‘হ্যাঁ, বিন যিয়াদ! সালার আবু যুর’আ তুরাইফ বললেন, এটা ধোকা ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। এই নদী এই শহরের চারদিক ঘিরে প্রবাহিত হয়। আমরা সামনে অগ্রসর হলে নদীর বেষ্টনীতে আটকা পড়ব। তখন অপর দিক থেকে শহরের সৈন্যবাহিনী এসে অতর্কিতে আমাদের উপর আক্রমণ করে বসবে। তখন এখান থেকে বের হওয়াই আমাদের জন্য মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে।
কিন্তু এখান থেকে তো ফিরেও যাওয়া যাবে না। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। আমরা সামনে অগ্রসর হব।’
তারিক বিন যিয়াদ তার বাহিনীকে যেভাবে পুল পার করে ওপারে নিয়ে গিয়েছিলেন ইতিহাসে তার বর্ণনা এভাবে এসেছে। তিনি প্রথমে অশ্বারোহী বাহিনীকে পাঠিয়েছিলেন। তারপর পদাতিক বাহিনীকে। তারিক বিন যিয়াদের নির্দেশ অনুযায়ী অশ্বারোহী বাহিনী পদাতিক বাহিনীকে চুতর্দিক থেকে ঘিরে রেখেছিল। আক্রমণ হলে সর্বপ্রথম অশ্বারোহী বাহিনী আক্রমণ প্রতিহত করবে। তীরন্দাজ বাহিনীকে ডানে-বায়ে ও পিছনে সদা সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছিল। অতর্কিতে হামলা হলে হামলাকারী বাহিনীকে দ্রুত তীর নিক্ষেপ করে প্রতিহত করার দায়িত্ব ছিল তাদের উপর।
যতটা সতর্কতা অবলম্বন করা সম্ভব ছিল তারিক বিন যিয়াদ তার বাহিনীকে পুল পার করার ক্ষেত্রে ঠিক ততটাই সতর্কতা অবলম্বন করলেন। তারপর কয়েকজন অশ্বারোহীকে দুর্গের আশপাশ পর্যবেক্ষণ করার জন্য দ্রুত পাঠিয়ে দিলেন।
শহরে রব পড়ে গেল, ‘ওরা এসে গেছে। এ আওয়াজ দ্রুত সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ল। শহরের লোক সংখ্যায় খুবই কম ছিল। যারা ছিল তাদের অধিকাংশই ছিল গোথ ও ইহুদি সম্প্রদায়ের লোক।
তারিক বিন যিয়াদের পাঠানো অশ্বারোহী দল শহরের চতুর্দিকে চক্কর লাগিয়ে ফিরে এলো। তারা এসে রিপোর্ট দিল, দুর্গের আশপাশে কোথাও কোন সিপাহী নেই। তারিক বিন যিয়াদ দূর থেকেই দেখেছিলেন যে, দুর্গ রক্ষাপ্রাচীরের উপর কোন সিপাহী নেই। তিনি মনে করলেন, আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা এবং অপেক্ষা করা প্রয়োজন। তিনি তার অধীনস্থ জেনারেল এবং জুলিয়ান ও আউপাসকে পরামর্শের জন্য আহ্বান করলেন। তিনি ফয়সালা করে নিয়েছিলেন যে, শহর অবরোধ করবেন এবং দেখবেন, টলেডোর সিপাহীরা কী করে? তারিক বিন যিয়াদের উদ্দেশ্য ছিল অবরোধ দীর্ঘায়িত করা।
অশ্বারোহী দল ফিরে এলে তাদের কমান্ডার বলল, ‘আশ্চর্যের ব্যাপার হল, আমরা দেখলাম, শহরের দরজা খোলা। লোকজন সে দরজা দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। আমাদেরকে দেখে কয়েকজন লোক শহরের ভিতরে চলে গেল, আর কয়েকজন ভেগে গেল।
তারিক বিন যিয়াদ তার বাহিনীর সালারদের সাথে এ বিষয়ে শলাপরামর্শ করছিলেন, ইতিমধ্যে একজন সিপাহী উচ্চ আওয়াজে ঘোষণা করল, “ঐ দেখ, শহরের সদর দরজা খোলে দেওয়া হয়েছে।’
