দুই-তিনজন ব্যক্তি নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছিল। কিছুক্ষণ পর তারা এতটাই কাছে চলে এলো যে, আবদুল্লাহ ও তার সাথীরা তাদের পদধ্বনি শুনতে পেলেন। আবদুল্লাহদের সাথে একজন আন্দালুসিয় ছিল। সে মাতৃভাষার মতই আরবি বলতে পারত। মুসলিম বাহিনী সবসময় তাদের সাথে একজন দোভাষী রাখত। এই দোভাষীদেরকে যথেষ্ট পারিশ্রমিক প্রদান করা হত। এসকল দোভাষী আন্দালুসিয় ও মুসলিম বাহিনীর মাঝে আলোচনার ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা পালন করত।
আগন্তুক ব্যক্তিরা কথা বলতে বলতে আবদুল্লাহদের কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারা স্থানীয় ভাষায় নিজেদের মাঝে কি বিষয়ে যেন কথা বলছিল। আবদুল্লাহ দোভাষীর কানের কাছে মুখ এনে ফিস ফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, তারা কি বলছে?
‘তারা কিস্তির ব্যাপারে কথা বলছে।’ দোভাষী আরবী ভাষায় ফিস ফিস করে বলল। তাদের একজন বলছে, আজও কিস্তি এলো না। আর অন্যজন গালি দিয়ে বলছে, আজ যদি কিস্তি না আসে তাহলে সবাইকে না খেয়ে মরতে হবে।’
অগম্ভক দুজন কথা বলছিল। দোভাষী আবদুল্লাহকে বলল, রহস্য উদঘাটিত হয়েছে। কিস্তির মাধ্যমেই রসদপত্র পৌঁছে। আর সেই রসদপত্র এই বিপদসংকুল পথ ধরেই শহরে প্রবেশ করে।’
‘তুমি মাথা নিচু করে হামাগুড়ি দিয়ে পিছনের দিকে চলে যাও।’ আবদুল্লাহ বললেন। আমাদের সাথীদের কাছে গিয়ে বল, তারা যেন হামাগুড়ি দিয়ে এখানে চলে আসে।’
আবদুল্লাহর সাথীরা কয়েক কদম পিছনে মাটির উপর শুয়েছিল। সংবাদ পৌঁছা মাত্র হামাগুড়ি দিয়ে তারা আবদুল্লাহর কাছে চলে এলো।
‘আন্দালুসিয়ার এই দুই সৈনিককে পাকড়াও করতে হবে।’ আবদুল্লাহ তার সাথীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন। তারপর আবদুল্লাহ দোভাষীর দিকে ফিরে বললেন, ‘তুমি দাঁড়িয়ে এমনভাবে চলতে চলতে তাদের কাছে পৌঁছে যাও, যেন তুমি অনেক দূর থেকে আসছ। তারা তোমার দিকে লক্ষ্য করলে, তুমি আশ-পাশের কোন গ্রামের নাম বলে সেখানে যাওয়ার রাস্তা জিজ্ঞেস করবে। তারপর যুদ্ধের কথা বলতে বলতে তাদেরকে এদিকে নিয়ে আসবে।’
আন্দালুসিয়ার দোভাষী লোকটি অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছিল। আন্দালুসিয়ার সৈনিক দু’জনের মুখ অন্য দিকে ফিরানো ছিল। দোভাষী ধীরে ধীরে উঠে তাদের দিকে চলতে শুরু করল। দোভাষীর পায়ের আওয়াজ শুনে সৈনিক দু’জন তার দিকে ফিরে তাকাল। তারা একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেস করল, এ-লোক আবার কে? দোভাষী পা হেঁচড়ে দুই-তিন কদম অগ্রসর হয়ে বসে পড়ল। ভাবটা এমন যেন অনেক দূর থেকে আসার কারণে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
