‘আমার প্রিয় সাথীরা। মুসা বিন নুসাইর তার সাথীদের লক্ষ্য করে বললেন। আমাদের জন্য অনেক বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলার রহমতের ব্যাপারে আমাদের নিরাশ হওয়া চলবে না।’
নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিকগণের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, আল্লাহ তাআলা তার অপার কুদরতের মাধ্যমে মেরিডা শহরের জন্য নিচ্ছিদ্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে। দিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও মেরিডার সৈন্যবাহিনী আর শহরের অধিবাসীরা যে আবেগ আর উচ্ছ্বাস নিয়ে শহরের প্রতিরক্ষার জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করে তুলছিল, তা দেখলে বাহ্যত এটাই মনে হবে যে, মেরিডা এক অপরাজেয় দূর্গ। শহরের ভিতরে, শহর রক্ষা প্রাচীরের উপরে, আর দূর্গের বাইরে প্রধান পাদ্রির নেতৃত্রে সকল পাদ্রিরা কুশ হাতে নিয়ে মিছিল করে বেড়াচ্ছিল। অপর দিকে এজেলুনা ঘোড়ার উপর সওয়ার হয়ে নাঙ্গা তলোয়ার নিয়ে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছিল। সে মাঝে মাঝে বের হয়ে সেনাছাউনিগুলো ঘুরে আসত। তাকে দেখে লোকজন জড়ো হলেই সে তার জ্বালাময়ী ভাষণ, আর অনলবর্ষী বক্তৃতার মাধ্যমে লোকদেরকে উত্তেজিত করে তুলত।
***
মুসা বিন নুসাইর তাঁর দুই সালার ও ছেলেদেরকে সাথে নিয়ে শহরের পিছনে অবস্থান করছিলেন। তারা ঘুরে ঘুরে শহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। এমন সময় তারা দূর থেকে চিৎকার-চেঁচামেচির আওয়াজ শুনতে পেলেন। মুসা এবং তাঁর সাথীবৃন্দ এই আওয়াজ সম্পকে অবগত ছিলেন। তারা বুঝতে পারলেন যে, এটা রণাঙ্গনের চিৎকার-চেঁচামেচি। শত শত ঘোড়ার হ্রেষা ধ্বনি আর পদাঘাতে গোটা এলাকা থরথর করে কাঁপছিল।
মুসা বিন নুসাইর দ্রুতবেগে ঘোড়া হাঁকিয়ে রণাঙ্গনের দিকে রওনা হয়ে গেলেন। তাঁর সন্তান ও সালারগণ তাঁকে অনুসরণ করল। তারা যখন শহরকে এক পাশে রেখে রণাঙ্গনের দিকে অগ্রসর হলেন তখন তারা এমন এক দৃশ্য দেখতে পেলেন যে, নিজেরাই নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তারা দেখতে পেলেন, মেরিডার যে বাহিনী শহরের বাহিরে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তারা মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ করে বসেছে। মুসলিম বাহিনী এমন অতর্কিত হামলার জন্য প্রস্তুত ছিল না। মুসলিম অশ্বারোহীগণ ঘোড়ার জিন খুলে ঘোড়াগুলোকে পানি পান করানোর জন্য এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিল। পদাতিক বাহিনীর সৈন্যরা শুয়ে-বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল। আর ময়দানের এক পাশে সকলের জন্য খানা তৈরি করা হচ্ছিল।
