‘এ ব্যাপারে আমি কোন নির্দেশ দেব না।’ মুসা বিন নুসাইর বললেন। বরং এ ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশ হল, কোন জাতিকে পরাজিত করলে সেই জাতির ধর্ম ও ইবাদতখানার প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা যাবে না। ইসলাম ধর্মের প্রচার অবশ্যই করতে হবে, তবে কারও মনে কষ্ট দিয়ে নয়। কথাবার্তা ও আচার-আচরণে উত্তম আদর্শ পেশ করতে হবে। আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন, আপনাদের উপাসনালয়ের সম্মান পূর্ণমাত্রায় রক্ষা করা হবে। তবে আপনাকে আমি এ ব্যাপারে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেব, যেন আপনাদের গির্জাসমূহে হুকুমতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহমূলক কোন কথা না হয় এবং আপনি ও আপনার পাদ্রিদের কেউ যেন নিজ ধর্মের প্রচার-প্রসার না করে।’
‘আপনি কি ইসলামের তাবলীগ করবেন? প্রধান পাদ্রি বললেন।
‘ইসলামের তাবলীগ করার কোন প্রয়োজনই হবে না।’ মুসা বিন নুসাইর বললেন। বেশ কয়েক দিন হয়ে গেছে, এই রাজ্য ইসলামী সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আপনি কি এ ব্যাপারে কাউকে কোন অভিযোগ করতে শুনেছেন বা এমন কোন সংবাদ পেয়েছেন যে, কোন মুসলিম সিপাহী বা কোন অফিসার কোন নারীর উজ্জতের উপর আক্রমণ করেছে?
“জ্বি না। প্রধান পাদ্রি বললেন।
‘কোন মুসলমান কি কারও ঘরে প্রবেশ করে কোন কিছু চেয়েছে?”
‘জি না।’
‘কোন মুসলমান কি কারও সাথে অভদ্র আচরণ করেছে?
‘জ্বি না।’
‘এটাই ইসলামের তাবলীগ। আমরা আমাদের কর্মকাণ্ড দিয়ে এই তাবলীগই করে থাকি। মুসা বিন নুসাইর বললেন। আপনার ওয়াজ-নসীহত আমাদের এই তাবলীগের কোন ক্ষতিই করতে পারবে না। আমি আপনার উপর আরেকটি হুকুম জারি করব, আপনি বা আপনার কোন পাদ্রি যেন কোন ইহুদি বা খ্রিস্টান মেয়েকে জোরপূর্বক গির্জার সেবিকা না বানায়। আমি ভাল করেই জানি, এ সকল মেয়েদের সাথে আপনাদের গির্জাসমূহে কী ধরনের আচরণ করা হয়ে থাকে। আমি আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আমরা আমাদের সাথে কোন শাহী ফরমান বা শাহী প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে আসিনি। আমরা একটি আদর্শ ও একটি জীবনপদ্ধতি নিয়ে এসেছি। আমরা মানুষের মুখ বন্ধ করার জন্য আসিনি; বরং মানুষের মুখে ভাষা দিতে এসেছি। আমরা চাই, আল্লাহর প্রতিটি বান্দা তাদের নিজস্ব মত প্রকাশ করুক। তাদের মাঝে এই পরিমাণ সাহস সঞ্চারিত হোক যে, আমি যদি ভুল পথে চলি তাহলে তারা আমাকে প্রতিহত করবে এবং আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে।’
প্রধান পাদ্রি হয়তো আরও কিছু বলতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু মুসা বিন নুসাইরের কথা তার মুখ বন্ধ করে দিল। প্রধান পাদ্রিকে প্রভাবিত করার জন্য এটাই যথেষ্ট ছিল যে, একজন বিজয়ী সিপাহসালার তার কথা শুনার জন্য যেখানে ছিলেন, সেখানেই মাটির উপর বসে পড়েছিলেন। প্রধান পাদ্রি উঠে সম্মান প্রদর্শন করে চলে গেলেন।
