এই ঘটনার পর মুসলিম বাহিনী মেরিডার অধিবাসীদের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। সাত-আট দিন অতিবাহিত হওয়ার আগেই মেরিডা শহরে দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। মেরিডার অধিবাসীরা সবচেয়ে বড় যে সমস্যার সম্মুখীন হল, তা হল তাদের শরাবের মওজুদ একেবারেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। খানাপিনার অভাবে মানুষের মানসিক অবস্থা কিছুটা বিরূপ হলেও সারাক্ষণ নেশায় ডুবে থাকা মানুষ যখন নেশাকর দ্রব্য থেকে বঞ্চিত হয় তখন তাদের অবস্থা পাগলা কুকুরের মত হয়ে যায়। মেরিডার অধিবাসী আর সৈন্যদের অবস্থাও প্রায় এমনই হয়ে গিয়েছিল। তারা পরস্পরে মারামারি, আর হানাহানিতে জড়িয়ে পড়ল। তাদের মন থেকে লড়াই করার স্পৃহা আর মনোবল ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে এলো।
আন্দালুসিয়ার সৈন্যরা নদীর ঘাট দখলমুক্ত করার জন্য বার দুয়েক হামলা করল বটে; কিন্তু মুসা বিন নুসাইর নদীর ঘাটে এমন মুজবুত পাহারার ব্যবস্থা করেছিলেন যে, প্রত্যেক বারই তারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেল। তৃতীয়বার আক্রমণ করার কোন চেষ্টাই তারা আর করল না।
***
বলো, এজেলুনা! এমন পরিস্থিতিতেও কি তুমি সিপাহীদের মনোবল বৃদ্ধি করতে পারবে? ‘রাজেলিউ জিজ্ঞেস করল।
‘হ্য আমি পারব।’ এজেলুনা বলল। আমি জানি, শক্তিশালী দুশমনের মুকাবেলা করা সম্ভব, কিন্তু ক্ষুধ-পিপাসার মুকাবেলা করা কোন শক্তিশালী দুশমনের পক্ষেও সম্ভব নয়। তারপরও আমি পূর্বের মতই মানুষের মাঝে উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করার চেষ্টা করব।’
‘বাস্তবতার প্রতি আমাদের লক্ষ্য করা উচিত, এজেলুনা!’ রাজেলিউ বলল। ‘সকলই ক্ষুধার্ত। আমি অনেক চিন্তা-ভাবনা করে কথা বলছি। এখন আর মেরিডাকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। ক্ষুধার্ত প্রজারা বিদ্রোহ শুরু করে দিয়েছে। সিপাহীরা শরাব চাচ্ছে। জনগণকে ক্ষুধার্ত রেখে সিপাহীদের খানার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর ফলাফল হল এই যে, জনগণ সিপাহীদেরকে আর কখনও ভাল চোখে দেখবে না। আমি তোমাকে এই পরামর্শ দিচ্ছে যে, চল আমরা রাতের আঁধারে অন্য কোথাও চলে যাই। আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। রাতে শহরের ফটক আমাদের জন্য খোলা থাকবে।
‘কোথায় যাব?’ এজেলুনা জিজ্ঞেস করল। এমন কোন শহর কি অবশিষ্ট আছে, যা এখনও মুসলিম বাহিনীর হস্তগত হয়নি?
