মেরিডার বাহিনী অতর্কিত আক্রমণ করে পুনরায় তাদের দুর্গের সামনে গিয়ে অবস্থান গ্রহণ করল। তারা মুসলিম বাহিনীকে লক্ষ্য করে দুয়োধ্বনি দিতে লাগল।
‘এটা গ্রানাডা বা কর্ডোভা নয়। একজন খ্রিস্টান অশ্বারোহী মুসলিম বাহিনীর একেবারে কাছে এসে বলল। এটা মেরিডা, তাড়াতাড়ি এখান থেকে চলে যাও।
একথা বলে অশ্বারোহী ঘোড়া ছুটিয়ে দ্রুত গতিতে দুর্গের দিকে চলে গেল। দুর্গ-প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যেসব নারী-পুরুষ আর শিশুরা এই দৃশ্য দেখছিল, তারা চিৎকার করে তাদের বাহিনীকে বাহবা দিচ্ছিল।
***
প্রথম দিন খ্রিস্টান বাহিনী এভাবেই আক্রমণ পরিচালনা করল। খ্রিস্টান বাহিনীর পক্ষ থেকে এটা ছিল একটি সতর্ক বার্তা। মুসা বিন নুসাইর বিষয়টি ভাল করেই বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি সতর্ক হয়ে গেলেন। খ্রিস্টান বাহিনী তাদের আক্রমণের ধারা অব্যাহত রাখল।
মুসা বিন নুসাইর তার বাহিনীকে চার ভাগে বিভক্ত করে শহরের চারদিকে পাঠিয়ে দিলেন। মুসলিম বাহিনীর মতো খ্রিস্টান বাহিনীও চার ভাগে বিভক্ত হয়ে আক্রমণ অব্যাহত রাখল। মুসলিম বাহিনীর কোন অংশ সামনে অগ্রসর হলে খ্রিস্টান বাহিনী ঝড়ের গতিতে সামনে এসে মুসলিম বাহিনীকে পিছু হটিয়ে দিত কিংবা মুসলিম বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়ে তারা নিজেদের জায়গায় ফিরে যেত। মুসলিম বাহিনী শহরের নিকট পৌঁছার জন্য কোন সুবিধা করতে পারছিল না। এভাবে প্রতিদিনই উভয় বাহিনীর মাঝে রক্তাক্ত সংঘর্ষ হচ্ছিল। মুসলিম বাহিনী কিছুতেই শহর অবরোধ করতে পারছিল না।
প্রফেসর ডোজি এবং ডা. কোডে লেখেছেন, খ্রিস্টান বাহিনী মেরিডার জন্য জীবনবাজি রেখে লড়াই করছিল। পাদ্রিরাও গিজা ছেড়ে বের হয়ে এসে লড়াই করছিল। পুরুষের সাথে কাঁধ মিলিয়ে নারীরাও ঘর থেকে বের হয়ে এসেছিল। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-গরীব, উঁচু-নীচু, গোলাম-মনিব সকলেই নিজেদের ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করছিল।
সাত-আট মাস পর্যন্ত শহরের বাহিরে এভাবে লড়াই চলতে লাগল। উভয় পক্ষেরই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হল। মুসা বিন নুসাইর সামনে অগ্রসর হওয়া বন্ধ করে দিলেন এবং তাঁর জেনারেলদের সাথে সলা-পরামর্শ করতে লাগলেন।
‘আমি এটা মানতে পারছি না, শহরে এত বিপুল পরিমাণ খাদ্যসামগী মওজুদ আছে যে, এত দীর্ঘ দিনেও তা নিঃশেষ হচ্ছে না। মুসা বিন নুসাইর জেনারেলদেরকে লক্ষ্য করে বললেন। “নিশ্চই কোন রাস্তা দিয়ে বাহির থেকে খাদ্যসামগ্ৰী শহরে প্রবেশ করছে। যদি আমরা জানতে পারতাম, কোন রাস্তা দিয়ে শহরে খাদ্যসামগ্রী প্রবেশ করছে, তাহলে সেই রাস্তা বন্ধ করে দিতাম এবং লড়াই করার পরিবর্তে শহর অবরোধ করে বসে থাকতাম।
