‘বৃদ্ধ না যুবক? এজেলুনা জিজ্ঞেস করল।
‘যুবক, আপনার সমবয়সীই হবে।’ খাদেমা বলল।
‘তাকে ভিতরে পাঠিয়ে দাও।’ এজেলুনা বলল।
আবদুল আযীয যখন ভিতরে প্রবেশ করল তখন এজেলুনার চেহারায় পাতলা নেকাবে ঢাকা ছিল। আবদুল আযীয তার সাথে একজন দোভাষী নিয়ে এসেছিলেন। দোভাষীর মাধ্যমে তিনি এজেলুনাকে জিজ্ঞেস করলেন, এখানে তার কোন সমস্যা হচ্ছে না তো? তার সমস্ত প্রয়োজন পূরণ করা হচ্ছে তো? এজেলুনা স্বস্তি প্রকাশ করে দোভাষীকে লক্ষ্য করে বলল, ইনি কে? এখানে কেন এসেছেন?
‘আমি সিপাহসালারের বড় ছেলে। আবদুল আযীয বললেন। সিপাহসালার মুসা বিন নুসাইর আফ্রিকার আমীর। বর্তমানে তিনি আন্দালুসিয়ারও আমীর। তার পর আমি হব আন্দালুসিয়ার আমীর।
‘আমার এখানে আপনার আগমনের কারণ?’ এজেলুনা জানতে চাইল।
‘এতটাই অহংকার?’ আবদুল আযীয বললেন। “তুমি কি এখনও নিজেকে আন্দালুসিয়ার রানী মনে কর?
‘আমি আন্দালুসিয়ার রানী নই বটে, তবে আমি নিজের মনের রানী তো অবশ্যই।’ এজেলুনা বলল। এটা এমন এক সালতানাত, যা আমার থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। এ কথা ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না যে, আমি একজন বাদশাহর বিধবা স্ত্রী। আমি শাহী খান্দানে জন্ম নিয়েছি, তাই আমার চাল-চলন সেসব মেয়েদের চেয়ে ভিন্ন, যারা আমার চেয়ে নিম স্তরের। তারা তো তোমাদের মত সালারদের দাসী বা রক্ষিতা হওয়াকে নিজেদের জন্য গর্বের বিষয় মনে করে।
এজেলুনা কয়েক মুহূর্তের পরিচয়ে আবদুল আযীযকে আপনি থেকে তুমি সম্বোধন করে কথা বলতে শুরু করল।
‘আমি তোমাকে দাসী বা রক্ষিতা বানাতে আসিনি।’ আবদুল আযীয বললেন। “তুমি বাদশাহর বিবি ছিলে, বাদশাহর বিবি-ই হবে। তবে মুসলমানদের মাঝে কোন বাদশাহ হয় না। আমাদের একজন খলীফা হন, তার অধীনে বেশ কয়েকজন আমীর থাকেন। তাদের সকলেই তোমাদের বাদশাহদের সমমর্যাদার হয়ে থাকেন। কিন্তু তাদের চিন্তা-ভাবনা বাদশাহদের মত হয় না।’
‘তুমি কি আমাকে বিবাহ করতে চাও?’ এজেলুনা জানতে চাইল।
‘হ্যাঁ।’ আবদুল আযীয বললেন। আমি আমার পিতার কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছি। তোমাকে যদি দাসী বা রক্ষিতা বানানোর ইচ্ছা আমাদের থাকত তাহলে আমরা তোমাকে এতদিন এখানে রানী বানিয়ে রাখতাম না।’
‘আমি কি কেবলমাত্র গৃহিণী হব না রানী হব? এজেলুনা বলল।
‘তুমি যদি চেহারার উপর থেকে নেকাব সরিয়ে নাও তাহলে সঠিক উত্তর পাবে।’ আবদুল আযীয বললেন।