‘আমি তোমাকে ফ্রান্স নিয়ে যাব।’ রাজেলিউ বলল।
‘না।’ এজেলুনা বলল ‘এখনই এখান থেকে চলে যাওয়ার কোন ইচ্ছা আমার নেই।’
এর পরিণাম কি হবে তুমি জান?’ রাজেলিউ বলল। মুসলমানদের সিপাহসালার বা কোন জেনারেল তোমাকে তার দাসী বানিয়ে রাখবে। মনে রেখ, দাসী কখনও স্ত্রীর মর্যাদা পায় না। লালসার সামগ্রী হয় মাত্র। তাছাড়া তুমি তো রানী হওয়ার স্বপ্ন দেখছ। চল, এখনও সময় আছে। আমরা এখান থেকে ফ্রান্স চলে যাই। সেখানে গিয়ে আমরা বিবাহ করব। আমরা শাহী খান্দানের লোক। সেখানে আমাদের প্রতি যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করা হবে। যে পরিমাণ ধন-দৌলত আমি সাথে করে নিয়ে যাচ্ছি, তা দেখলে তুমি অবাক হয়ে যাবে।
এজেলুনার ঠোঁটে তিরস্কারের সূক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠল।
তুমি কি আমাকে কোন জবাব দেবে না? রাজেলিউ বলল।
‘আরও দুই-এক দিন অপেক্ষা কর।’ এজেলুনা বলল।
***
সকাল বেলা এজেলুনা ঘোড়ায় আরোহণ করে শহরে বের হলে শহরবাসী তাকে ঘিরে ধরল। কিছুদিন পূর্বেও মানুষ তাকে দেখে মেরিডার জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়ে যেত। তাকে দেখে জয়ধ্বনী করত। আর এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি উল্টে গেছে। লোকজন তাকে দেখলেই বিক্ষোভ করছে। একের পর এক প্রশ্নের সম্মুখীন তাকে হতে হচ্ছে।
কেউ জিজ্ঞেস করছে, আমাদের সেনাবাহিনী দূর্গের বাইরে কি করছে?
কেউ বা বলছে, সেনাবাহিনী হামলা করে অবরোধ ভাঙতে পারছে না কেন?
‘আমরা আর কত দিন আমাদের বাচ্চাদেরকে ক্ষুধার্ত রেখে সিপাহীদের উদরপূর্তি করব?
‘আমরা ক্ষুধার্ত, আমাদেরকে খাদ্য দাও, আমরাই লড়াই করব।’ এজেলুনা এ ধরনের নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছিল। অবশেষে সে জেনারেলদের কাছে গেলে তারা তাকে বলল, ‘সেনাবাহিনীর খাদ্যের মওজুদও শেষ হয়ে গেছে। দুই-একটি সেনাছাউনি থেকে এ সংবাদও এসেছে যে, তারা হৃষ্টপুষ্ট দুটি ঘোড়া জবাই করে খেয়ে ফেলেছে। তুমি রাজেলিউকে বলো, সে যেন মুসলমানদের হাতে শহরের দায়িত্ব অর্পণ করে দেয়।’
এজেলুনা রাজেলিউর কাছে গিয়ে বলল, তুমি শহরের ফটক খুলে দেওয়ার নির্দেশ দাও।’ কিন্তু রাজেলিউ এজেলুনার প্রস্তাবে সম্মত হতে চাচ্ছিল না।
‘তুমি কি চাও, জনসাধারণ আর সেনাবাহিনী, বেঘোরে জীবন হারাক। এজেলুনা রাজেলিউকে বলল। মুসলিম বাহিনী অতিসত্বর এ কথা জানতে পারবে যে, আমাদের সেনাবাহিনী ক্ষুধ-পিপাসায় দিন অতিবাহিত করছে। তারা লড়াই করার জন্য মোটেই প্রস্তুত নয়। তখন তারা হামলা করে দেবে এবং শহরে প্রবেশ করে প্রতিটি ঘরে লুটতরাজ চালাবে। যুবতী মেয়েদেরকে নিজেদের ইচ্ছা মতো ব্যবহার করবে, আর শহরে ব্যাপকহারে হত্যাযজ্ঞ চালাবে।
ঐতিহাসিকগণ লেখেন, এজেলুনার সাথে রাজেলিউর আলোচনা শেষ হওয়ার অল্প কিছুক্ষণ পর একজন জেনারেল চারজন সিপাহীসহ সফেদ ঝাণ্ডা নিয়ে দুর্গ হতে বের হল। মুসা বিন নুসাইর তাদেরকে দেখে ঘোড়ায় চড়ে সামনে অগ্রসর হলেন। দুইজন সালার আর একজন দোভাষী তার সাথে ছিল। মুসা আন্দালুসিয়ার জেনারেলের সাথে হাত মিলালেন।
