সে রাতে আউপাস মেরিনার কামরায় প্রবেশ করল। আউপাসের ধারণা ছিল মেরিনা ভালোবাসার আকর্ষণে নিজেকে তার কাছে সমর্পণ করবে। কিন্তু আউপাস মেরিনাকে খুব নীরব দেখতে পেল। তার ঠোঁটে একটু মুচকি হাসিও দেখতে পেল না। সে যখন কথা বলত তখন তার কথা বলার ধরন হত গাম্ভির্যপূর্ণ। মনে হচ্ছিল মেরিনা দুনিয়া ত্যাগী সন্নাসী হয়ে গেছে। পার্থিব ভোগ-বিলাসের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই।
‘মেরীনা! বাকী জীবনটা আমার সাথে কাটাবে কি? আউপাস জিজ্ঞেস করল।
“না, আউপাস!’ মেরিনা উদাস কণ্ঠে বলল। আমার বাকী জীবন এখন উপাসনালয়ে অতিবাহিত হবে। যেন আমার আত্মা পুত-পবিত্র হতে পারে। এখন আমি আল্লাহর নিকট নিজেকে অর্পণ করতে চাই।’
‘যাজিকা হয়ে যেয়ো না।’ আউপাস মুচকী হেসে বলল। “তুমি তো এখনও যুবতী। স্বাধীন জীবনের সাধ উপভোগ করে নাও।’
‘না, আউপাস!’ মেরিনা বলল। আমার জীবনে যা ঘটে গেছে তা তুমি ভালো করেই জান। এখন তুমি আমাকে তোমার ভালোবাসার বন্ধন থেকে মুক্তি দাও। এক কাজ কর আউপাস! আমি আন্দালুসিয়া বিজয়ী সিপাহসালার তারিক বিন যিয়াদকে একটা তোহফা দিতে চাই, তুমি আমাকে তাঁর সাথে দেখা করার সুযোগ করে দাও।’
‘কালই তোমাকে তাঁর নিকট নিয়ে যাব।’ আউপাস বলল। কী তোহফা দেবে তাকে?
‘একটি ভারী বক্সি। মেরিনা বলল। আগামীকাল তিন-চারজন লোক নিয়ে এসো, তারা বাক্স বহন করে নিয়ে যাবে।’
পরদিন সকালে যখন তারিক বিন যিয়াদের পাঠানো লোকেরা গির্জার ভূ-গর্ভস্থ ঘর থেকে গুপ্তধন উদ্ধার করছিল তখন আউপাস শাহীমহলের এক কামরা থেকে একটি বাক্স উঠাচ্ছিল। এই কামরা এক বছরেরও কিছু বেশি সময় ধরে তালাবদ্ধ হয়ে আছে।
বাক্স নেওয়ার জন্য আটপাস যখন লোকজন নিয়ে মেরিনার কাছে এলো তখন মেরিনা কামরা খোলে দিলে তারা দ্রুত পিছু হঠে গেল।
‘মেরিনা! এই কামরায় কি আছে? এত দুর্গন্ধ কিসের? আউপাস জিজ্ঞেস করল। ‘এই কামরায় কি কোন মানুষ, কিংবা কোন প্রাণী মরে পচে আছে নাকি?
‘কামরা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে এ দুর্গন্ধ হচ্ছে। মেরিনা বলল। ‘তাছাড়া এই কামরায় কত কি পড়ে আছে। এটা ইহুদি জাদুকর বোসজনের কামরা। সে এখানে মানুষের মস্তক, কলিজা ও হাড়-গৌড় রাখত। এখানে সে সাপ-বিচ্ছুও রাখত। এছাড়া এমন কিছু গাছ-গাছালির লতা-পাতাও রাখত, যার দুগন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে।
‘সে এখন কোথায়? উপাস জিজ্ঞেস করল।
‘মরে গেছে।’ মেরিনা উত্তর দিল। আমি তার এই বাক্স তারিক বিন যিয়াদকে তোহফা হিসেবে দিতে চাই।’
এর মাঝে কি আছে? আউপাস জানতে চাইল। তুমি কি অনুভব করতে পারছ না যে, এ থেকে কি পরিমাণ দুর্গন্ধ বের হচ্ছে?