***
‘সম্মানিত পিতা! এক রাতে মুসা বিন নুসরাইরের বড় ছেলে আবদুল আযীয একাকী তার বাবাকে বলল। ঐ মেয়েটিকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে, যাকে আপনার সামনে উপস্থিত করা হয়েছিল। তার নাম হল, এজেলুনা।’
‘তার চেহারার উপর তো নেকাব ছিল। মুসা বিন নুসাইর বললেন। ঐ পাতলা নেকাবের ভিতরেও মেয়টিকে অত্যন্ত সুন্দরী মনে হচ্ছিল। বাস্তবে এতটা সুন্দরী নাও হতে পারে।’
‘সম্মানিত পিতা! আমি তার চেহারার প্রতি লক্ষ্য করিনি। আবদুল আযীয বললেন। তার সাহসিকতা আমাকে প্রভাবিত করেছে। সে আপনার সাথে যেভাবে কথা বলছিল, আন্দালুসিয়ার কোন জেনারেলও এমনভাবে আপনার সাথে কথা বলতে সাহস করেনি। আমি এখানকার জেনারেলদের কাছ থেকে এবং দুরক্ষক রাজেলিউর কাছ থেকে তার সম্পর্কে সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করেছি। অনেক বেসামরিক লোকদের কাছেও জিজ্ঞেস করেছি, তারা সকলেই আমাকে জানিয়েছে যে, সে অত্যন্ত আত্মমর্যাদাশীলা এক নারী। শাহী খান্দানের সাথে তার সম্পর্ক। এখানের প্রত্যেক জেনারেল, দুর্গরক্ষক এবং কয়েকজন প্রশাসক তাকে বিয়ে করার জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই নারী সকলকে বলেছিল, প্রথমে মেরিডাকে রক্ষা কর। অতঃপর হামলাকারীদেরকে চিরতরে ধ্বংস করে দিয়ে বেদখল হওয়া নিজেদের অন্যান্য শহরগুলোর উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা কর।
শিশু-বৃদ্ধ-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের অন্তরে সে দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। প্রতিটি সিপাহী এবং প্রত্যেকটি নাগরিক দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। সামরিক, কী বেসামরিক–একজন মানুষও রাতের বেলা ঘুমিয়ে আরাম করত না। এই নারী ঘোড়ায় আরোহণ করে নাঙ্গা তলোয়ার নিয়ে শহরের অলিগলিতে আর সিপাহীদের ছাউনিসমূহে ঘুরে বেড়াত। আমি এমনই এক নারীকে বিয়ে করতে আই।’
‘প্রিয় পুত্র আমার! মুসা বিন নুসাইর বললেন। এই নারীকে বিয়ে করার অনুমতি আমি তোমাকে দেব। তার আগে তুমি তাকে ভালোভাবে যাচাইবাছাই করে নাও। সে শাহীখান্দানের মেয়ে। তাছাড়া সে একজন বাদশাহর স্ত্রীও ছিল। তুমি ভাল করে জান, শাহী খান্দানের লোকদের স্বভাব-চরিত্র কেমন হয়ে থাকে। এমন যেন না হয় যে, তার পেট থেকে আমাদের বংশের যে ধারা বিস্তার লাভ করবে, তারা আমাদের জন্য লজ্জা ও অপমানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
***
মেরিডার শাহীমহলের একটি পৃথক কামরায় এজেলুনার থাকার ব্যবস্থা করা হল। মুসা বিন নুসাইর এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, যুদ্ধবন্দী কোন নারীকে বিরক্ত করা হবে না। এজেলুনার জন্য তো পৃথক খাদেমাও রাখা হয়েছিল। একদিন এজেলুনার খাদেমা তাকে সংবাদ দিল যে, এক আরব সেনাপতি তার সাথে সাক্ষাৎ করতে চায়।
