এজেলুনা মুসলিম বাহিনীর আগমনের সংবাদ পাওয়ামাত্র উন্মুক্ত তলোয়ার নিয়ে রাজেলিউর ঘোড়ায় চড়ে শহরের অলিগলিতে ছুটে বেড়াতে লাগল, আর চিৎকার করে বলতে লাগল :
‘মেরিডার অধিবাসীগণ, তোমাদের মাঝে দেশপ্রেমের পরীক্ষা দেওয়ার সময় এসেছে। মা মরিয়মের সতীত্ব তোমাদেরকে আহ্বান করছে।’
যেখানেই লোকজন জড়ো হত সেখানেই এজেলুনা থেমে গিয়ে সুউচ্চ আওয়াজে জ্বালাময়ী ভাষণের মাধ্যেমে লোকদেরকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করত। সে তার ভাষণে বলত :
‘যারা হাতিয়ার সমর্পণ করে মুসলমানদের হাতে নিজেদের শহর তুলে দিয়ে গোলাম হয়ে গেছে তারা কাপুরুষ, তারা আত্নমর্যাদাহীন। তারা তাদের মেয়েদেরকেও মুসলিম বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছে। তোমরাও কি তোমাদের মেয়েদেরকে হিংস্র বার্বারদের হাতে ছেড়ে দেবে?
সমবেত জনতা এক সাথে উত্তর দিল, না…, না…, না…। আমরা জান দেব, তবু মান দেব না।
‘ভুলে যেয়ো না, এটা গ্রানাডা বা কর্ডোভা নয়, এটা হল মেরিডা। এটা প্রধান ধর্মগুরুর শহর। আজ গীজার ইজ্জত তোমাদের হাতে। ক্রুসের ইজ্জত-আবরু তোমাদের কাছে। সে ঝুলানো ঈসা মসীহের পবিত্র আত্মা দেখছে, তোমরা কি খ্রিস্টবাদ রক্ষার্থে জীবন বিলেয়ে দাও, নাকি নিজের জীবনকে বেশি মহব্বত কর। তোমরা যদি এখানে মুসলমানদেরকে পরাজিত করতে পার তাহলে যেসব শহর মুসলিম বাহিনী কজা করেছে, সেগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য তোমরা অগ্রসর হতে পারবে। আন্দালুসিয়া হতে মুসলিম বাহিনীকে বিতাড়িত করার সৌভাগ্য তোমাদের হবে। আর তোমরা যদি হীনমন্য হয়ে বসে থাক তাহলে তোমাদের গিজা মসজিদে পরিণত হবে। তোমাদের গিজার এমন বেহুরমতি হোক–এটা কি তোমরা কামনা কর?
‘না…, না…, না…।’ সকলেই এক সাথে উত্তর দিল।
এজেলুনা এখানে বক্তৃতা শেষ করে সেনাছাউনিতে গিয়ে উপস্থিত হল। সেনা ছাউনিতেও সে এমনি এক জ্বালাময়ী ভাষণ প্রদান করল। এজেলুনার জ্বালাময়ী ভাষণ, অপরূপ সৌন্দর্য, আর মুগ্ধ করার মত ব্যক্তিত্ব মানুষের মাঝে এমন এক অবস্থা সৃষ্টি করল যে, মনে হচ্ছিল–গোটা জনপদ আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভায় পরিণত হয়েছে। কোন সাধারণ নারীও যদি পুরুষ মানুষের পৌরুষ উদ্দিপ্ত করার জন্য জ্বালাময়ী আহ্বান জানায় তাহলে কোন পুরুষ মানুষের পক্ষেই আত্মসংবরণ করে রাখা সম্ভবপর হয়ে উঠে না। এজেলুনার মত বাকচতুর আর ছলনাময়ী নারীর জ্বালাময়ী ভাষণে সামর্থবান প্রতিটি পুরুষ যুদ্ধ করার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠল।
