এজেলুনা নিজের সাথে বিপুল পরিমাণ মণি-মুক্তা, আর সোনা-দানার অলংকার নিয়ে যাচ্ছিল। তার ব্যক্তিগত দাস-দাসী সকলেই তার সাথে ছিল।
রাজেলিউ তার সাথে ছিল না। সে পূবেই মেরিডর উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গিয়েছিল। টলেডু থেকে কয়েক ক্রোশ অগ্রসর হয়ে সে এজেলুনার জন্য অপেক্ষা করছিল। তার রক্ষী বাহিনীও ছিল। এজেলুনার কাফেলা সেখানে পৌঁছার পর তারা এক সাথে মেরিডার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল।
***
মেরিডা পৌঁছে রাজেলিউ এজেলুনাকে নিয়ে শাহীমহলে বসবাস করতে লাগল। কিন্তু তাদের কেউই কোন প্রশাসককে বলল না যে, তারা এখন কেন্দ্র থেকে মুক্ত ও স্বাধীন। কারণ, তারা এই আশঙ্কা করছিল যে, তারা যদি এ কথা প্রকাশ করে, তাহলে সেখানের সেনাপ্রধান ও প্রধান প্রশাসক তাদের আনুগত্য গ্রহণ নাও করতে পারে। তারা নিজেদের পুর্বের অবস্থানই প্রকাশ করছিল।
মেরিডায় দুইজন জেনারেল, আর তিনজন প্রশাসক ছিল। প্রধান পাদ্রি ছাড়া ছোট-বড় আরও কয়েকজন পাদ্রিও ছিল। এজেলুনা সেখানে পৌঁছেই নাচ-গান, আর খানাপিনার আসর জমিয়ে তুলল। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই প্রত্যেক জেনারেল, পাদ্রি, আর রাজেলিউ সকলেই এই আত্মতৃপ্তিতে ভোগতে লাগল যে, রডারিকের এই সুন্দরী বিধবা স্ত্রী এখন তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। এজেলুনা সকলকেই কার গুণগ্রাহী বানিয়ে নিল।
এজেলুনা। একদিন রাজেলিউ তাকে বলল। এখানের সকলকেই তোমার আশেক মনে হয়। সম্ভবত প্রত্যেক জেনারেল, আর প্রত্যেক পাদ্রি এই আশা করছে যে, তুমি তাদেরকে বিবাহ করবে।
‘এটা কি আমার সফলতা নয় যে, আমি আমার আশেক তৈরী করতে সক্ষম হয়েছি।’ এজেলুনা বলল। প্রত্যেককেই আমি এই স্বপ্ন দেখাচ্ছি যে, সেই আমার স্বামী হবে।’
‘আমিও স্বপ্ন দেখছি না তো?’ রাজেলিউ বলল।
‘তুমি কেন স্বপ্ন দেখবে?’ এজেলুনা হৃদয় কাড়া মুসকি হাসি হেসে জবাব দিল। তোমার কি মনে হয়, আমি এই বৃদ্ধ জেনারেলদের কারও স্ত্রী হব? অন্য যারা আমার রূপে মোহমুগ্ধ হয়ে আছে, তাদের কেউ কি আমার যোগ্য? আমি তাদের সকলের মনে আমার রূপের নেশা লাগিয়ে দিয়েছি। তারা সকলেই মেরিডাকে মুসলমানদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়েছে। তুমি কেন অযথা পেরেশান হচ্ছ? আমি তোমাকে মেরিডার বাদশাহ বানাব। আর আমি হব তোমার রানী।’
‘তাহলে কি আমি এ কথা বিশ্বাস করতে পারি যে, তুমি শুধু আমার? রাজেলিউ আবেগতাড়িত কণ্ঠে জানতে চাইল।
‘তুমি ছাড়া আমি আর কার হতে পারি?’ এজেলুনা বলল। ‘শুন, আমি তোমাকে আমার মনের কথা বলছি, আমি রানী হতে চাই। এটাই আমার একমাত্র চাওয়া। তুমি কি আমাকে রানী বানাতে পারবে?
