এমনটি হবে না, আব্বা হুজুর!’ আবদুল আযীয বললেন। আমরা কিছুতেই এমনটি হতে দেব না।’
এখন সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হল, মেরিডার অবরোধ খুব একটা সহজ হবে না।’ মুসা বিন নুসাইর বললেন। মেরিডায় আমাদেরকে অনেক বেশি জান-মালের কুরবানী দিতে হবে।
‘আমরা জান-মাল কুরবানী দিতে প্রস্তুত আছি।’ মুসা বিন নুসাইরের তিন পুত্র এক সাথে দৃপ্তকণ্ঠে জবাব দিলেন।
***
মেরিডার এক বিশাল শাহীমহল। বাদশাহর প্রতিনিধি এই শাহীমহলেই অবস্থান করে। বাদশাহর প্রতিনিধি শাহীখান্দান থেকে হওয়ার রীতি ছিল। সেই সময় মেরিডার শাহীমহলে যে প্রতিনিধি অবস্থান করছিল, সে ছিল রডারিকের নিকট আত্মীয়। বাদশাহর প্রতিনিধি নিজেকে বাদশাহই মনে করত। কিন্তু রডারিকের মৃত্যুর পর তার প্রতিনিধি রাজেলিউর বাদশাহী ছিল নামে মাত্র। তার কারণ এই নয় যে, রডারিক মারা গেছে; বরং তার কারণ হল, রডারিকের এক স্ত্রী মেরিডা চলে এসেছে। সে এখানে রানীর মর্যাদা নিয়ে অবস্থান করছিল। তা ছাড়া মেরিডায় শাহীখান্দানের অনেক সদস্যই অবস্থান করছিল।
রডারিকের মত্যুর কারণে অনেক রমণীই আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিল। তাদের মধ্যে একজন হল, এজেলুনা। এজেলুনার বয়স সাতাশ কি আঠাশ হবে। এজেলুনা যেহেতু শাহীখান্দানের সদস্য ছিল, তাই তখনও যেসব অঞ্চল মুসলমানদের করতলগত হয়নি, সেসব অঞ্চলে এজেলুনার প্রভাব বিদ্যমান ছিল। সেসব অঞ্চলের রাজ-প্রতিনিধি ও সেনাপ্রধান তার অনুগত ছিল।
রডারিক যখন গোয়াডিলেটের রণাঙ্গনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায় তখন এজেলুনা মেরিডা চলে এসেছিল। রডারিক তার শাহীমহলে এমন সব রমণীদের রেখেছিল, যারা একজন আরেকজনের চেয়ে রূপসী ছিল। কিন্তু এজেলুনা এত বেশি রূপসীছিল যে, তার মত এমন অতুলনীয় রূপসী নারী সচরাচর দেখা যায় না।
রডারিকের মৃত্যুর পর এজেলুনা তার অতুলনীয় রূপ-সৌন্দযের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিকে তার দিকে ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। প্রায় সকল ঐতিহাসিকই তার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
তারা লেখেন যে, এই নারীর রূপের মাঝে এক ধরনের বিশেষ মোহাচ্ছন্নতা ছিল। যেমন সুন্দর ছিল তার দেহ-সৌষ্ঠব, তেমনি আকর্ষণীয় ছিল তার বাচনভঙ্গি, আর চাল-চলন। সে মুহূর্তেই সকলের হৃদয়-মন জয় করে নিতে পারত। তার মুখের ভাষার চেয়ে চোখের ভাষা ছিল অধিক কার্যকরী। সবসময় তার ঠোঁটে এক চিলতে রহস্যময় মুচকি হাসি লেগে থাকত।
কোন কোন ঐতিহাসিকগণ লেখেছেন, তার মা ছিল ইহুদি। অনেকের মতে, তার মা ছিল খ্রিস্টান। সে যাইহোক, এজেলুনা ছিল শাহীমহলের একজন প্রভাবশালী নারী।
আসল রাজরানী ছিল অন্যজন। সে ছিল রাজমান্ডের মা। কিন্তু রডারিক এজেলুনাকে শাহীমহলে রানীর সম্মান দিয়ে রেখেছিল। এজেলুনা চোখের ইশারায় তার কথা মানিয়ে নিত। কারও এই সন্দেহ হত না যে, সে একজন ছলনাময়ী নারী।
