আবু বকর বিষয়টিকে গুরুত্ব দিলেন। তিনি জানতে চাচ্ছিলেন, এই মেয়েটির উপর কে বা কারা নির্যাতন করেছে? কোন মুসলমান এই অপরাধের সাথে জড়িত নয় তো? মেয়েটি কাঁদতে লাগল। আবু বকর তার মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন। মেয়েটি আবু বকরের হাত নিজের হাতে নিয়ে চুমু খেল। মেয়েটির কাছে একটা ছোট্ট ঝুড়ি ছিল। ঝুড়িতে কয়েকটি আপেল ও অন্যান্য ফল রাখাছিল। মেয়েটি একটি আপেল আবু বকরের হাতে দিয়ে ইঙ্গিতে খেতে বলল।
আবু বকর ভাবলেন, এই দরিদ্র মেয়েটি সম্ভবত তার স্নেহের শুকরিয়া আদায় করতে চাচ্ছে। তাই তিনি মেয়েটির হাত থেকে আপেলটি নিয়ে খেয়ে ফেললেন। মেয়েটি মাথায় হাত ঠেকিয়ে সালাম করে চলে গেল।
সন্ধ্যার ঘন অন্ধকারে চার দিক আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল। আবু বকর তার বাড়ির দিকে ফিরে আসছিলেন। পথিমধ্যে তার মাথা ঘুরতে শুরু করল। বাড়িতে পৌঁছুতে পৌঁছুতে তার অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়ে গেল। হেকিম ডাকা হল। হেকিম গভীরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জিজ্ঞেস করলেন, “কিছুক্ষণ পূর্বে আপনি কি কিছু খেয়েছিলেন?
আবু বকর একটি মেয়ের সাথে তার সাক্ষাতের ঘটনা বর্ণনা করে বললেন, মেয়েটি তাকে একটি আপেল খেতে দিয়েছিল।
‘আপেলের ভিতর হয়তো বিষাক্ত কোন পোকা ছিল।’ হেকিম বললেন। “কিংবা বিষাক্ত কোন পোকা আপেলের উপর দিয়ে হেঁটে গেছে অথবা কৌশলে তার ভিতর বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আবু বকর মেয়েটির কথা বলতে বলতে ছটফট করতে লাগলেন। হেকিম তাকে ঔষুধ দিলেন, কিন্তু ঔষুধে কোন কাজ করল না।
***
মুসা বিন নুসাইরকে সংবাদ দেওয়া হল। তিনি আরেকজনকে এ্যাশবেলিয়ার প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। ইতিহাসের কোথাও তার নাম উল্লেখ করা হয়নি।
আবু বকরের মৃত্যুর দুই-তিন দিন পর সেনাবাহিনীর এক সহকারী সেনাপতি ঐ মেয়ের হাত থেকে কিছু একটা খেয়ে মারা গেলেন। এই ঘটনার দুই-তিন দিন অতিবাহিত হতে না হতেই একজন মুসলিম প্রশাসক রাতের বেলা শহরের কোন এক গলি দিয়ে একাকী হেঁটে যাচ্ছিলেন। এমন সময় পিছন দিক থেকে খঞ্জর মেরে তাকে হত্যা করা হল। সকালে সেই গলিতে তার লাশ পাওয়া গেল। এভাবে দুই-তিন দিনের ব্যবধানে ত্রিশজন মুসলিম প্রশাসককে হত্যা করা হল। কেউ বিষপানে মারা গেল, কেউ বা তলোয়ারের আঘাতে, আর কেউ মারা গেল খঞ্জরের আঘাতে। ইতিহাস গ্রন্থে এমন গুপ্ত হত্যার শিকার প্রশাসকের সংখ্যা ত্রিশজন উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রফেসর ডোজি এবং ডা. কোডে লেখেছেন, মুসা বিন নুসাইরকে ঘটনা সম্পর্কে এভাবে অবগত করা হল।