‘আউপাস!’ মেরিনা বলল। এতে কি আছে, তা শুধু তারিক বিন যিয়াদই দেখবেন। তিনি যদি অসন্তুষ্ট হন তাহলে তিনি আমাকে যে শাস্তি দেবেন আমি তা মাথা পেতে নেব।’
চারজন ব্যক্তি বাক্সটি নিয়ে রওনা হল। তাদের পিছনে পিছনে আউপাস মেরিনাকে নিয়ে তারিক বিন যিয়াদের সামনে এসে উপস্থিত হল।
‘বিন যিয়াদ!’ আউপাস তারিক বিন যিয়াদকে লক্ষ্য করে বলল। এই হল সেই নারী, যিনি আপনাকে হাজার হাজার গোথ ও ইহুদি সিপাহী প্রদান করেছিল। গোয়াডিলেটের যুদ্ধে যে হাজার হাজার গোথ ও ইহুদি সিপাহী রডারিকের পক্ষ ত্যাগ করে আমাদের বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল, তার নেপথ্য কারণ ছিল এই নারী।
আউপাস তারিক বিন যিয়াদকে পূর্বেই বলেছিল, মেরিনা গোথ ও ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতাদেরকে কীভাবে তার পক্ষে নিয়ে এসেছিল এবং তারা কীভাবে রণাঙ্গনে মুসলিম বাহিনীর পক্ষে কাজ করেছে।
‘আমরা এই নারীকে তার আকাক্ষার চেয়ে ঢের বেশি উপহার দেব।’ তারিক বিন যিয়াদ বললেন।
‘হে সিপাহসালার! মেরিনা বলল। আমি উপহারের আশায় এ কাজ করিনি। আমি রডারিক থেকে প্রতিশোধ নিয়েছি। আমি আপনার অনুগ্রহ চাই না। আমি আমার আত্মাকে শান্ত করেছি। এখন আমি আপনার জন্য একটি হাদিয়া নিয়ে এসেছি।
কাঠের বাক্স তারিক বিন যিয়াদের সামনে রাখা হল। মেরিনা চাবি বের করে তার তালা খোলে ঢাকনা উঠাল। সাথে সাথে তারিক বিন যিয়াদ ও তার সাথে আর যারা বাক্সের সামনে ছিলেন, সকলেই ছিটকে দূরে সরে গেলেন। তারা সকলেই নাকে হাত ও কাপড় চেপে ধরলেন। বাক্স থেকে যে দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল তার কারণে কামরায় থাকাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল।
এই বাক্সে কি আছে?’ তারিক বিন যিয়াদ জিজ্ঞেস করলেন।
‘এক ব্যক্তির লাশ।’ মেরিনা বলল। এক বছর যাবৎ এই লাশ বাক্সে তালা বদ্ধ হয়ে আছে।
‘রডারিকের লাশ নয় তো?’ জুলিয়ান বলল।
‘না।’ মেরিনা উত্তর দিল। শাহ রডারিককে আমরা যেতে দেখেছি, ফিরে আসতে দেখিনি। কাউন্ট জুলিয়ান! এ লাশ যার, তাকে আপনি চিনেন। রডারিকের প্রিয় জাদুকর বোসজানের লাশ এটা। সিপাহসালারকে বলুন, এই জাদুকর যদি জীবিত থাকত তাহলে সিপাহসালার আজ এখানে বিজয়ীর বেশে দাঁড়িয়ে থাকতেন না। এখানে থাকত রডারিক, আর সিপাহসালার তার সামনে জিঞ্জিরাবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
‘এই নারীকে বল, পুরো ঘটনা বর্ণনা করতে। তারিক বিন যিয়াদ বললেন।
‘এই ব্যক্তির নাম বোসজান। জুলিয়ান মেরিনার কথা তরজমা করে শুনাল। সে রডারিককে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সংবাদ দিত। এই ব্যক্তি জ্যোতিষশাস্ত্রে অত্যন্ত পারদর্শী ছিল। রডারিক তার ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য মনে করত। রডারিক সর্বদা তাকে কাছে কাছে রাখত। তাকে জিজ্ঞেস না করে রডারিক কোন কাজই করত না। বোসজান ছিল একজন পাকা জাদুকর।