‘আমরা শহরের চারদিকে ঘুরে দেখেছি, এমন কোন রাস্তা আমরা পাইনি, যেখান দিয়ে বাহির থেকে রসদ-পত্র আসতে পারে। আবদুল আযীয বিন মুসা বললেন।
‘রাস্তা আছে। অবশ্যই কোন রাস্তা আছে।’ মুসা বিন নুসাইর বললেন। আমরা প্রথম দিন শহরের পিছনে একটি পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে ছিলাম। আমি সামনে অগ্রসর হতেই দুটি তীর এসে আমার সামনে পড়েছিল।
‘সেদিনের ঘটনা আমাদের মনে আছে। সকলেই এক সাথে বলে উঠল।
‘আমার মনে হয়, সেটাই খাদ্যসামগ্রী আসার রাস্তা। মুসা বিন নুসাইর বললেন। ‘আজ রাতে কয়েক জন সেদিকে গিয়ে দেখবে, সে পথ দিয়ে শহরে রসদপত্র প্রবেশ করে কিনা? যুদ্ধ বন্ধ করে দেওয়াই আমি উত্তম মনে করছি। তোমরা কি দেখতে পাচ্ছ না যে, আমাদের সামরিক শক্তি দিন দিন নিঃশেষ হয়ে আসছে? আমাদের শত্রুদের চাল হল, আমরা যেন এমনিভাবে শক্তিহীন হয়ে পড়ি। অবশেষে আমরা যখন শক্তিহীন হয়ে পড়ব তখন শহরের সৈন্যবাহিনী দুর্গ থেকে বের হয়ে এসে আমাদের উপর আক্রমণ করে আমাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে।
‘আজ রাতে আমি সেদিকে নজর রাখব।’ মুসা বিন নুসাইরের ছেলে আবদুল্লাহ বলে উঠলেন।
‘তোমার সাথে আরও চারজন মুজাহিদ নিয়ে যেয়ো।’ মুসা বিন নুসাইর বললেন। তোমরা পায়ে হেঁটে সেখানে যাবে। ঘোড়ায় চড়ে গেলে দুশমন তোমাদের আগমন সম্পর্কে টের পেয়ে যেতে পারে। সাথে করে একজন দোভাষী নিয়ে যেতে ভুলো না।
***
সেই রাতে আবদুল্লাহ বিন মুসা বহু দূরের পথ ঘুরে শহরের পিছন দিকে সেই স্থানে গিয়ে পৌঁছল, যে স্থানটি ছোট-বড় পাথর, আর পাহাড়ী টিলায় ঘেরা ছিল। সেখান কার মাটি অনুর্বর, আর খানাখন্দে ভরপুর। পুরো এলাকাটাই যুদ্ধ করার জন্য অনুপযুক্ত। এই এলাকার পিছন দিক দিয়ে দাদিয়ানা নদী বয়ে গেছে। নদীর দুই কূল টিলার মত উঁচু।
আবদুল্লাহ খুব সতর্কতার সাথে ধীরে ধীরে পা ফেলে নদীর কুল ধরে সামনে অগ্রসর হতে লাগলেন। গোটা এলাকা ঘন গাছ-গাছালীতে ভরা। কোথাও কোথাও আছে জলাভূমি। আবদুল্লাহ ও তার সাখীরা কয়েকবারই সেই জলাভূমিতে ফেসে গেলেন। প্রতিবারই তারা একজন আরেকজনের সাহায্যে সেই জলাভূমি থেকে নিরাপদে বের হয়ে আসতে সক্ষম হলেন।
চাঁদনী রাত। চারদিকে সুনসান নিরবতা। বহুদূর থেকে নদীর ঢেউয়ের ছলছল আওয়াজ ভেসে আসছে। নদীর পাড় ধরে সামনে অগ্রসর হতেই মানুষের আওয়াজ শুনা গেল। ধীরে ধীরে আওয়াজটা সামনের দিকে এগিয়ে আসল। আবদুল্লাহ ও তাঁর সাথীরা নদীর তীরের উঁচু ঘাসের মাঝে লুকিয়ে পড়লেন।