‘ত্রিশজন ছোট-বড় প্রশাসকের রহস্যজনক মৃত্যু এই প্রমাণ বহন করছে যে, আমাদের বিরুদ্ধে কোন কঠিন ষড়যন্ত্র কাজ করছে। পরাজিত খ্রিস্টান সম্প্রদায় সম্ভবত এই ষড়যন্ত্রের পিছনে আছে। ষড়যন্ত্রের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, রাজস্ব আদায়ে প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করা হচ্ছে। সরকারি বিধি-নিষেধ পালনে লোকজন খুবই অবহেলার পরিচয় দিচ্ছে। আরেকটি ভয়াবহ সংবাদ হল এই যে, যুদ্ধ বন্দীদেরকে নিরস্ত্র রাখা হত এবং তাদের থেকে সাধারণ শ্রমিকের কাজ নেওয়া হত। জানা গেছে যে, বেশ কয়েকজন যুদ্ধবন্দী অস্ত্র হাতিয়ে নিয়ে কোথাও যেন লুকিয়ে রেখেছে। এখনই যদি এই অবস্থার পরিবর্তন না করা হয় তাহলে যে কোন সময় এ্যাশবেলিয়ায় বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে।‘
ইহুদিরা এতটাই সংগোপনে খ্রিস্টানদেরকে বিদ্রোহের জন্য উদ্বুদ্ধ করছিল, যাতে সন্দেহের তীর খ্রিস্টানদের দিকেই যায়। ইহুদিদের কথা কারও চিন্তায়ও আসেনি। উঁহুদি ও খ্রিস্টানদের উপাসনালয় এক হয়ে গিয়েছিল। মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মেয়েদেরকে ব্যবহার করা হচ্ছিল।
মুসা বিন নুসাইর ষড়যন্ত্র ও বিদ্রোহের সংবাদ পাওয়া মাত্রই তার বড় ছেলে আবদুল আযীযকে বললেন, সাত-আটশ সিপাহী নিয়ে এখনই এ্যাশবেলিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যাও। তিনি আরও নির্দেশ দিলেন, বিদ্রোহ শুধু দমনই করবে না, বরং যারা এই বিদ্রোহের সাথে জড়িত তাদেরকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসবে।
‘ষড়যন্ত্রকারীদের সর্বনিম্ন শাস্তি দেবে মৃত্যুদণ্ড।’ মুসা বিন নুসাইর আবদুল আযীযকে লক্ষ্য করে বললেন। আমার সন্দেহ হচ্ছে, এই ষড়যন্ত্রের পিছনে ইহুদিদের হাত রয়েছে।
“ইহুদি’ আবদুল আযীয আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন। ইহুদিরা তো আমাদের সাথে রয়েছে।
‘ইহুদিরা ইহুদি ছাড়া আর কারও সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে না। মুসা বিন নুসাইর বললেন। ইহুদিদেরকে তো স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই ষড়যন্ত্রকারী সম্প্রদায় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাছাড়া কখনই কাউকে সন্দেহের উর্ধ্বে মনে করবে না।
***
আবদুল আযীয তার খ্রিস্টান স্ত্রী এজেলুনাকে নিয়ে এ্যাশবেলিয়া পৌঁছে গেলেন। তার সাথে ছিল সাতশ চৌকস সিপাহী। এ্যাশবেলিয়া পৌঁছেই তিনি গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধানকে ডেকে কঠোরভাবে নির্দেশ দিলেন যে, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত করে বের করতে হবে, বিদ্রোহ কীভাবে শুরু হয়েছে এবং এই বিদ্রোহের পিছনে কাদের হাত রয়েছে। অতঃপর তিনি যুদ্ধবন্দীদের যারা প্রতিদিন পারিশ্রমিকের মাধ্যমে কাজ করত, তাদেরকে একত্রিত করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন, তাদের মধ্যে কারা অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে?
