পূর্বেও এ কথা বলা হয়েছে যে, আন্দালুসিয়ার ইহুদিরা ছিল নির্যাতিত-নিপীড়িত এক জাতি। রডারিকের সময় তাদের সাথে তৃতীয় শ্রেণীর নাগিরকের মত ব্যবহার করা হত। তাদের আয়-রোজগারের সিংহভাগ তাদের উপর কর আরোপ করার মাধ্যমে নিয়ে নেওয়া হত।
সেনাবাহিনী ও সরকারি অফিস-আদালতে তাদেরকে নিম্নমাণের কাজ দেওয়া হত। তাদের উপর সবচেয়ে বড় যে অবিচার করা হত, তা হল তাদের যুবতী কোন মেয়েকে যদি কোন পাদ্রির চোখে ভাল লাগতে তাহলে পাদ্রি তার লালসা চরিতার্থ করার জন্য সে মেয়েকে উঠিয়ে নিয়ে যেত এবং তাকে গির্জার সেবিকা হতে বাধ্য করত। সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও ইহুদিদের সাথে এমন আচরণ করত। মোটকথা, আন্দালুসিয়ার সমাজ ব্যবস্থায় ইহুদিদের কোন মান-সম্মান ছিল না।
এ কারণেই তারা রডারিকের বিরুদ্ধে তারিক বিন যিয়াদকে গোপনে সাহায্য করেছিল। প্রতিদান হিসেবে তারিক বিন যিয়াদ যে শহর জয় করতেন সেখানে ইহুদিদেরকে বড় বড় পদ প্রদান করতেন এবং ইহুদিদের উপর যেসব অন্যায্য টেক্স আরোপিত ছিল, সেগুলো তিনি মওকুফ করে দেন। এ ছাড়াও তিনি তাদেরকে অনেক রকম সুযাগ-সুবিধা প্রদান করেন।
তারিক বিন যিয়াদের আন্দালুসিয়া আক্রমণ করার কয়েক মাস পর মুসা বিন নুসাইর আন্দালুসিয়া আক্রমণ করেন। ইহুদি সম্প্রদায় মুসা বিন নুসাইরের প্রতিও এত বেশি আনুগত্য প্রদর্শন করে যে, মুসা বিন নুসাইরের মত অভিজ্ঞ জেনারেলের পক্ষেও তাদের আনুগত্য উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ইহুদিরা খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে গুপ্তচর বৃত্তিও করত। তাদের এই গুপ্তচর বৃত্তির কারণে খ্রিস্টানদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে মুসলিম বাহিনী অবগত হয়ে যেত। ইহুদিদের এ জাতীয় সহযোগিতার কারণে মুসা বিন নুসাইরও তাদেরকে রাষ্ট্রের উঁচু উঁচু পদে বসিয়েছিলেন।
মুসা বিন নুসাইর এবং তারিক বিন যিয়াদ ইহুদিদের আনুগত্য দেখে এত বেশি প্রভাবতি হয়েছিলেন যে, তারা এ কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন, ইহুদিদের চেয়ে বড় দুশমন ইসলাম ও মুসলমানদের আর কেউ নেই।
এক পাপিষ্ঠা ইহুদি নারী বিশ মিশ্রিত গোশত খাইয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করতে চেয়েছিল, কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক টুকরা গোশত মুখে দিয়ে সাথে সাথে বমি করে ফেলে দেন।
ইহুদিদের সেই স্বভাবজাত শয়তানী বুদ্ধি মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তাদের ষড়যন্ত্রের দাবানল সর্বপ্রথম এ্যাশবেলিয়ায় ছড়িয়ে পড়ল। দু’জন ইহুদি রাব্বি আর চারজন খ্রিস্টান পাদ্রি এক ঘরে গোপন বৈঠকে মিলিত হল।
‘আমাদের কাজ হয়ে গেছে।’ একজন ইহুদি রাব্বি বল। রডারিককে উৎখাত করা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল, মুসলমানদের সাথে মিলে আমরা আমাদের সেই উদ্দেশ্যে সফল হয়েছি। এখন আমাদের আসল উদ্দেশ্য সাধনে কাজ করা দরকার। আপনারা সকলেই জানেন, আমাদের সেই আসল উদ্দেশ্য কী?