সকলেই সেদিকে তাকাল। তারা দেখতে পেল, পাঁচ-ছয়জন সম্রাপ্ত ব্যক্তি ঘোড়ায় আরোহণ করে দুর্গ থেকে বের হয়ে আসছে। তারা সেনাবাহিনীর লোক ছিল না। তারা মুসলিম বাহিনীর দিকেই এগিয়ে আসছিল।
তারিক বিন যিয়াদ তাঁর সালারদের সাথে নিয়ে এগিয়ে গেলেন। শহর থেকে যারা বের হয়েছিল তারা তারিক বিন যিয়াদের সামনে এসে ঘোড়া থেকে নেমে দাঁড়াল।
‘আমরা সন্ধি ও দোস্তির পয়গাম নিয়ে এসেছি।’ শহর থেকে আগত লোকদের একজন বলল। আপনারা আমাদের সাথে আসুন এবং শহরের দায়িত্ব গ্রহণ করুন।’
জুলিয়ান ও আউপাস তাদেরকে চিনতে পারল। তাদের দু’জন ইহুদি আর বাকীরা হল গোথ সম্প্রদায়ের লোক। তারা সকলে ঘোড়া থেকে নেমে জুলিয়ান ও আউপাসকে জড়িয়ে ধরল। তারা তারিকের সাথেও করমর্দন করল।
‘তারিক বিন যিয়াদআপনি মহান। আগত লোকদের প্রধান বলল। আজ থেকে আন্দালুসিয়া আপনার।
‘আমার নয়। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। বরং এটা আল্লাহর সেই রাসূলের মুলুক, যিনি আমাকে বিজয়ের সু-সংবাদ প্রদান করেছিলেন। ইসলামে কেউ বাদশাহ হয় না। বাদশাহী একমাত্র আল্লাহর। তাঁর বাদশাহীতে সকল মানুষের মর্যাদা ও অধিকার সমান।
‘আমরা কি এ আশা করতে পারি যে, আমরা আমাদের অধিকার পূর্ণরূপে পাব? গোথ সম্প্রদায়ের একজন বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি বলল।
‘যে অধিকার আপনারা পাবেন, আপনাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও তা স্মরণ রাখবে।’ তারিক বিন যিয়াদ বললেন।
পরবর্তীতে তারিক বিন যিয়াদের এই প্রতিশ্রুতি পূর্ণরূপে আদায় করা হয়েছিল। অর্টিজা এবং তার ভাই আউপাসের সন্তানদেরকে বিপুল পরিমাণ জায়গির প্রদান করা হয়েছিল। এ সমস্ত জায়গির বংশপরম্পরায় তারা ভোগ করেছে।
‘আপনারা কেন এসেছেন?’ তারিক বিন যিয়াদ আগত লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলেন। শহরে কি কোন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা বা শাহীখান্দানের দায়িত্বশীল কোন ব্যক্তি নেই?
‘শহর তো একেবারেই খালি। আগত লোকেরা বলল। সকল সিপাহী শহর থেকে বের হয়ে গেছে। ইউগোবেলজি নামে একজন জেনারেল ছিল। তাকে রডারিকের ছেলে হত্যা করে ফেলেছে। শাহীমহলে আপনাকে ইস্তেকবাল জানান হবে।
শহরের এ প্রতিনিধি দলের সাথে যদি জুলিয়ান ও আইপাসের পূর্ব পরিচয় না থাকত তাহলে তারিক একে ধোঁকা মনে করতেন। যাহোক, তারিক তার বাহিনী নিয়ে দুর্গের দিকে অগ্রসর হলেন।
***
মুসলিম বাহিনী শহরে প্রবেশ করতেই শহরে যেসব লোক তখনও ছিল তারা আনন্দ-ধ্বনির মাধ্যমে তাদেরকে স্বাগত জানাল। শহরের ফৌজ যেখানে বিশ্রাম করত মুসলিম ফৌজকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হল। তারিক বিন যিয়াদ ও তাঁর অন্যান্য সালার এবং জুলিয়ান ও আউপাসকে শাহীমহলে নিয়ে যাওয়া হল।
