ঐ শহরে যেসব ধন-দৌলত হীরা-জহরত মুসলিম বাহিনীর হস্তগত হল, তা ছিল অপরিসীম। শহরের অধিবাসীদের যারা চলে গিয়েছিল তাদের ঘরসমূহে তল্লাশী নেওয়া হল। সেখান থেকেও বিপুল পরিমাণ হীরা-জহরত বের হল। স্বর্ণ-রোপার অসংখ্য পাত্র পাওয়া গেল। কর্তিত হীরা ও নকশা করা মণি-মুক্তার দুটি পও পাওয়া গেল।
তারিক বিন যিয়াদের নির্দেশে শাহীমহলের তামাম মণি-মুক্তা ও হীরা-জহরত এক কামরায় একত্রিত করা হল। ঐতিহাসিকগণ লেখেন, মণি-মুক্তা ও হীরা-জহরত এত বেশি ছিল যে, বড় ধরনের একটি কামরা একেবারে ভরে গেল। রত্নভাণ্ডারের আধিক্য দেখে তারিক বিন যিয়াদের চেহারার রং পাল্টে গেল। এই মহামূল্যবান সম্পদের তূপের মাঝে রডারিক পর্যন্ত আন্দালুসিয়ার সকল বাদশাহর মাথার মুকুটও ছিল। প্রত্যেক বাদশাহর জন্যই পৃথক স্বর্ণের মুকুট তৈরী করা হত। বাদশাহর মৃত্যুর পর স্মৃতি হিসেবে তার সেই মুকুট সংরক্ষণ করা হত। নতুন বাদশাহর জন্য নতুন মুকুট তৈরী করা হত। শাহীমহল থেকে পঁচিশটি রাজমুকুট পাওয়া গেল, যা ছিল সম্পূর্ণ স্বর্ণের।
ঐতিহাসিক প্রফেসার ডোজি লেখেন, বাদশাহর মৃত্যুর পর তার রাজমুকুট বড় গির্জাকে নাযরানা স্বরূপ প্রদান করা হত। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক লেখেছেন, রডারিকের শাহীমহল থেকে পঁচিশটি রাজমুকুট তারিক বিন যিয়াদের হস্তগত হয়েছিল।
ঐতিহাসিক লেনপোল কয়েকজন ঐতিহাসিকের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখেছেন, টলেডোতে শুধু একজনই জেনারেল ছিল। সে তার অবৈধ ছেলের হাতে নিহত হয়েছিল। টলেডোতে কোন প্রশাসক ছিল না। শাহীখান্দানের কাউন্ট এবং অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা পালিয়ে গিয়েছিল। শাহীমহলে শুধু রানী ও তার নওজোয়ান ছেলে ছিল। আর ছিল কয়েকজন মধ্য বয়স্ক মহিলা ও কয়েকজন যুবতী মেয়ে। অন্য সব মেয়েরা চলে গিয়েছিল।
আন্দালুসিয়ার রাজধানী টলেডোর উপর তারিক বিন যিয়াদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হল। গোথ ও ইহুদি সম্প্রদায়ের লোকেরা তার পাশে একত্রিত হল। তারিক বিন যিয়াদ তাদের মধ্য থেকে কয়েকজন ব্যক্তিকে নির্বাচন করে তাদের উপর শহরের প্রশাসনিক দায়িত্ব অর্পণ করলেন।
মুসলিম বাহিনী এমন কোন ঘরে প্রবেশ করল না, যে ঘরের অধিবাসী রয়েছে এবং কোন প্রকার লুটতরাজও করল না। তারা কেবল সেসব ঘরে প্রবেশ করল, যেসব ঘর খালি পড়েছিল। সেসব ঘরের মূল্যবান আসবাবপত্র ও ধন-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হল।
***
সকাল হয়েছে অনেক্ষণ হয়। ধীরে ধীরে টলেডো শহর কর্মচঞ্চল হয়ে উঠছে। নতুন দিনে নতুন উদ্যমে তারিক বিন যিয়াদ প্রশাসনিক কাজের খোঁজ-খবর নিচ্ছিলেন। এমন সময় তাঁকে সংবাদ দেওয়া হল যে, একটি যুবতী মেয়ে তার সাথে দেখা করতে চায়।
তারিক বিন যিয়াদ দেখা করার অনুমতি দিলে একটি সুন্দরী যুবতী মেয়ে তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল। মেয়েটির চেহারায় ভয়ের ছাপ সুস্পষ্ট ছিল। সে পাও টেনে টেনে সামনে অগ্রসর হচ্ছিল।
‘তাকে বল, আমি তার মতোই একজন সাধারণ মানুষ। তারিক বিন যিয়াদ দোভাষীকে বললেন। তাকে জিজ্ঞেস কর, সে কেন এসেছে? কোন মুসলমান কি তাকে বিরক্ত করেছে?