কী অদ্ভুত প্রশ্ন করছ তুমি?’ রাজেলিউ বলল। ‘তুমি ছাড়া আর কে রানী হবে?
‘তুমি কি জানতে পেরেছ যে, গ্রানাডা আর কডোবা মুসলিম বাহিনীর দখলে চলে গেছে।’ এজেলুনা বলল। তুমি কি জান, মুসলমানদের আরেকটি ফৌজ আন্দালুসিয়া প্রবেশ করেছে?
‘শুনেছি। ‘রাজেলিউ উত্তর দিল। আমার কাছে এ সংবাদ এসেছে যে, এই নতুন ফৌজের গন্তব্য হল মেরিডা’।
‘তুমি কি এই বাহিনীর হাত থেকে মেরিডাকে রক্ষা করতে পারবে? এজেলুনা জিজ্ঞেস করল।
‘অবশ্যই এজেলুনা! মুসলিম বাহিনী এখানে মরার জন্য আসছে। রাজেলিউ বলল।
‘এমন কথা আমি টলেডোতেও শুনেছিলাম।’ এজেলুনা বলল। কিন্তু আমি জানতে পেরেছি, মুসলমানদের প্রথম বাহিনী যখন টলেডো অবরোধ করে, তখন শহরের অধিবাসীরা ফটক খুলে দিয়ে মুসলিম বাহিনীকে স্বাগতম জানিয়ে ছিল। তুমি কি এমন বীরত্ব দেখাতে পারবে যে, নিজের নেতৃত্বে বাহিনীর একটি অংশ নিয়ে শহরের বাহিরে গিয়ে মুসলমানদের উপর এমন আক্রমণ করবে যে, তারা হয়তো পালিয়ে যাবে অথবা ধ্বংস হয়ে যাবে?
‘তুমি দেখে নিয়ে, আমি কী করতে পারি।’ রাজেলিউ বলল।
‘তুমিও দেখে নিও, আমি কীভাবে আমার দেহ-মন তোমার কাছে সমর্পণ করে তোমার রানী হয়ে যাই। এজেলুনা বলল।
এজেলুনা মেরিডার সকল জেনারেল, পাদ্রি আর প্রশাসকের সাথে এই একই কথা বলে বেড়াত। সে সকলের কাছে রাতের মেহমান হয়ে আগমন করতএবং নিজ হাতে তাদেরকে শরাব পান করাত। এজেলনার রূপের ঝলক আর শরাবের ঝাঁঝে সকলেই বেহুশ হয়ে পড়ত। ভোরের আলো ফুটার আগেই এজেলুনা মরীচিৎকার প্রহেলিকা হয়ে তার কামরায় ফিরে আসত।
***
‘হানাদার বাহিনী আসছে।
প্রস্তুত হয়ে যাও।
‘সতর্ক হয়ে যাও।
শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তে এমন সতর্ক সংকেত ছড়িয়ে পড়ল। শহরের সবত্র সাজ সাজ রব পড়ে গেল। মানুষের মাঝে হুড়াহুড়ি রু হয়ে গেল। কিন্তু এই হুড়াহুড়ির মাঝে ভয়-ভীতির কোন চিহ্ন ছিল না; বরং তাদের মাঝে এক ধরনের উত্তেজনা পরিলক্ষিত হচ্ছিল। লোকজন পলায়ন করার জন্য এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করছিল না; বরং লড়াই করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল এবং সকলেই নিজেকে সমরাস্ত্রে সজ্জিত করছিল।
বহুদিন ধরেই তীর-বর্শী তৈরী করা হচ্ছিল। হাতে নিক্ষেপ করা যায়–এমন বর্শা বানানো হচ্ছিল। কিশোর-কিশোরী ও মধ্য বয়সী নারীরাও তীরন্দাজীর প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। সক্ষম সকল যুক, আর বৃদ্ধ পুরুষরা কয়েক মাস যাবত সৈন্যবাহিনীর সাথে মিলে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছিল। এজেলুনার আগমনের পর গোটা শহরে যুদ্ধের স্পৃহা বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। এজেলুনা স্বয়ং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো পরিদর্শনে যেত এবং শহরের অধিবাসীদেরকে যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করত।
