আন্দালুসিয়ার ইতিহাস রচনাকারী ঐতিহাসিকগণ লেখেছেন যে, আন্দালুসিয়ার সেই জেনারেল সন্ধির জন্য কতগুলো শর্ত পেশ করল, যার সবগুলোই ছিল অর্থহীন, আর অযৌক্তিক। কোন ঐতিহাসিকই সবগুলো শর্তের কথা উল্লেখ করেননি। ডা. কোন্ডে দুটি শর্তের কথা উল্লেখ করেছেন। একটি শর্ত হল, মেরিডার সকল সৈন্যকে এখান থেকে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার অনুমতি দিতে হবে। কাউকে যুদ্ধ বন্দী করা যাবে না। দ্বিতীয় শর্ত হল, সেনাবাহিনীর জন্য খানার ব্যবস্থা করতে হবে।
মুসা বিন নুসাইর এ সকল শর্ত প্রত্যাখ্যান করে দিয়ে আন্দালুসিয়ার জেনারেলকে বললেন, তোমরা পরাজিত হয়েছ, নাকি আমরা পরাজিত হয়েছি? তোমরা নও আমরা শর্ত আরোপ করব। তোমরা যদি আমাদের শর্ত না মান তাহলে তোমাদের বাহিনীকে আমাদের সাথে মুকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত হতে বল।
‘আপনার শর্ত কি? আন্দালুসিয়ার জেনারেল জানতে চাইল।
‘তোমাদের সকল সিপাহী হাতিয়ার সমর্পণ করবে। মুসা বিন নুসাইর বললেন। তোমাদের সকল সিপাহী আমাদের কয়েদী হবে। আমরা নয় মাস পর্যন্ত তোমাদেরকে অবরোধ করে রেখেছি। এই দীর্ঘ সময়ে আমাদের বহু সিপাহী জীবন দিয়েছে। আমরা তার মূল্য আদায় করব। শহরে যত স্বর্ণ, অলংকার আছে–চাই তা সরকারী হোক বা জনগণের হোক, সেগুলো আমাদের কাছে অর্পণ করতে হবে। তোমাদের উদ্দেশ্য যেহেতু পরিষ্কারভাবে বুঝা যাচ্ছে না, তাই তোমাদের কয়েকজন নেত্রীস্থানীয় লোক ও সকল প্রশাসককে আমাদের কাছে পণ হিসাবে রাখতে হবে। তোমরা এখন ফিরে যেতে পার, যদি শর্ত মঞ্জুর হয় তাহলে তোমাদের সিপাহীকে এক জায়গায় সমবেত কর এবং তাদের হাতিয়ার এক স্থানে একত্রিত কর। আর তোমাদের সকল প্রশাসককে আমাদের কাছে নিয়ে এসো।’
আন্দালুসিয়ার জেনারেল কথা না বাড়িয়ে ফিরে গেল। মুসা বিন নুসাইর তার বাহিনীকে হামলা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে বললেন।
অল্প কিছুক্ষণ পরেই সেই জেনারেল দূর্গ থেকে বের হয়ে এলো। তার সাথে কমপক্ষে পঞ্চাশজন পুরুষ, আর সমসংখ্যক নারী ছিল। তাদের লেবাস-ছুরত এ সাক্ষ্য দিচ্ছিল যে, তারা সকলেই সম্ভ্রান্ত ও উচ্চ বংশের লোক।
‘এদের সবাইকে আপনি পণ হিসাবে রাখতে পারেন। জেনারেল মুসা বিন নুসাইরকে বলল। তবে আমি আপনাকে অনুরোধ করব, এদের সাথে সাধারণ কয়েদীর মত ব্যবহার যেন না করা হয়। এরা সাধারণ কোন মানুষ নয়; বরং এরা সকলই শীর্ষস্থানীয় প্রশাসক। এদের মাঝে শাহীখান্দানের লোকও আছে। সেনাবাহিনী তাদের হাতিয়ার এক জায়গায় একত্রিত করেছে, আপনি এখন শহরে প্রবেশ করতে পারেন।
‘আমরা এ সকল পণবন্দীকে সম্মানের সাথেই রাখব।’ মুসা বিন নুসাইর বললেন। তুমি তো অবশ্যই জান যে, আমরা কেন এদেরকে পণবন্দী করতে চেয়েছি?’