‘না। মেয়েটি নিচু আওয়াজে মাথা হেলিয়ে বলল। কোন মুসলমান আমার দিকে ফিরেও তাকায়নি। আমার নাম আইনামেরী। জোরপূর্বক আমাকে যাজিকা বানানো হয়েছিল। আমি শুনেছি যে, আপনার লোকেরা গির্জায় গিয়ে ছিল, তারা সেখানে কিছুই পায়নি। আপনার লোকদেরকে আমার সাথে পাঠান। বড় গির্জার ভূ-গর্ভস্থ ঘরে গুপ্তধন লুকিয়ে রাখা হয়েছে। আপনাদের আগমনের পূর্বেই যদি কেউ তা বের করে নেয় তাহলে সে জন্য আমাকে কোন শাস্তি দেবেন না। আপনি বড় গির্জার ভূ-গর্ভস্থ ঘরে গেলে, সেখানে ফ্লোরে দুটি লাশ দেখতে পাবেন এবং একটি গর্তে আরও তিনটি লাশ দেখতে পাবেন। এই গর্তের পাশেই আরেকটি গর্ত আছে, তা মাটি দিয়ে ভরে রাখা হয়েছে, দেখতে কবরের মতো দেখা যায়। গুপ্তধন এই গর্তেই আছে।’
তারিক বিন যিয়াদ কয়েকজন সিপাহীকে মেরির সাথে পাঠিয়ে দিলেন। মেরি তাদেরকে বড় গির্জার ভূ-গর্ভস্থ ঘরে নিয়ে গেল। মেরির বিবরণ অনুযায়ী তারা ভূ-গর্ভস্থ ঘরের মেজেতে দু’টি লাশ এবং একটি গর্তের ভিতর তিনটি লাশ দেখতে পেল। তারপর অন্য গর্তটি খুঁড়ে সেখান থেকে গুপ্তধনের দুটি বাক্স বের করা হল। এ সকল গুপ্তধন পাদ্রিরা অন্য গির্জা থেকে এনে এখানে লুকিয়ে রেখেছিল।
বড় গির্জা থেকে যখন গুপ্তধন সগ্রহ করা হচ্ছিল তখন আউপাস মেরিনার কামরায় বসাছিল। মেরিনা ও আউপাস যৌবনে একে অপরকে ভালোবাসত। তখন আউপাসের বড় ভাই অর্টিজা ছিল আন্দালুসিয়ার বাদশাহ। অর্টিজা আউপাস ও মেরিনার বিবাহ এই জন্য মেনে নেয়নি যে, মেরিনা ইহুদির মেয়ে। তাছাড়া আউপাস বাদশাহর ভাই। আর মেরিনা একটি সাধারণ ঘরের মেয়ে। এর কিছু দিন পর তাদের দুজনের প্রেমের মাঝে বিশাল এক পাহাড় অন্তরাল হয়ে দাঁড়ায়। রডারিক অর্টিজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাকে হত্যা করে। তারপর রডারিকের দৃষ্টি মেরিনার উপর পড়লে সে তাকে হেরেমের রক্ষিতা বানিয়ে নেয়।
আউলাস ও মেরিনার সেই যৌবনকাল শেষ হয়ে গেছে। এখন তারা মধ্য বয়সের নারী-পুরুষ। মেরিনার তো বিয়েই হয়নি। সে ছিল রডারিকের রক্ষিতা। আর আউপাস সিউটা গিয়ে বিয়ে করেছিল। তার ছেলে-সন্তান আছে।
