‘তাদেরকে ভিতরে আসতে বল।’ তারিক বিন যিয়াদ বললেন।
কিছুক্ষণ পর পাদ্রি তিনজন ভিতরে প্রবেশ করল।
‘এই টেবিল যদি স্বর্ণের হয় তাহলে তো নিশ্চয় এর মূল্য অনেক বেশি। তারিক বিন যিয়াদ পাদ্রিদেরকে লক্ষ্য করে বললেন। আমি তোমাদেরকে সম্মান করি। কারণ, তোমরা ধর্মগুরু। তবে এ টেবিল আমি তোমাদেরকে ফেরত দিব না।’
‘এই টেবিল সম্পূর্ণ স্বর্ণের তৈরী।’ একজন পাদ্রি বললেন। টেবিলটির চারপাশে আছে দুর্লভ মণি-মুজা আর হীরা-জহরতের কারুকাজ। পায়াগুলো তৈরী হয়েছে মহামূল্যবান নীলকান্তমণি, পদ্মরাগ আর মরকত পাথর দিয়ে। এই টেবিল অত্যন্ত মূল্যবান, এ জন্য আমরা এটা নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছি না; বরং এটা আমাদের নিকট এক পবিত্র স্মৃতি। দেখুন, এই টেবিলের উপর স্বর্ণের একটি রেহাল বানানো আছে। রেহালটি টেবিলের সাথে জোড়া লাগান। এই টেবিল আমাদের গির্জার সম্পত্তি। আপনি হয়তো বিশ্বাস করবেন না যে, এই টেবিল হযরত সুলায়মান আলাইহিসসালামের। বহুকাল পূর্বে টাইটিস নামে আন্দালুসিয়ার এক বাদশাহ জেরুজালেম আক্রমণ করেছিলেন। এই টেবিল তিনি সেখানকার সবচেয়ে বড় উপাসনালয় থেকে নিয়ে এসেছিলেন। তখন থেকে রডারিক পর্যন্ত যত বাদশাহ অতিবাহিত হয়েছেন তারা সকলে এই টেবিলের সাথে একটি মূল্যবান হীরা সংযুক্ত করে এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছেন। আমরা আপনার কাছে আবেদন করছি, আপনি আমাদের থেকে এই টেবিল ছিনিয়ে নিবেন না। এটা হযরত সুলায়মান আলাইহিসসালামের স্মৃতি, এ থেকে আমাদেরকে বঞ্চিত করবেন না।’
‘এখন আন্দালুসিয়ার রাজমুকুট ও সিংহাসন আমাদের কজায়, সুতরাং এই টেবিলও আমাদের কাছেই থাকবে। তারিক বিন যিয়াদ বললেন।
প্রায় সকল ঐতিহাসিকই অতি মূল্যবান এই টেবিলের কথা উল্লেখ করেছেন। এই টেবিলের প্রতিটি পায়া টেবিল থেকে পৃথক করা যেত এবং মুহূর্তের মধ্যে টেবিলের সাথে লাগানো যেত। তারিক বিন যিয়াদ টেবিলটি পাদ্রিদেরকে ফিরত দিলেন না। মালে গনিমত হিসেবে নিজের কাছে রেখে দিলেন।
এই মুহূর্তে এই টেবিলের গুরুত্ব শুধু এতটুকুই ছিল যে, এটি একটি মহামূল্যবান টেবিল। পরবর্তী সময়ে এই টেবিল মুসা বিন নুসাইরের জন্য এমন এক লজ্জার বিষয়ে পরিণত হয় যে, ইতিহাসে সে ঘটনা আজও লেখা আছে।
তারিক বিন যিয়াদের আশে-পাশে যেসব সালার ছিল তাদেরকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন,
‘আমীরুল মুমিনীনের জন্য এর চেয়ে চিত্তাকর্ষক হাদিয়া আর কী হতে পারে? আমি দামেস্ক গিয়ে নিজ হাতে এ টেবিল খলীফাতুল মুসলিমীনের খেদমতে পেশ করব।’
