‘তিনি আমার সাহয্যের জন্য এসেছেন। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। এখন আমি নিশ্চিন্তে সামনে অগ্রসর হতে পারব। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই পুরো আন্দালুসিয়া ইসলামী সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।’
ইদ্রিস আবুল কাসেম তারিক বিন যিয়াদকে মুসা বিন নুসাইরের বিজয় অভিযানের দাস্তান বর্ণনা করে শুনাচ্ছিলেন। তারিক বিন যিয়াদ সেসব বিবরণ শুনে মুসা বিন নুসাইরকে আল্লাহর প্রেরিত ফেরেশতা সাব্যস্ত করছিলেন। তিনি মুসা বিন নুসাইরের প্রশংসায় আত্মহারা হয়ে পড়ছিলেন। এই সময় মুসা বিন নুসাইর মেরিডা শহরের অদূরে একটি তাঁবুতে বসে সর্বশেষ অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাঁর নিকট কুরাইশ বংশের দু’জন সম্মানিত ব্যক্তি বসেছিলেন। একজন আলী বিন আবি লাহমী, আর অপরজন হায়াত বিন তামিমী।
‘এমন অবাধ্য আর অহঙ্কারী সিপাহসালারকে কি ক্ষমা করা উচিৎ? মুসা বিন নুসাইর ক্রোধান্বিত হয়ে সভাসদকে লক্ষ্য করে বললেন। আমি এই জংলি বার্বারকে নির্দেশ দিয়েছিলাম, তুমি যেখানে আছ সেখানেই থাক, সামনে অগ্রসর হয়ো না। কিন্তু সে আমার নির্দেশ অমান্য করে তার ফৌজকে তিন ভাগে ভাগ করে বড় বড় শহরগুলো বিজয় করে নিজে টলেডো গিয়ে বসে আছে।’
‘অন্তত টলেডো আপনার বিজয় করা দরকার ছিল।’ হায়াত বিন তামিমী বললেন। এখন এটাই প্রসিদ্ধ হয়ে যাবে যে, বার্বাররা আন্দালুসিয়া জয় করেছে।
‘আমি আরবদেরকে আন্দালুসিয়ার বিজয়ী বানাতে চাই।’ মুসা বললেন। ‘আমি এই বার্বার তারিককে সিপাহসালারের পদ থেকে অপসারিত করব।
‘আরেকটা বিষয় লক্ষ্য রাখা উচিৎ, বিন নুসাইর! আলী বিন আবি শাহমী বললেন। তারিকের কাছে গনিমতের যেসব মূল্যবান সম্পদ রয়েছে, তা তার থেকে নিয়ে নেওয়া উচিৎ। সে নিশ্চয় এটা চিন্তা করে রেখেছে যে, এসব মূল্যবান সম্পদ খলীফার নিকট হাদিয়াস্বরূপ পেশ করবে। সেসব মূল্যবান বস্তু আপনি নিজে দামেস্ক নিয়ে যাবেন। বাবার তারিককে এ ব্যাপারে কৃতিত্ব লাভের মওকা দেওয়া ঠিক হবে না। অন্যথায় সে আমীরুল মুমিনিনের আস্থাভাজন হয়ে যাবে।
কী আশ্চর্য! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেছেন মাত্র আশি বছর হয়েছে। প্রিয়নবীর সান্নিধ্যধন্য কিছু লোক তখনও জীবিত ছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহর শিক্ষা মানুষের অন্তর থেকে ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছিল। মুসলমানদের মাঝে উঁচু-নীচুর মানদণ্ড বদলে যাচ্ছিল।
তারিক বিন যিয়াদ অত্যন্ত খুশী হচ্ছিলেন। কারণ, তিনি মুসা বিন নুসাইরকে জন্মদাতা পিতার মতোই সম্মান করতেন। তিনি মনে মনে ভাবছিলেন, মুসা বিন নুসাইর তাঁর সাহায্যের জন্য এত দূর এসেছেন। অর্ধেক আন্দালুসিয়া জয় করার দরুন মুসা তাঁকে প্রাণ খোলে অভিনন্দন জানাবেন।