‘ভাই আমি অনেক দূর থেকে এসেছি।’ দোভাষী স্থানীয় ভাষায় বলল। একেবারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। ভাই, এখানে এসো, আমাকে রাস্তা দেখিয়ে দাও।
আন্দালুসিয়ার সৈনিক দু’জন দোভাষীর কাছে এলো। দোভাষী দাঁড়িয়ে তাদের সাথে আলাপ করতে করতে এমন এক স্থানে গিয়ে দাঁড়ালো যে, তাদের পিঠ থাকল আবদুল্লাহর দিকে। সৈনিকদের থেকে মাত্র দুই গজ দূরে আবদুল্লাহ তার বাহিনীকে নিয়ে উৎপেতে ছিলেন। সৈনিক দু’জন কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই আবদুল্লাহ তাঁর চার সঙ্গীকে নিয়ে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং মুহূর্তেই তাদের হাতিয়ার ছিনিয়ে নিলেন। অতঃপর তাদেরকে সাথে নিয়ে নদীর তীর ধরে ক্যাম্পে চলে এলেন।
মুসা বিন নুসাইর ঘুমিয়ে ছিলেন। আবদুল্লাহ তাকে জাগ্রত করে বিস্তারিত বিবরণ দিলেন। এতোমধ্যে অন্যান্য জেনারেলগণও সেখানে এসে একত্রিত হলেন। আন্দালসিয়ার সৈনিক দু’জনকে মাঝখানে বসানো হল। তারা ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল।
‘ভয় পেয়ো না।’ মুসা বিন নুসাইর দোভাষীর মাধ্যমে তাদেরকে বললেন। তোমাদেরকে হত্যা করা হবে না। মেরিডা বিজয়ে যদি তোমরা আমাদেরকে সাহায্য কর তাহলে তোমাদেরকে মুক্ত করে দেওয়া হবে। তোমরা কেবল এতটুকু বল যে, শহরে রসদপত্র কোন পথে আসে এবং শহরের ভিতর খাদ্যসামগ্রীর মওজুদ কি পরিমাণ আছে?
‘রসদবাহী কিস্তি দেখার জন্যই আমরা নদীর তীরে গিয়েছিলাম।’ একজন আন্দালুসিয়ার সৈনিক বলল। আমরা দুজনই সেনাবাহিনীর অফিসার। দশ-বার দিন পরপর খাদ্যসামগ্রী ও অন্যান্য আসবাবপত্র নৌপথে আনা হয়। আমরা সেখান থেকে ঘোড়াগাড়ির মাধ্যমে সেসব সামানপত্র শহরে নিয়ে যাই। তারপর সেসব সামানপত্র শহরের অধিবাসী ও সৈন্যদের মাঝে বণ্টন করা হয়। দুই দিন পূর্বেই কিস্তি আসার কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত আসেনি। জানা নাই, কোন অসুবিধা হয়েছে কি না?
‘শহরে কি রসদপত্র বিপুল পরিমাণে মওজুদ আছে? মুসা জিজ্ঞেস করলেন।
‘খুব সামান্য রয়েছে। একজন সৈনিক বলল। আজ রাতে যদি কিস্তি না আসে তাহলে শহরে ও সৈন্যদের মাঝে খাদ্যের ঘাটতি দেখা দেবে।’
‘শরাবের মওজুদ একেবারেই নিঃশেষ হয়ে এসেছে। অন্য সৈনিক বলল। ‘শহরে শরাব তৈরি করার কোন ব্যবস্থা নেই। শহরের বাহির থেকে শরাবের যোগান দেওয়া হয়। যখন থেকে যুদ্ধ শুরু হয়েছে তখন থেকে লোকজন খুব বেশি শরাব পান করছে। শহরের প্রশাসক ও পাদ্রিগণ লোকদেরকে বেশি বেশি শরাব পান করতে বলেছেন। কারণ, শরাব পান করলে মনের মধ্যে ভীতি সঞ্চারিত হয় না; বরং সাহসিকতা ও বীরত্ব প্রদর্শন করা সহজ হয়। আপনি নিশ্চয় দেখেছেন যে, আমাদের শহরের অধিবাসীগণ কী বিপুল পরিমাণ উৎসাহের সাথে আমাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করছে।