‘আমরা সিপাহসালারকে সতর্ক করা কর্তব্য মনে করছি। একজন পাদ্রি বললেন। এ পর্যন্ত কোন বাদশাহ এই টেবিলের মালিকানা দাবি করেনি। সকলেই বলেছে, এর মালিক হলেন, হযরত সুলায়মান আলাইহিসসালাম। আর হযরত সুলায়মান ছিলেন মানব ও জিন জাতির নবী। এই টেবিলের হেফাজতকারী হল জিন জাতি। এ জন্য এই টেবিল এতদিন গির্জার হেফাযতে ছিল। যদি সিপাহসালার বা অন্য কেউ এর মালিকানা দাবি করেন তাহলে তিনি লাঞ্ছনা-গঞ্জনার শিকার হয়ে ধুকে ধুকে অসহায়ের মতো মৃত্যুবরণ করবেন।
‘এই টেবিলের মালিকানা হযরত সুলায়মান আলাইহিসসালামেরই থাকবে। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। আমরা মুসলমান, আর মুসলিম জাতি কখনও স্বর্ণ-রোপাকে নিজেদের মালিকানায় রাখে না। তোমরা এখন যেতে পার। শহর থেকে পালানোর কোন প্রয়োজন নেই। তোমাদের গির্জা বা উপাসনালয়ে চলে যাও। তোমাদের এবং তোমাদের গির্জাসমূহের কোন অসম্মানি করা হবে না।’
***
পর দিন সকালে তারিক বিন যিয়াদ শাহীমহলের সামনের প্রশস্ত মাঠে ফজরের নামাযের ইমামতি করলেন। নামায শেষ করে তিনি শাহীমহলে ফিরে যাচ্ছিলেন। এমন সময় একজন ভারপ্রাপ্ত প্রশসক–যিনি রাজদূতের দায়িত্বও পালন করতেন–দৌড়ে এলেন। তার নাম ইদ্রিস আবুল কাসেম। তিনি অনেক দূর থেকে এসেছিলেন।
‘বিন যিয়াদা’ রাজদূত তারিক বিন যিয়াদকে সালাম জানিয়ে আরয করলেন। ‘আপনি কি জানেন, আফ্রিকার আমীর মুসা বিন নুসাইর আঠার হাজার সিপাহী নিয়ে আন্দালুসিয়া এসে পৌঁছেছেন?
“তিনি কবে এসেছেন?’ তারিক বিন যিয়াদ এমনভাবে জিজ্ঞেস করলেন যে, অবাক হওয়ার পরিবর্তে তার কণ্ঠ থেকে আনন্দ ঝরে পড়ল। তিনি এখন কোথায়? আমি জানতাম, তিনি আমার সাহায্যের জন্য অবশ্যই আসবেন।
প্রায় এক বছর হতে চলল তিনি আন্দালুসিয়া এসেছেন।’ ইদ্রিস আবুল কাসেম বলল। যেসকল শহর আপনি জয় না করে ছেড়ে এসেছিলেন, তা তিনি বিজিত করেছেন।’
‘মুসা বিন নুসাইর জিন্দাবাদ!’ তারিক বিন যিয়াদ আনন্দের আতিশয্যে চিৎকার করে উঠলেন। তিনি আমার কাজ পূর্ণ করে দিয়েছেন, আমি তাকে শুধু আমীর মনে করি না; আমার বাবাও মনে করি।’
‘আপনি যেসব শহর জয় করেছিলেন সেগুলো হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল। ইদ্রিস বলল। যদি সঠিক সময়ে আফ্রিকার আমীর মুসা বিন নুসাইর জানতে না পারতেন তাহলে মেদুনা, সেদুনা এবং কারমুনায় বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠত। সেখানে বিদ্রোহ শুরু হয়ে গিয়েছিল। আমীর মুসা সঠিক সময়ে আক্রমণ করে সে সকল শহর নিজ হেফাযতে নিয়ে নিয়েছেন।
তারিক বিন যিয়াদের কণ্ঠ থেকে মুসা বিন নুসাইরের প্রশংসা ও স্তুতি ঝরে পড়ছিল। তিনি মুসা বিন নুসাইরকে আল্লাহ তাআলার পাঠানো ফেরেশতা বলে দাবি করছিলেন। মুসা বিন নুসাইর যেসব স্থান দখল করেছিলেন ইদ্রিস আবুল কাসেম তারিক বিন যিয়াদকে সেসব স্থানের বিবরণ দিচ্ছিলেন।