খ্রিস্টান বাহিনীকে তেড়ে আসতে দেখে মুসলিম বাহিনীর যে যেই অবস্থায় ছিল সেই অবস্থায় হাতিয়ার উঠিয়ে মুকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। অশ্বারোহী সিপাহীরা ঘোড়ার পিঠে জিন বাঁধার কোন সুযোগ পেল না। তারা পদাতিক বাহিনীর মতো ঢাল-তলোয়ার আর তীর-বর্শী হাতে নিয়ে লড়াই শুরু করে দিল। যেসব ঘোড়া বাঁধা ছিল সেগুলোকে বাচাঁনোই ছিল সবচেয়ে বড় সমস্যা।
মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনী তীর-ধনুক নিয়ে ক্ষীপ্রগতিতে সামনের দিকে চলে এলো। আক্রমণকারীরা সামনে অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথেই তীরন্দাজ বাহিনী তাদের উপর বৃষ্টির মত তীর নিক্ষেপ করতে লাগল। খ্রিস্টান বাহিনীর অগ্রভাগে ছিল অশ্বারোহী সৈন্যদল। প্রথমে এই অশ্বারোহী দলই তীরের লক্ষ্যে পরিণত হল। তীর লাগার সাথে সাথেই তারা ঘোড়ার উপর লুটিয়ে পড়ল। যারা নিচে পড়ে যেত, ক্ষীপ্রগতির ঘোড়ার পদতলে পিষ্ঠ হয়ে সেখানেই তাদের জীবন লীলা সাঙ্গ হত। কিন্তু তা সত্ত্বেও অশ্বারোহী বাহিনীর গতি রোধ করা সম্ভব হল না।
অশ্বারোহী বাহিনী এতটাই কাছে চলে এলো যে, মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনীর পক্ষে মোকাবেলা করাও অসম্ভব হয়ে পড়ল। তারা জীবন বাঁচানোর জন্য ডানে বায়ে ছড়িয়ে পড়ল। এবার পদাতিক বাহিনী খ্রিস্টান অশ্বারোহী বাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য সামনে অগ্রসর হল। তারা তলোয়ারের আঘাতে বেশ কয়েকজন অশ্বারোহীকে ধরাশায়ী করল। কিন্তু তারাও বেশিক্ষণ টিকতে পারল না। বেশ কয়েকজন পদাতিক সিপাহী ঘোড়ার পদাঘাতে, আর অশ্বারোহীদের বর্ষার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হল। মুসলিম বাহিনী তাদের সিপাহসালারের অনুপস্থিতিতে লড়াই করছিল। তাছাড়া এমন পরিস্থিতিতে সিপাহসালার উপস্থিত থাকলেও তার পক্ষে কিছু করা সম্ভব হত না। এমন অবস্থায় জীবন বাঁচানো ছাড়া আর কোন রণ-কৌশল প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। মুসলিম বাহিনী একদিকে নিজেদের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছিল, অন্য দিকে খ্রিস্টান বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলছিল।
মেরিডার এই বাহিনী ময়দানে অবস্থান গ্রহণ করে যুদ্ধ করার জন্য আসেনি। মুসলিম বাহিনী যতক্ষণ তাদেরকে ময়দানে আটকে রেখেছিল, ততক্ষণই তারা ময়দানে আটকে ছিল। তারা তুফানের গতিতে এসে ডানদিক থেকে আক্রমণ করে বাম দিক দিয়ে বের হয়ে গেল। তাদের মধ্য থেকে কয়েকজন সিপাহী মুসলিম বাহিনীর ব্যুহ ভেদ করে পিছন দিকে চলে গেল। সেখান থেকে বহু দূরের পথ পাড়ি দিয়ে তাদের দূর্গের সামনে গিয়ে পৌঁছল। এই সিপাহীদের কয়েকজন জখম হয়ে মুসলিম বাহিনীর হাতে পাকড়াও হল।
মুসা বিন নুসাইর যখন রণাঙ্গনে পৌঁছলেন ততক্ষণে লড়াই শেষ হয়ে গেছে। প্রচণ্ড তুফানের পর কোন জনবসতির অবস্থা যেমন লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়, মুসলিম বাহিনীর অবস্থাও হয়েছিল ঠিক তেমনি। খ্রিস্টান ও মুসলিম বাহিনীর আহত সৈন্যরা ছটফট করছিল। বেশ কয়েকজন সিপাহী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।