***
মুসা বিন নুসাইরের প্রত্যাশা এটাই ছিল যে, তিনি সহজেই মেরিডা অবরোধ করতে সক্ষম হবেন। কিন্তু গোয়েন্দা সূত্রে তিনি অবগত হন যে, মেরিডার সৈন্যবাহিনী শহরের বাহিরে এসে যুদ্ধ করবে। তারা শহরের বাহিরে এমন শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেবে যে, শহরের প্রধান ফটকের কাছে যাওয়াই সম্ভব হবে না। মুসা বিন নুসাইর দূর থেকে দেখতে পেলেন, শহর রক্ষাপ্রাচীর থেকে অনেক সামনে মেরীডার সৈন্যবাহিনী ব্যরিকেট সৃষ্টি করে পাহাড়ের ন্যায় অবিচল দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছিল, তারা নিজেদের শহরকেই অবরোধ করে আছে।
মুসা বিন নুসাইর তার বাহিনীকে খানিকটা দূরে অবস্থান করালেন। মুসলিম বাহিনী অনেক দূরের পথ অতিক্রম করে এসেছিল। ঘোড়াগুলো অনেক ক্লান্ত হয়ে পরেছিল। পদাতিক বাহিনীর সৈন্যরা সবচেয়ে বেশি ক্লান্ত ছিল। মুসা বিন নুসাইর মুসলিম বাহিনীকে বিশ্রাম করার নির্দেশ দিয়ে তাঁর তিন সন্তান ও দুই-একজন জেনারেলকে সাথে নিয়ে শহরের চারপাশ পর্যবেক্ষণ করার জন্য বের হলেন। তিনি শহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন, আর মনে মনে আক্রমণের প্রান তৈরী করছিলেন।
শহরের পিছন দিকটা তীক্ষ্ম ফলাবিশিষ্ট ছোট-বড় পাথরে ভরা। সেই সব পাথরের ফাঁকে ফাঁকে বড় বড় গাছপালা ছেয়ে আছে। চার দিকে সবুজের সমারোহ। কোন কোন গাছের ডালপালা দূর্গের প্রাচীরের সমান উঁচু। প্রাচীরের উপরেও গাছপালা আছে। সেসব গাছগাছালীর ফাঁকে ফাঁকে প্রাকৃতিকভাবে আঁকা বাঁকা পাহাড়ী পথ তৈরী হয়েছিল। সেই পথ দূৰ্গ-প্রাচীরের দিকে চলে গেছে। পিছন দিক থেকে এই পথ ধরে ভিতরে যাওয়া অনেকটা অসম্ভব মনে হচ্ছিল।
‘আমরা এই গাছগাছালী আর টিলার আড়াল নিয়েই দূর্গ প্রাচীরের ভিতরে পৌঁছতে পারব।’ মুসা বিন নুসাইর বললেন। তা ছাড়া এদিকটায় কোন সৈন্যও দেখা যাচ্ছে না।’
মুসা বিন নুসাইর ঘোড় নিয়ে টিলার দিকে অগ্রসর হলেন। তিনি গাছের আড়াল নিয়ে সামনে অগ্রসর হচ্ছিলেন। এমন সময় একটা তীর এসে গাছের গোড়ায় সমূলে বিদ্ধ হল। মুসা বিন নূসাইর সাথে সাথে ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলেন। সাথে সাথে আরেকটি তীর এসে ঘোড়র ঠিক দু-এক কদম সামনে মাটিতে বিদ্ধ হল। মুসা বিন নুসাইর দ্রুত ঘোড়া ঘুরিয়ে সেখান থেকে চলে এলেন। তীর দুটি হয়তো অনেক দূর থেকে এসেছিল। তাই মুসা বিন নুসাইর বা তার ঘোড়র শরীরে বিদ্ধ হয়নি। মাটিতে বিদ্ধ হয়েছে। হতে পারে তীরন্দাজ বাহিনী মুসা বিন নুসাইরকে সতর্ক করে দিতে চাচ্ছিল, তিনি যেন আর এক কদম সামনে অগ্রসর হওয়ার দুঃসাহস না করেন।
এই পাহাড়ী এলাকায় সৈন্যবাহিনীর সদস্যরা আত্মগোপন করে ছিল। শহরের সম্মুখ দিকে যে সকল সৈন্যবাহিনী আছে, এ সকল সৈন্যবাহিনী তার চেয়েও ভয়ঙ্কর। টিলা আর ছোট-বড় পাথরে রা এবড়ো-থেবড়ো মাটিতে পায়ে চলাই অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এমন এলাকায় ঘোড়া নিয়ে দ্রুতগতিতে সামনে অগ্রসর হওয়া একেবারেই অসম্ভব।