এজেলুনা সাথে সাথে চেহারা থেকে নেকাব উঠিয়ে নিল এবং মাথার কাপড়ও সরিয়ে দিল। আবদুল আযীয এই তন্বী যুবতীর ব্যাপারে যার কাছেই জিজ্ঞেস করেছিল সেই তাকে বলেছিল, এই যুবতীর বয়স ত্রিশ বছরের চেয়ে দু-এক বছর কম হবে। কিন্তু তাকে দেখলে মনে হয়, বিশ বছরের উদ্ভিন্ন যৌবনা এক নারী। তার রূপের উজ্জ্বলতা আর অনিন্দ্য দেহসৌষ্ঠবের মাঝে এমন এক আকর্ষণ আছে যে, কেউ তাকে প্রথমবার দেখলে সে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়বে। তার চোখে এমন এক জাদু আছে, যে তাকে দেখবে সেই মোহমুগ্ধ হয়ে পড়বে। তার কথা বলার ভঙ্গি এমন, যে তার কথা শুনবে, সেই কৃতদাসের মত তার কথায় নাচতে শুরু করবে। আন্দালুসিয়ার এক জেনারেল আবদুল আযীযকে বলেছিল, এই নারীর রূপ-যৌবন, আর পা থেকে মাথা পর্যন্ত প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এমন অসম্ভব আকর্ষণীয় যে, সে রডারিকের মত জালেম বাদশাহকেও মোমের মূর্তিতে পরিণত করেছিল।
এজেলুনা তার চেহারা থেকে নেকাবের আবরণ সরিয়ে নেওয়ার সাথে সাথে আবদুল আযীয একেবারে আঁতকে উঠলেন। বিষ্ময়ে বিস্ফারিত চোখে তিনি শুধু তাকিয়ে রইলেন। তার মুখ থেকে একটি কথাও সরল না। শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা বলতে যা বুঝায়—-আবদুল আযীযের অবস্থা হয়েছিল ঠিক তেমন। এজেলুনার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে নেশা ছড়ানো রহস্যময় দৃষ্টিতে আবদুল আযীযের দিকে অপলক তাকিয়ে রইল।
‘তুমি রানী হবে। অবচেতন মনে আবদুল আযীযের মুখ থেকে বের হয়ে এলো। এ রাজ্যের রানী হবে তুমি। তুমি হবে আমার অন্তর রাজ্যের রাজরানী।
‘কোন নিয়ম অনুযায়ী বিয়েশাদী হবে? এজেলুনা জিজ্ঞেস করল।
‘ইসলামী রীতি অনুযায়ী বিবাহ হবে।’ আবদুল আযীয বললেন। আর তুমি হবে…।’
‘আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করব না।’ এজেলুনা বলল। তবে ইসলামী রীতি অনুযায়ী বিয়ে বসতে রাজি আছি আমি।
আবদুল আযীয হতভম্ব হয়ে গেলেন। তিনি বারবার এজেলুনাকে বুঝালেন; কিন্তু এজেলুনা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে রাজি হল না।
আবদুল আযীযের বারবার বুঝানোর কারণে এজেলুনা বলল, ‘ঠিক আছে, আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করব; তবে কয়েক দিন পর।’
অগত্যা আবদুল আযীয এজেলুনার শর্ত মেনে নিলেন এবং এজেলুনার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করার বিষয়টি গোপন রাখলেন। পর দিন আবদুল আযীযের সাথে এজেলুনার বিয়ে হয়ে গেল। আবদুল আযীয এজেলুনার রূপের মোহে এমনই অন্ধ হয়ে পড়লেন যে, তিনি নিজের ব্যক্তিত্বকে এজেলুনার অস্তিত্বের সামনে বিলীন করে দিলেন। তিনি ঘুণাক্ষরেও টের পেলেন যে, কিছু দিন পরে এ নারীই তাকে এমন এক পরিণতির সম্মুখীন করবে, যা দেখে ইতিহাস স্তব্ধ হয়ে যাবে।
***
প্রায় দেড় বছর পূর্বে মুসা বিন নুসাইর মেরিডার মত আরেকটি বড় শহর এ্যাশবেলিয়া জয় করেছিলেন। সেখানে প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজকর্ম সম্পাদনের জন্য যথেষ্ট সংখ্যক আরবী প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তাই অনুপায় হয়ে ইহুদিদের উপর বেশ কয়েকটি প্রশাসনিক দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল।