‘আমি একজন যুবতী মেয়ের ব্যাপারে কিছু বলতে চাই। জেনারেল বলল। তার নাম হল, এজেলুনা। সে বাদশাহ রডারিকের বিধবা স্ত্রী। আপনার কাছে তার হয়তো কোন গুরুত্ব নেই, কিন্তু সে আমাদের কাছে একজন পূজনীয় ব্যক্তি।
সে তোমাদের বাদশহর বিধবা পত্নী–এ জন্যই কি তার প্রতি তোমাদের এই ভক্তি?’ মুসা বিন নুসাইর জিজ্ঞেস করলেন।
‘না, সিপাহসালার। ঠিক এ জন্য নয়। জেনারেল বলল। রডারিকের বিধবা স্ত্রীর সংখ্যা কত হবে, তার সঠিক হিসাব কারও জানা নেই। তবে এই নারীর প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করার কারণ হল, তিনিই মেরিডার জনসাধারণ আর সিপাহীদের মাঝে এক দুর্দমনীয় স্পৃহা আর সাহস জাগিয়ে তুলেছিলেন। তার উৎসাহে-ই আমাদের সিপাহীরা জীবনবাজি রেখে লড়াই করছিল। তিনি শহরের প্রতিটি নারী আর শিশুকে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত করে তুলেছিলেন। যদি রসদ বন্ধ না হয়ে যেত তাহলে আপনি এ শহরের কাছেও আসতে পারতেন না। এই নারী দিন-রাত সিপাহী ও শহরবাসীকে উদ্দীপ্ত করে রাখতেন, তাদের সাহস যোগাতেন। আপনি হয়তো তাকে যুদ্ধাপরাধী হিসাবে শাস্তি দেবেন। কারণ, সেই আপনার এত দীর্ঘ অবরোধকে সফল হতে দেয়নি। তার জন্যই আপনার অনেক সিপাহীকে জীবন দিতে হয়েছে। তার ব্যাপারে আপনার উপর কোন শর্ত আরোপ করার ক্ষমতা আমার নেই, তবে আমি আপনাকে অনুরোধ করব–এই মহীয়সী নারীর যেন কোন অসম্মান না হয়।’
‘এমন নারীকে আমরাও সম্মানের অধিকারী মনে করি।’ মুসা বিন নুসাইর বললেন। আমরা মানুষের সম্মান ও ইজ্জতের হেফাযতকারী। এ সকল নারীদের মাঝে কে সেই নারী–তাকে আমি দেখতে চাই।’
জেনারেল পণবন্দী নারীদের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে ইশারা করল। নারীদের মধ্যে থেকে কালো পোশাক পরিহিতা ও কালো নেকাবে মুখ ডাকা একজন নারী সামনে অগ্রসর হল। একমাত্র এই নারীর চেহারায়-ই নেকাব ছিল। আর অন্যদের চেহারা ছিল উন্মুক্ত। এই নারীই হল এজেলুনা। কালো নেকাবের ভিতর থেকে তার নীলাভ চোখের দীপ্তি, আর ফর্সা চেহারার উজ্জ্বল্য দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল। কিন্তু স্পষ্টরূপে কোন কিছুই বুঝা যাচ্ছিল না। তার দীর্ঘ ও চমৎকার দেহ-সৌষ্ঠব যে কোন পুরুষের জন্যই ছিল কামনার বস্তু। তার চলনে-বলনে এক অদৃশ্য আকর্ষণ ছিল।
‘আমরা তার চেহারা নেকাব ছাড়া দেখতে চাই।” মুসা বিন নুসাইর বললেন।
‘আমি আমার চেহারা কেবল তার সামনেই উন্মুক্ত করব, যে আমাকে বিবাহ করবে। এজেলুনা বলল। আর আমি কেবল তাকেই বিবাহ করব, যার সম্মান ও মর্যাদা হবে বাদশাহী। আমি কারও দাসী বা রক্ষিতা হবো না। আমি কোন শাহী পুরুষের স্ত্রী হতে চাই। আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যদি কেউ আমাকে ভোগ করতে চায়, তাহলে সেদিন হবে আমার ও তার জিন্দেগীর শেষ দিন। আমি রানী ছিলাম, রানীই থাকব। আপনি তো নিজেই ওয়াদা করেছেন, আপনি আমার ইজ্জত-সম্মান রক্ষা করবেন।’