***
মুসা বিন নুসাইরের তিন ছেলে। আবদুল্লাহ, মারওয়ান ও আবদুল আযীয়। বড় ছেলে আবদুল আযীযকে তিনি আফ্রিকায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে এসেছিলেন। আর বাকী দুজনকে নিজের সাথে আন্দালুসিয়া অভিযানে নিয়ে আসেন। তিনি আন্দালুসিয়া এসে যখন বিভিন্ন জায়গায় বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠতে দেখলেন তখন তিনি তার বড় ছেলেকে আন্দালুসিয়া নিয়ে আসা সমীচীন মনে করলেন।
মুসা বিন নুসাইর মেরিডার দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। মুসার গুপ্তচর বাহিনীর চৌকস একটি দল পূর্বেই মেরিডা পৌঁছে গিয়েছিল। তারা ফিরে এসে সেই শহরের সম্পূর্ণ ইতিহাস এবং শহর রক্ষাপ্রাচীরের অভ্যন্তরীণ সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরেন।
মেরিডা আন্দালুসিয়ার এক বিশাল বড় শহর ছিল। আন্দালুসিয়ার রাজধানী টলেডো থেকেও মেরিডা অনেক সুন্দর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আর নয়নাভিরাম দৃশ্যে মেরিডা টলেডোকেও হার মানাবে। এই শহরের এমন সৌন্দর্যের স্রষ্টা ছিলেন একজন রুমী বাদশাহ। রুমী বাদশাহ এই শহরটিকে কেবল সৌন্দর্যের মহিমায় সুশোভিতই করেনি; বরং তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও করেছিলেন সুসম। তিনি স্থাপত্য সৌন্দর্যের নিদর্শনস্বরূপ অসংখ্য ভবন নির্মাণ করেন। সেসব ভবনের ধ্বংসাবশেষ আজও তার অপরূপ সৌন্দর্যের চিহ্ন বহন করছে। রুমী বাদশাহর নাম ছিল আগাষ্টাস। তিনি এই শহরের সৌন্দর্য এতটাই বৃদ্ধি করেছিলেন যে, মনে হচ্ছিল, এটাই তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।
রুমী বাদশাহ শুধুমাত্র মেরিডার সৌন্দর্যই বৃদ্ধি করেননি; বরং তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এতটাই মজবুত করেছিলেন যে, শহরটি এক অপ্রতিরোধ্য দুর্গে পরিণত হয়। তিনি শহর রক্ষাপ্রাচীরই শুধু মজবুত করেননি, বরং তার সৈন্যদেরকেও এমন ট্রেনিং দিয়েছিলেন যে, কোন শক্তিশালী শত্রুবাহিনীও শহর অবরোধ করতে সাহস করত না। তিনি শহরের চতুর্পার্শ্বে এমন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন যে, কোন হানাদার বাহিনী শহরের কাছেও আসতে পারত না। তার নিজস্ব সেনাবাহিনীকে এমন প্রশীক্ষণ দেওয়া হয়েছিল যে, তারা শহর থেকে বের হয়ে হানাদার বাহিনীর উপর আক্রমণ করতে এবং দীর্ঘ দিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম ছিল।
ঐতিহাসিক ‘কোভে’ লেখেন, কি কারণে কে জানে, রোমের বাদশাহরা এই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, মেরিডাকে রোম থেকেও বেশি সুন্দর বানাবে। রোমের তুলনায় মেরিডাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করার ক্ষেত্রে তারা জিদের বশবর্তী হয়ে পড়েছিল। শহরের পাশ দিয়ে ‘দাদিয়ানা’ নদী প্রবাহিত ছিল। সেই নদীর উপর যে পুল নির্মাণ করা হয়েছিল, তার পিলার নদীর মাঝে তৈরী করা হয়েছিল। সে যুগে নদীর মধ্যে পিলার স্থাপন করার চিন্তাই করা যেত না। তার পরও রোমানরা এই আশ্চর্য বিষয়টিও করে দেখিয়েছিল।