আমাদের আসল উদ্দেশ্য হল, জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করা। জেরুজালেমে ‘সুলায়মানী প্রতিমা স্থাপন করা আমাদের ধর্মীয় কর্তব্য। সফলভাবে এই কর্তব্য পালন করার জন্য আমাদেরকে খ্রিস্টানদের সহযোগিতা গ্রহণ করতে হবে। মুসলমানদের সাথেই আমাদের চূড়ান্ত লড়াই হবে। আপনারা সকলেই জানেন যে, মুসলমানরা জেরুজালেমকে বায়তুল মাকদাস বলে। তারা এই বায়তুল মাকদাসকেই তাদের প্রথম কেবলা ও মসজিদে আকসা বলে থাকে। এখানেই আমাদেরকে সুলায়মানী প্রতিমা স্থাপন করতে হবে। একদিন আমাদেরকে জেরুজালেম ফিরে যেতে হবে। জেরুজালেম আমাদের স্বদেশ। আজ সেই জেরুজালেম মুসলমানদের দখলে।
আন্দালুসিয়ায় খ্রিস্টানদের রাজত্ব ধ্বংস করা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল। আমরা মুসলমানদের সাহায্যে আমাদের সে উদ্দেশ্য হাসিল করেছি। মুসলমানদের থেকে আমাদের ফায়দা এই হয়েছে যে, আমরা তাদের রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদ দখল করে নিয়েছি। এ কথা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, মুসলিম জাতি আমাদের সবচেয়ে বড় দুশমন। এই দুশমনী কখনও শেষ হবে না।
আপনারা অবশ্যই লক্ষ্য করছেন, গোটা বিশ্বে প্রতিদিনই ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটছে। ইসলাম ধর্মের এই প্রসার আমাদেরকে রুখতে হবে। প্রথমেই আমি আপনাদেরকে বলেছি, খ্রিস্টানদের সাথে মিলেই আমাদেরকে এই কাজ করতে হবে। আমাদেরকে অতি সংগোপনে সামনে অগ্রসর হতে হবে। আন্দালুসিয়াই হবে মুসলমানদের শেষ কবরস্থান।
ইহুদি সম্প্রদায়ের ষড়যন্ত্র আর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পারঙ্গমতা শুরু থেকেই প্রসিদ্ধ ছিল। ইহুদিরা যে যেখানেই গিয়েছে, সেই সেখানকার শাসক সম্প্রদায়ের চক্ষুশূল হয়েছে। আন্দালুসিয়ায় তারা এ কথা ভুলে গেল যে, মুসলমানগণ এখানে তাদেরকে সম্মানজনক অবস্থান দান করেছেন। তারা মুসলমানদেরকে পিছন দিক থেকে ছুরি মারার চিন্তা করতে লাগল।
এ সময় এ্যাশবেলিয়ার প্রশাসক ও দুর্গপ্রধান ছিলেন দামেস্কের অধিবাসী আবু বকর। একদিন বিকেলে তিনি বাগানে পায়চারী করছিলেন। এমন সময় খুব রূপসী একটি মেয়ে উসকু-খুসকু চুলে এ দিকে এগিয়ে এলো। মেয়েটির গায়ে ছিড়া-ফারা পোশাক। তাকে খুবই দরিদ্র মনে হচ্ছিল। মেয়েটি আবু বকরের পথ আগলে দাঁড়িয়ে কি যেন বলতে লাগল। তাদের কেউ-ই কারও ভাষা বুঝল না। অগত্যা ময়েটি ইঙ্গিতে আবু বকরকে কিছু একটা বুঝাতে চাচ্ছিল। সে তার কাপড় উঠিয়ে সম্ভবত এ কথাই বুঝাতে চাচ্ছিল যে, তার উপর অনেক জুলুম-নির্যাতন করা হয়েছে।
