‘আপনি নিশ্চয় আমাদের বাহিনীকে লড়াই করতে দেখেছেন। প্রথমজন বলল। আমাদের কথার অর্থ এই নয় যে, আমরা কেবল শরাব পান করেই লড়াই করতে পারি। আমাদের মাঝে আত্মমর্যাদাবোধ আছে এবং দেশ রক্ষার জযবাও আছে। কিন্তু এই শরাব আমাদেরকে অনেক বেশি সাহসী বানিয়ে দেয়। এখন পরিস্থিতি এই দাঁড়িয়েছে যে, আমাদের সৈনিকরা রুটি-গোসতের পরিবর্তে শরাব পানে বেশি অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে।
‘ঐ রাস্তা ছাড়া শহরে রসদ পৌঁছার অন্য কোন রাস্তা আছে কি? মুসা বিন নুসাইর জিজ্ঞস করলেন।
‘রাস্তা তো কয়েকটাই আছে। প্রথমজন বলল। কিন্তু আপনার ফৌজের উপস্থিতির কারণে এই একটি রাস্তাই অবশিষ্ট আছে। আমরা এখন এই রাস্তাই ব্যবহার করছি। এই রাস্তাটি নিরাপদ হওয়ার কারণ হল, এটি শহরের পিছন দিকে নদীর তীরে। আর নদী থেকে শহর পর্যন্ত পুরো এলাকাটাই পাহাড়ী ও দুর্গম। আপনি এদিকটাই সম্ভবত এ কারণেই আপনার বাহিনী মোতায়েন করেননি যে, এলাকাটি লড়াই করার উপযুক্ত নয়। আমরা অনেক কষ্টে এই রাস্তা দিয়ে শহরে সামানপত্র নিয়ে যাই। এই রাস্তাটিও যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে শহরে দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে।’
এই দুজনকে নিয়ে যাও।’ মুসা বললেন। এদের সাথে ভাল ব্যবহার করবে।
আন্দালুসিয়ার সৈনিক দুজনকে নিয়ে যাওয়ার পর মুসা বিন নুসাইর তাঁবু থেকে বের হয়ে আসমানের দিকে তাকালেন। তিনি রাতের আকাশে তারার দিকে তাকিয়ে সময় অনুমান করতে চেষ্টা করলেন। তখন ছিল রাতের শেষ প্রহর। সেনাপ্রধানকে তিনি নির্দেশ দিলেন, পাঁচশ’ অশ্বারোহী আর দেড় হাজার পদাতিক সৈন্যের একটি বাহিনী এখনই সেখানে পাঠিয়ে দাও, যেখানে রসদবাহী কিস্তি এসে নোঙ্গর করে।
‘আবদুল্লাহ। মুসা বিন নসাইর তাঁর ছেলেকে লক্ষ্য করে বললেন। তুমিও বাহিনীর সাথে সেখানে যাবে। কেননা, তুমি সেই জায়গাটি দেখে এসেছ। শহরে রসদ আসা প্রতিহত করতে হবে। বহু দূরের পথ ঘুরে তোমরা সেখানে যাবে, যাতে শত্রুপক্ষ তোমাদের গতিবিধি সম্পর্কে কোন কিছু জানতে না পারে। এই বাহিনীকে নদীর পাড়ের ঢালু কোন জায়গায় গোপন করে রাখবে। যদি তোমাদের উপর আক্রমণ হয় তাহলে আমি পাল্টা আক্রমণের ব্যবস্থা করব। তোমরা এখনই রওনা হয়ে যাও। সুবেহ সাদিকের পূর্বেই সেখানে তোমাদের পৌঁছতে হবে। প্রত্যেক পদাতিকের কাছে অন্যান্য হাতিয়ারের সাথে তীর-ধনুকও থাকতে হবে। শত্রুপক্ষকে কিস্তির কাছেও ভিড়তে দেবে না। মেরিডার লোকজন রুটি-গোত ব্যতীত বাঁচতে পারবে, কিন্তু শরাব ছাড়া তারা একেবারে অন্ধ, আর উন্মাদ হয়ে যাবে। এখন থেকে তোমরা মেরিডাকে নিজেদের সম্পত্তি মনে করতে পার।
