সে কি ইহুদি ছিল?’ তারিক বিন যিয়াদ জিজ্ঞেস করলেন।
‘হ্যাঁ, বিন যিয়াদ! সে ইহুদি ছিল। জুলিয়ান বলল।
‘জাদুবিদ্যা ইহুদিদেরই আবিষ্কার। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। ইহুদিরাই এ ব্যাপারে বেশি পারদর্শী।
‘মেরিনা এখন তুমি বল, এ ব্যক্তি কীভাবে মৃত্যুবরণ করেছে?’ আউপাস বলল।
‘রডারিক যখন আপনার সাথে মুকাবেলা করার জন্য যাচিছল তখন সে কিছু অশুভ লক্ষণের সম্মুখীন হয়েছিল।’ মেরিনা তারিক বিন যিয়াদকে লক্ষ্য করে বলল। ‘তখন সে এই জাদুকরকে ডেকে বলেছিল, এই অশুভ লক্ষণকে পরিবর্তন করে তার অনুকূলে নিয়ে আসতে। সে জাদুবিদ্যার মাধ্যমে আপনার উপর বিজয় অর্জন করতে চাচ্ছিল।
রডারিকের ইচ্ছাকে বাস্তবায়নের জন্য জাদুকর রডারিকের নিকট একটি ষোল-সতের বছরের কুমারী মেয়ের আবেদন করল। সে রডারিককে বলল, ঐ মেয়ের কলিজা বের করে এমন আমল করবে যে, রডারিক বিজয়ী হবে, আর হামলাকারীরা তার হাতে পরাজিত হবে।
শাহ রডারিক আমাকে হুকুম দিল, আমি যেন এই জাদুকরের নিকট তার কাঙ্ক্ষিত কোন মেয়েকে পাঠিয়ে দেই। জাদুকর যেমনটি চাচ্ছিল আমার নিকট ঠিক তেমনি একটি মেয়ে ছিল। আমি ঐ দিন রাতে মেয়েটিকে নিয়ে জাদুকরের কাছে গেলাম। জাদুকর মেয়েটির বুক চিড়ে কলিজা বের করার জন্য যেই তাকে টেবিলের উপর শুয়ালো তখন আমি একটি মজবুত লাঠি দ্বারা তার মাথায় তিনবার আঘাত করলাম। সে বেহুশ হয়ে পড়ে গেল। তারপর আমি তাকে গলাটিপে হত্যা করে ফেলি। তারপর ঐ মেয়েটির সাহায্যে তার লাশ এ বাক্সে ভরে রাখি। পরদিন সকালে রডারিক রওনা হয়ে গেলে আমি ঐ মেয়েটিকে তার ঘরে পৌঁছে দেই। সেই রাত হতে জাদুকরের লাশ এই বাক্সে বন্দী হয়ে আছে। সে যদি তার তদবির পূর্ণ করতে পারত তাহলে রডারিকেরই বিজয় হতো।
‘তার লাশ আমার কাছে কেন নিয়ে এসেছ?’ তারিক বিন যিয়াদ জিজ্ঞেস করলেন।
এর চেয়ে উত্তম কোন তোহফা আমার নিকট ছিল না। মেরিনা বলল। ‘লাশ কোথায়; এখন তো শুধু হাড়ের স্কুপ রয়েছে। এগুলো জ্বালিয়ে ফেলুন, কিংবা দাফন করে রাখুন–এখন থেকে আমি মুক্ত।
মেরিনা তার কথা শেষ করে ঝুঁকে তারিক বিন যিয়াদকে সালাম করল। তারপর এ কথা বলতে বলতে বাইরে বেরিয়ে গেল, আমি এখন মুক্ত, আমি এখন মুক্ত।
এই ঘটনার পর আউপাস মেরিনাকে অনেক তালাশ করেছে, কিন্তু কোথাও তার কোন সন্ধান পায়নি।
৭. আমি এখন মুক্ত
০৭.