রডারিকের মৃত্যুর খবর পেয়ে মেরিডার শাহী প্রতিনিধি রাজেলিউ টলেডোতে এসে এজেলুনার সাথে সাক্ষাৎ করল। পূর্ব থেকেই এই রমণীর সাথে রাজেলিউ বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল।
এজেলুনা! এখানে কেউ তোমাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। রাজেলিউ বলল। রাজ-সিংহাসন দখলের জন্য এখানে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে। সিংহাসনের প্রকৃত উত্তরাধিকার হল রাজমান্ড। কারণ, সে হল রানীর একমাত্র পুত্র। অন্যান্য নারীদের থেকেও রডারিকের পুত্র সন্তান আছে। কিন্তু তাদের কেউই রানী নয়। তোমার ভাগ্য ভাল যে, তোমার কোন সন্তান নেই। আমি শুনতে পেরেছি, তোমার ব্যাপারে রানীর মনে সন্দেহ আছে। তুমি জেনারেল ও প্রশাসকদের সাথে আতাত করে রানী হওয়ার চেষ্টা করছ। আমি তোমাকে সতর্ক করে দিচ্ছি, তুমি এখান থেকে অন্যত্র চলে যাও।’
‘কোথায় যাব?’ এজেলুনা নিরাশার সুরে জানতে চাইল।
‘মেরিডা। রাজেলিউ বলল। আমার সাথে মেরিডা চল।’
‘সেখানে গিয়ে আমি কি করব?’ এজেলুনা জিজ্ঞেস করল। সেখানে আমার অবস্থানের ভিত্তি কি হবে?
‘সেখানে তুমি রানী হবে। রাজেলিউ উত্তর দিল। আমি তোমাকে সঙ্গ দেব। তুমি যদি অন্য কোন স্বপ্ন দেখে থাক, তাহলে তা মন থেকে মুছে ফেল। মুসলিম বাহিনী আন্দালুসিয়ার রাজত্ব তছনছ করে দিয়েছে। রডারিকের মৃত্যুর পর আমাদের সামরিক শক্তি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। এখন মুসলিম বাহিনী টলেডুর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আমাদের প্রশাসকগণ যে যেখানে আছে, সে সেখানের বাদশাহ হয়ে গেছে। আমরা উভয়ে শাহীখান্দানের সদস্য। মেরিডায় আমরা আমাদের নিজস্ব রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করব। তুমি হয়তো জান, মেরিডার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুবই মুজবুত। মেরিডার বাহিনী খুবই শক্তিশালী। মেরিডার বাহিনীর মাধ্যমে আমরা আমাদের রাজত্বের বিস্তার ঘটাতে পারব। তাছাড়া মেরিডা আমাদের ধর্মীয় কেন্দ্রও বটে। প্রধান পাদ্রিও মেরিডায় অবস্থান করছেন। তোমার মধ্যে এমন জাদু আছে যে, তার মাধ্যমে তুমি প্রধান প্রাদ্রিকে তোমার হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে পারবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তুমি গির্জাকে তোমার অনুগত করতে সক্ষম হবে। সব ধরনের চিন্তা বাদ দিয়ে আমার সাথে চল।
পর দিন সকালে এজেলুনা কয়েকটি ঘোড়াগাড়িতে তার প্রয়োজনীয় সামানপত্র উঠিয়ে নিল। কেউ তাকে কোন রকম বাধা দিল না। রডারিকের বৈধ-অবৈধ সকল স্ত্রীই এ কথা ভেবে মনে মনে খুশি হচ্ছিল যে, সিংহাসনের দাবিদার একজন কমল। কেউ জানতে চাইল না, সে কোথায় যাচ্ছে, সাথে করে কী নিয়ে যাচ্ছে?
