এই শহরের গির্জাগুলো ছিল খুবই সুন্দর। প্রতিটি গির্জার মাঝে বিপুল পরিমাণ ধন-দৌলত জমা করে রাখা হয়েছিল। মেরিডার প্রধান পাদ্রি টলিডোর প্রধান পাদ্রির চেয়েও বেশি গুরুত্ব রাখত। তার নির্দেশেই গোটা রাজ্য চলত। এ জন্য তাকে রাজ্যের প্রধান পাদ্রি বলা হত। কখনও কখনও তার জুলুস বের হত। উদ্দেশ্য জনসাধারণের মাঝে তার প্রভাব-প্রতিপত্তি আর সম্মান বজায় রাখা। জনসাধারণের মাঝে প্রভাব বিস্তার করার কারণ হল, এই শহরের মানুষ ছিল বিত্তশালী। এই শহরের লোকদের মতো বিত্তশালী লোক আন্দালুসিয়ার অন্য কোন শহরে ছিল না। প্রধান পাদ্রি বিত্তশালীদের কাছ থেকে অর্থ-কড়ি নিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছিল।
মেরিডার উদ্দেশ্যে মুসা বিন নুসাইর যে গোয়েন্দা বাহিনী পাঠিয়েছিলেন, তারা ফিরে এলে তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন :
‘মেরিডার সৈন্যদের মাঝে যুদ্ধ করার স্পৃহা কেমন দেখলে?’ তারপর নিজেই নিজের কথার জবাব দিলেন। না, যুদ্ধের স্পৃহা না থাকারই কথা। মানুষের কাছে একটি বস্তুই থাকে। দৌলত অথবা স্পৃহা। দুটো এক সাথে থাকতে পারে না। কারণ ধন-দৌলত মানুষকে বিলাসী করে দেয়।’
‘না, আমীরে মুহতারাম!’ গুপ্তচর বাহিনীর প্রধান বলল। মেরিডার অধিবাসীদের কাছে দুটো বস্তুই আছে। আমি খ্রিস্টান ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশ নিয়ে সেখানে প্রবেশ করেছিলাম। একটি সরাইখানায় আমি অবস্থান করেছিলাম। সেখানের দু’টি গির্জায়ও আমি গিয়েছি। আমি তাদের অনেককেই জিজ্ঞেস করেছি, মুসলিম বাহিনী তো গোটা রাজ্যই দখল করে নিয়েছে। এখন কি হবে? তারা তো মেরিডাও দখল করে নিবে।
আমীরে মুহতারাম! সকলে আমাকে একই জবাব দিয়েছে, তারা বলেছে, মেরিডার খ্রিস্টানদের মাঝে আত্মমর্যাদা যেমন আছে তেমনি সাহস ও বীরত্বও আছে। গির্জা ও উপাসনালয়ে যারা থাকে তাদের ঢিলা-ঢালা পোশাক আর লম্বা দাড়ি দেখে তাদেরকে নিরীহ মনে করো না। তারা প্রত্যেকেই যুদ্ধবাজ। তারা গির্জার পবিত্রতা রক্ষার জন্য জীবন উৎসর্গ করে দেবে। তবে জীবন দেওয়ার আগে যে মুসলমানই সামনে আসবে তাকে সে অবশ্যই খতম করবে। সাধারণ মানুষও প্রাণপণ লড়াই করবে। কেহই যুদ্ধ ছেড়ে পলায়ন করবে না। মুসলমানরা তখনই মেরিডায় প্রবেশ করতে পারবে যখন একজন খ্রিস্টানও জীবিত থাকবে না।
আমীরে মুহতারাম। শহরের কোন মানুষের মাঝে আমি ভয়-ভীতির ছাপও দেখতে পাইনি। তাদের বাহিনীকে অত্যন্ত চৌকস মনে হল। তারা শহর থেকে বের হয়েই যুদ্ধ করবে। শহরে ধন-সম্পদের প্রাচুর্য ভোলা চোখেই দেখা যায়। কিন্তু ভোগ-বিলাসের প্রতি মোটেই কারো ক্ষেপ নেই। প্রধান পাদ্রি জনসাধারণকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছে।’