তারিক বিন যিয়াদ নিষ্পলক দৃষ্টিতে সেই দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন, যে দরজা দিয়ে মেরিনা এ কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গেল–’আমি এখন মুক্ত, আমি এখন মুক্ত।
তারিক বিন যিয়াদের কপালে চিন্তার বলিরেখা ফুটে উঠল। সুনিশ্চিতরূপে কারও পক্ষেই এ কথা বলা সম্ভব ছিল না, তিনি এখন কী চিন্তা করছেন।
তিনি হয়তো ভাবছিলেন, কী অদ্ভুত মেয়ে মানুষ! এই নারী যদি ঐ জাদুকরকে হত্যা না করত! কিংবা তিনি হয়তো এ কথা ভাবছিলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে স্বপ্নে বিজয়ের যে সুসংবাদ দিয়েছেন, তা পূর্ণ করার জন্য আল্লাহ তাআলা কত আশ্চর্যজনক ও অলৌকিক ঘটনাপ্রবাহের জন্ম দিচ্ছেন। সতীতৃহারা একজন অমুসলিম নারী, যে ইসলামের সবচেয়ে বড় দুশমন ইহুদি সম্প্রদায়ের একজন সদস্য–সে কিনা আপন গোত্রের এক জাদুকরকে হত্যা করেছে, যে তার জাদুবিদ্যার মাধ্যমে মুসলিম বাহিনীকে পরাজিত করার চেষ্টা করছিল।
তারিক বিন যিয়াদের চেহারায় গভীর চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল। দরবারের বাইরে কয়েকজন মানুষের কথার আওয়াজ শুনা গেল। কিছুক্ষণ পর প্রহরী দরবারে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করে বলল, ‘মুসলিম বাহিনীর কয়েকজন সিপাহী সিপাহসালারের সাথে সাক্ষাৎ করতে চাচ্ছে।’
এই মহল যে বাদশাহর ছিল সে মৃত্যুবরণ করেছে। তারিক বিন যিয়াদ সম্বিত ফিরে পেয়ে বললেন। এখন এখানে কোন বাদশাহ নেই, যার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য অনুমতির প্রয়োজন হবে। যারা আসতে চায় তাদেরকে আসতে দাও।
প্রহরী দরজা থেকে সরে দাঁড়ালে তিনজন ব্যক্তি একটা টেবিল ধরাধরি করে ভিতরে প্রবেশ করল। তিনজনই তারিক বিন যিয়াদের বাহিনীর লোক। তাদের একজন উচ্চপদস্থ সেনাকর্মকর্তা। টেবিলটি খুব বড় ছিল না। দেখলে মনে হত, একজনই এই টেবিল উঠাতে পারবে। কিন্তু টেবিলের ওজন ছিল খুবই বেশি।
‘এটি আবার কি?’ তারিক বিন যিয়াদ বললেন।
‘সিপাহসালার। এটি একটি টেবিল।’ সেনাকর্মকর্তা বলল। আমরা শহর থেকে পলায়মান লোকদেরকে বাধা দিচ্ছিলাম এবং তাদেরকে এই বলে অভয় দিচ্ছিলাম যে, তারা যেন আমাদেরকে ভয় না পায় এবং সকলেই যার যার ঘরে চলে যায়। আমরা তাদেরকে এই প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছিলাম যে, তাদের জান-মাল ও ইজ্জত-আবরুর হেফাযত করা হবে। এমন সময় আমরা দেখতে পেলাম, শহরের পিছন দিকের ফটক দিয়ে একটা ঘোড়ার গাড়ি বের হয়ে গেল। আমরা গাড়ি থামানোর জন্য নির্দেশ দিলাম, কিন্তু গাড়োওয়ান দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। আমার সন্দেহ হল, আমি এই দুই সিপাহীকে সাথে নিয়ে তাদের পিছু নিলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর আমরা তাদেরকে ধরতে সক্ষম হলাম। গাড়িতে পাদ্রির মতো দেখতে তিনজন লোক ছিল। তাদের কাছে এ টেবিলটি ছিল। এটি সম্পূর্ণ স্বর্ণের তৈরী।
আমি পাদ্রিদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, আমরা গাড়ি থামাতে বলার পরও কেন তোমরা গাড়ি থামালে না? তারা বলল, এই টেবিল রক্ষা করার জন্য আমরা থামিনি। আমি তাদেরকে শহরে ফিরে আসতে বললে তারা আমাকে অনুনয়-বিনয় করে বলল, এই টেবিল অত্যন্ত পূত-পবিত্র ও বরকতময়। তারা চায় না যে, এটা অন্য ধর্মের কোন লোকের হাতে পড়ুক। আমি তাদেরকে সাথে করে নিয়ে এসেছি।’
