‘আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করি।’ মুসা বিন নুসাইর বললেন। ‘আমাদের মনযোগ এখন গোটা আন্দালুসিয়ার দিকে। সুন্দরী কোন রমণীর দিকে নয়। আমরা তোমার সাহসিকতা ও ইজ্জতের প্রতি পূর্ণরূপে খেয়াল রাখব। আমি তোমাকে অভয় দিচ্ছি, তুমি কারো দাসী বা রক্ষিতা হবে না।’
ফরাসী ঐতিহাসিক ডন পাস্কেল লেখেছেন, এজেলুনার রূপ-যৌবনে আর চলনে-বলনে এক ধরনের চৌম্বকীয় আকর্ষণ তো ছিলই, কিন্তু তার কথা বলার স্টাইলই এমন ছিল যে, মুহূর্তেই সে যে কোন পুরুষকে মোহাচ্ছন্ন করে ফেলতে পারত। মুসা বিন নুসাইর, তাঁর পুত্রদ্বয় ও যেসকল জেনারেল সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তারা সকলেই এজেলুনার স্পষ্টবাদিতা আর চারিত্রিক দৃঢ়তা দেখে এত বেশি প্রভাবিত হয়ে পড়লেন যে, এর প্রতিক্রয়া তাদের চেহারায় সুস্পষ্টরূপে ফুটে উঠল।
মুসলিম বাহিনী শহরে প্রবেশ করার সাথে সাথে মুসা বিন নুসাইর নির্দেশ দিলেন, যেন মেরিডাবাসী ও সেনাবাহিনীর জন্য খানা তৈরী করা হয়। কেউ-ই যেন ক্ষুধার্ত না থাকে সেদিকে যেন সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়। আর আটক করা রসদপত্র যেন বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
***
মেরিডার যুদ্ধে বিজয় লাভ করা কোন সাধারণ ঘটনা ছিল না। ইট-পাথরের বিবেচনায় এই দূর্গ এমনিতেই অত্যন্ত মুজবুত ছিল। কিন্তু জনসাধারণের নির্ভিক মনোবল আর যুদ্ধ জয়ের স্পৃহা এই দূর্গকে দুর্ভেদ্য ও অপরাজেয় এক দূর্গে পরিণত করেছিল। একমাত্র মেরিডার দূর্গই এমন একটি দূর্গ ছিল, যা কেবল অবরোধের মাধ্যেমে দখল করা সম্ভব ছিল না। মেরিডা রাজধানী টলেডু থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ, এটি ছিল ধর্মীয় তীর্থস্থান। প্রধান পাদ্রি এখানেই অবস্থান করতেন।
মুসা বিন নুসাইর শহর ও আশপাশের এলাকার প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পাদন করার জন্য আরব প্রসাশক নিয়োগ করেন, আর খ্রিস্টানদেরকে তাদের অধীনস্থ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। তিনি বিশেষভাবে তাদেরকে এই নির্দেশ প্রদান করেন যে, প্রত্যেক খ্রিস্টান নাগরিক থেকে তার সামর্থ অনুপাতে কর উসুল করবে। কাউকে এতবেশি কর আদায় করতে বাধ্য করবে না, যাতে তাকে বিবি-বাচ্চা নিয়ে উপোস থাকতে হয়।
প্রধান পাদ্রি পাদ্রিদের সংক্ষিপ্ত একটি দল নিয়ে মুসা বিন নুসাইরের সাথে দেখা করতে এলেন। মুসা বিন নুসাইর সেসময় শহর দেখতে বের হয়েছিলেন। শহরের মাঝখানে বড় ধরনের একটি মাঠ ছিল। সেনাবাহিনীর সদস্যরা সেখানে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করত। বিভিন্ন পাল-পার্বণ উপলক্ষে এখানে খেলা-ধূলা ও মেলার আয়েজন করা হত। মুসা বিন নুসাইর এই মাঠ পর্যবেক্ষণ করছিলেন। এ সময় তাঁকে সংবাদ দেওয়া হল যে, প্রধান পাদ্রি তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে চায়। সে জানতে চাচ্ছে, সম্মানিত আমীর কখন শাহী দরবারে বসবেন?