***
মেরিডার দিকে রওনা হওয়ার পূর্বে মুসা বিন নুসাইর নিজ বাহিনীকে লক্ষ্য করে এক জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। ফলে সৈন্যদের মাঝে নতুনভাবে যুদ্ধের স্পৃহা ও উদ্দীপনা জেগে উঠে। মেরিডার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সময় মুসা বিন নুসাইরের তিন ছেলে তার সাথেই ছিল। তিনি তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন :
‘আমার প্রিয় সন্তানরা! আমার প্রতিটি কথা খুব মনযোগ দিয়ে শুন। আমার এই কথাকেই আমার অন্তিম ওসিয়ত মনে করবে। আমার বয়সের দিকে লক্ষ্য কর, আমার শরীর একেবারে ভেঙ্গে পড়েছে। আমার আধ্যাত্মিক শক্তিই আজ আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। সে শক্তির বলেই আমি যুদ্ধ করছি। তোমরা ভালো করেই জান, আমি কত যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছি। আমার জীবনের অর্ধেকের চেয়েও বেশি সময় কেটেছে যুদ্ধের ময়দানে। মনে করতে পার, আমার একার শারীরিক শক্তি তোমাদের তিনজনের শরীরে স্থানান্তরিত হয়েছে। এখন তো আমি যে কোন সময়ই মারা যেতে পারি। যুদ্ধের ময়দানে ঘোড়ার পিঠে আমার মৃত্যু হতে পারে। আবার বিছানায় শুয়ে শুয়েও আমি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারি। একমাত্র তোমাদেরকেই আমার মৃত্যুর পর আমার সুনাম ও আমার আদর্শকে জিন্দা রাখতে হবে।
আমি তোমাদেরকে এক নতুন মুলুক জয় করে দিয়ে যাচ্ছি। এটাই আমার জীবনের শেষ যুদ্ধ। হতে পারে–এই যুদ্ধেই আমি মারা যাব। আমার এই উত্তরাধিকার তোমাদেরকেই ধরে রাখবে হবে…। আবদুল আযীয! তোমাকে আমি এখনই বলে দিচ্ছি, তুমিই হবে আন্দালুসিয়ার প্রথম আমীর। কাকে আমীর বানাব–সেই এখতিয়ার আমার আছে। তোমার ব্যাপারে আমি খলীফার কাছ থেকে অনুমোদন নিয়ে নিব।’
‘শ্রদ্ধেয় আব্বা হুজুর!’ মুসার পুত্র আবদুল্লাহ বললেন। “বিন যিয়াদ কি আন্দালুসিয়ার আমীর হওয়ার হকদার নয়? সেই তো আন্দালুসিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে। আজ সে আন্দালুসিয়ার রাজধানী টলেডোর শাহীমহলে অবস্থান করছে। টলেডো হল আন্দালুসিয়ার রাজধানী, আন্দালুসিয়ার প্রাণ।
‘বৎস!’ মুসা বললেন। আমি যা জানি তোমরা তা জানি না। আমি যা চিন্তা করি তোমরা তা চিন্তা করো না। এখন আমার এই উপদেশ হৃদয়ঙ্গম করে নাও, রণাঙ্গনে থাক কিংবা শত্রুর বেষ্টনীর মাঝে থাক, কোন অবস্থাতেই পিষ্টপ্রদর্শন করবে না। দ্বিতীয় কথা হল, এই রাজ্যে এত বিপুল পরিমাণ ধন-দৌলত আছে–মনে হয় যেন, স্বর্ণ-রোপার নদী বয়ে যাচ্ছে। এখানের নারীদের রূপ-সৌন্দর্য এমনই চোখ ধাঁধানো, আর অশ্লীলতা এতটাই ব্যাপক যে, ইতিপূর্বে তোমরা কখনও তা দেখনি, কোথাও শুনি। তোমরা এখনও যুবক, আর যৌবনকাল অন্ধ হয়ে থাকে। যদি তোমাদের পদস্খলন ঘটে তাহলে তোমরা ঘরে-বাইরে সবখানে লাঞ্ছিত হবে। যেসকল শহীদ আন্দালুসিয়া বিজয়ের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের বিদেহী আত্মার অভিশাপ তোমাদের জন্য ধ্বংস ডেকে আনবে।