আবদুল্লাহ অস্ত্রে-শস্ত্রে সজ্জিত পাঁচশত অশ্বারোহী, আর দেড় হাজার সৈন্যের এক পদাতিক বাহিনী নিয়ে রওনা হয়ে গেলেন। প্রত্যেক সৈন্যের কাছে ছিল একটি ধনুক, আর তীর ভরা দুটি তুনির। আবদুল্লাহ বিন মুসা সোজা পথ ছেড়ে বহু দূরের পথ ঘুরে নদীর তীরে গিয়ে পৌঁছলেন। পথের দূরত্ব খুব বেশি ছিল না। আবদুল্লাহ তার বাহিনীকে হাঁটু পানিতে নেমে সামনে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন। যে জায়গাটিতে কিস্তি সামানপত্র খালাশ করত, আবদুল্লাহ যখন তার বাহিনীকে নিয়ে সেখানে পৌঁছলেন তখন মেরিডা শহরের বড় গির্জার ঘণ্টা বেজে উঠল আর মুসলিম বাহিনীর ক্যাম্প থেকে মোয়াজ্জিনের সুললিত কন্ঠের আজানের ধ্বনি ভেসে এলো।
আবদুল্লাহ যে জায়গাটিতে তার বাহিনীকে নিয়ে উৎপেতে ছিলেন, সেটি ছিল একটি গঞ্জের মত এলাকা। নদীর তীরে পাথর আর কাঠ দিয়ে বড় রকম একটি ঘাট বানানো ছিল। লোকজন নদী পথে সফর করার জন্য এই ঘাট থেকেই কিস্তিতে উঠত। এই নদীর উপর একটি ব্রিজও ছিল, কিন্তু সেখানে মুসলিম বাহিনী উপস্থিত থাকার কারণে সেই পথে রসদপত্র শহরে আনা সম্ভব ছিল না।
আবদুল্লাহ অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে তার বাহিনীকে চার দিকে ছড়িয়ে দিলেন। অল্প কিছুক্ষণ পরেই পূর্বের আকাশ ধীরে ধীরে ফর্সা হয়ে উঠল।
***
আন্দালুসিয়ার অফিসার দুজন যখন সকাল হওয়ার পরও ফিরে এলো না তখন তাদের খুঁজে একজন সৈনিককে পাঠানো হল। এই ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে বের হয়ে ছিল। সে যখন নদীর তীরে পৌঁছল তখন তার এক কাঁধে একটি তীর বিদ্ধ হল। সে তৎক্ষণাত ঘোড়া হাঁকিয়ে শহরের দিকে চলে গেল। সে ফিরে গিয়ে শুধু এই সংবাদ দিল যে, নদীর ঘাট মুসলিম বাহিনী দখল করে নিয়েছে।
সংবাদ শুনে একদল অশ্বারোহী প্রেরণ করা হল। এই অশ্বারোহী বাহিনী পাহাড়ি এলাকা ছেড়ে সামনে অগ্রসর হওয়ামাত্র তাদের উপর তীরবৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। অশ্বারোহী দলটি তীর বিদ্ধ হয়ে পলায়ন করা ছাড়া আর কোন উপায়: খুঁজে পেল না। তারাও বাধ্য হয়ে পিছু হটে গেল। মুসা বিন নুসাইর এই জায়গার ডানে ও বামে আরও কয়েকটি সৈন্যদল পাঠিয়ে দিলেন।
সেদিন আর কোন সংঘর্ষ হল না। বেলা গড়িয়ে যখন রাতের আঁধার নেমে এলো তখন মুসলিম বাহিনী দেখতে পেল যে, চারটি বড় বড় কিস্তি এসে নদীর ঘাটে নোঙ্গর করছে। মুসলিম বাহিনী অতিসহজেই কিস্তিগুলো দখল করে নিল। একটি কিস্তি মেষ আর বকরীতে পরিপূর্ণ ছিল। আর অন্যগুলো আটা, মাখন, ঘি, ডাল, তরিতরকারী আর শরাবের পিপে দিয়ে ভরপুর ছিল। আবদুল্লাহর হুকুমে শরাবের পিপেগুলো নদীতে ফেলে দেওয়া হল, আর মুসা বিন নুসাইরকে সংবাদ দেওয়া হল যে, সমস্ত সামানপত্র যেন অতিসত্তর এখান থেকে উঠিয়ে মুসলিম ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়।