মুসা বিন নুসাইর দেখলেন, প্রধান পাদ্রি আরও কয়েকজন পাদ্রিকে সাথে নিয়ে মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি তাদেরকে ডেকে পাঠালেন।
‘আমীরে আলা, দরবারে কখন বসবেন?’ প্রধান পাদ্রি বলল। আমি ব্যক্তিগত কয়েকটি আবেদন নিয়ে আপনার সাথে কথা বলতে চাই।’
‘আপনি যখন এসে গেছেন তখন এখানেই দরবার বসিয়ে নিচ্ছি।’ মুসা বিন নুসাইর মুচকি হেসে বললেন। আমরা সর্বক্ষণ আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে আছি। বান্দার কোন দরবার থাকতে পারে না। আসুন, এখানেই বসা যাক।
এ কথা বলেই মুসা বিন নুসাইর মাটিতে বসে পড়লেন।
ডন পাস্কেল লেখেছেন, প্রধান পাদ্রি মাটিতে বসতে ইতস্তত করছিলেন। তিনি খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জুব্বা পরেছিলেন। জুব্বার নিচে পাতলুন ছিল। তার জুতার কালার চকচক করছিল। পাদ্রি হতভম্ব হয়ে চিন্তা করতে লাগলেন, একজন বিজয়ী সিপাহসালার, যিনি এই রাজ্যের গভর্নরও তিনি এমন নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে মাটিতে বসে পড়লেন! পাদ্রির এই হতভম্ব চাহনীর মাঝে এমন একটা ভাব ছিল যে, তিনি নিজেকে বাদশাহর সমপর্যায়ের মনে করতেন। তাই মাটিতে বসাকে নিজের জন্য অপমানকর মনে করছিলেন।
‘বসে পড়ন। মুসা বিন নুসাইর বললেন। আমাদের নিয়ম-কানুন এমনই। যেখানেই কেউ কোন নিবেদন, অভিযোগ বা সমস্যা পেশ করে, সেখানেই আমরা তা শুনি এবং তার সমাধান করি। আমি যদি আপনাকে বলি, অমুক দিন, অমুক সময় আপনি শাহীদরবারে আসুন, সেখানে আমি আপনার কথা শুনব তাহলে আমি একজন অপরাধী হব। আল্লাহ তাআলার ইরশাদ হল, “যেখানে এবং যে অবস্থায় তোমরা আমাকে আহ্বান করবে, আমি তোমাদের কথা শ্রবণ করব।” আল্লাহ তাআলার এই ফরমানের পর বান্দার আর কি অধিকার থাকতে পারে? আল্লাহর দেওয়া সম্মান পেয়ে বান্দা যদি আল্লাহর অন্যান্য বান্দাদের জন্য সময় ও স্থান নির্ধারণ করে দেয় তাহলে কি তা ঠিক হবে? আমি ফেরাউন নই; আমি কোন বাদশাহও নই। আপনি তো আপনার সম্প্রদায়ের নেতা ও সম্মানিত ব্যক্তি। আপনার সম্প্রদায়ের একজন সাধারণ ব্যক্তিও যদি চলার পথে আমাকে দাঁড়াতে বলে তাহলে আমি তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে যাব এবং তার কথা শুনব।’
‘আপনাকে আল্লাহ তাআলার হুকুমের অনুগত মনে হয়। প্রধান পাদ্রি মাটিতে বসতে বসতে বললেন। আমি আপনার কাছে নিবেদন করতে চাই যে, আমাদের গির্জাগুলোর কোন অসম্মানী যেন না করা হয় এবং আমাদের ইবাদত-বন্দেগীর উপর যেন কোন বাধ্য-বাধকতা আরোপ করা না হয়।’
