্রি বলল। আমি গির্জায় বসে আছি। তুমি যদি বল তাহলে আমি কুমারী মরিয়মের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে, কুশ হাতে নিয়ে কসম খেয়ে বলতে পারি যে …।
‘না, ফাদার। এজেলুনা তাকে বাধা দিয়ে বলল। আপনার এই একটি বাক্যই আমার কাছে কসম খাওয়ার সমতুল্য। আমি বলছিলাম যে, আমি ঐ সালারের সাথে বিয়ে করেছি ঠিকইকিন্তু নিজ ধর্ম বিসর্জন দেইনি। সে আমাকে পাওয়ার জন্য এতটাই পাগলপারা হয়ে পড়েছিল যে, আমার সকল শর্ত সে মেনে নিয়েছে। আমি তাকে খুশী করার জন্য বলেছিলাম, কয়েকটা দিন অতিবাহিত হতে দিন। দেখবেন, আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নেব।’
‘এটা তোমার সৌন্দর্যের কারিশমা। পাদ্রি হাসতে হাসতে বলল।
‘তাই যদি হয় তাহলে আমি আমার সৌন্দর্য দ্বারা আরও বেশি ফায়দা উঠাতে চাই।’ এজেলুনা বলল। আমার স্বামী এখানের বিদ্রোহের আগুন নিভানোর জন্য এসেছেন, আর আমি বিদ্রোহের সেই আগুন আরও তীব্র করার জন্য এসেছি। আমি জানি, যেসব লোক ধরা পড়েছে, তারা দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর লিডার। মূল পরিকল্পনাকারীরা আত্মগোপন করে আছে। আমি জানতে চাই, তারা কারা এবং কোথায় আছে? তাদেরকে বাঁচানোর ব্যবস্থা আমি করতে চাই।’
