‘আমি অল্প বয়সী ও অনভিজ্ঞ। লিজা বলল। আমার অভিজ্ঞতা নেই কাউকে আয়ত্তে আনার জন্য কীভাবে কথা বলতে হয়। এ জন্য আমি খোলাখুলি কথা বলছি, আপনি আমাকে বিবাহ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। আমার স্থলে যদি আপনি হতেন তাহলে আপনিও তাই করতেন। আমার ও আপনার মাঝে বয়সের বিস্তর পার্থক্য। এখন আমি নিজেকে আপনার কাছে সমর্পণ করতে চাই। আপনি চাইলে আমাকে বিয়ে করে স্ত্রী হিসেবে রাখতে পারেন, কিংবা উপপত্নি হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন।
‘তুমি কি জন্য এসেছ, তা আগে বল।’ ইউগোবেলজি বলল।
‘আপনি জানেন, বারগাসান আমার ভাই।’ লিজা বলল। আপনি এও জানেন যে, আমরা দুই ভাই-বোন শাহানশা রডারিকের সন্তান। আপনি কি মনে করেন না যে, আমার ভাইও সিংহাসনের হকদার?’
‘কিন্তু বারগাসান তো বাদশাহর বৈধ সন্তান নয়। ইউগোবেলজি বলল। ‘ধর্মও তাকে রডারিকের সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না। তোমার এ অভিলাস ছোট বাচ্চাদের মতো। এ আশা তুমি পরিত্যাগ কর।’
জেনারেল ইউগোবেলজি শরাব পান করছিল। লিজা তার কোলে এসে বসে বাচ্চাদের মতো তাকে আদর করতে লাগল। শরাব ও সুন্দরী মেয়ের স্পর্শ বৃদ্ধ জেনারেলের মনে নতুন যৌবনের স্পন্দন এনে দিল। সে অবিবেচকের মতো বলতে শুরু করল,
‘তুমিই বল, আমি কীভাবে তোমার ভাইকে সিংহাসনে সমাসীন করতে পারি?
‘রাচমান্ডকে হত্যা করে ফেলুন। লিজা বলল। “রাজ মুকুট ও রাজ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী তো একমাত্র সেই। ঘোষণা হোক বা না হোক; বাদশাহ সেই। সেই যখন মারা যাবে তখন আপনি বারগাসানকে বাদশাহ ঘোষণা করতে পারবেন।’
‘তুমি শুধু নিজের ভাইয়ের মাথায় আন্দালুসিয়ার রাজমুকুট রাখার জন্যই কি এক মায়ের একমাত্র সন্তানকে হত্যা করতে চাও? বৃদ্ধ জেনারেল শরাবের নেশায় টলতে টলতে বলল।
‘শুধু এজন্যই নয়।’ লিজা বলল। আমি শাহজাদা রাচমান্ডকে হত্যা করতে চাই, কারণ তার দ্বারা রাজ্যের অনেক বড় লোকসান হবে। আপনি অবশ্যই দেখছেন, অর্ধেক রাজত্ব হাতছাড়া হয়ে গেছে। হামলাকারী বাহিনী তুফানের মতো ধেয়ে আসছে। শাহজাদার বাবা মারা গেছে। কিন্তু সে পূর্বের মতোই ভোগ-বিলাসে ডুবে আছে। গত রাতে সে আমাকে জোর করে তার বাগানবাড়ী নিয়ে যায়। আমি নিজেকে তার হাত থেকে রক্ষা করতে পারিনি। যদি সম্ভব হত তাহলে আমি নিজ হাতে তাকে বিষ খাইয়ে দিতাম। আমি অনেকবার বলেছি, দেখ আমি তোমার বাবার মেয়ে, তোমার বোন। তবুও সে আমাকে রেহায় দেইনি। তার পরও কি আপনি মনে করেন, তার বেঁচে থাকার কোন অধিকার আছে?
‘হা মনে করি।’ ইউগোবেলজি বলল। তাকে আমি হত্যা করতে পারব না। আর অন্য কাউকে দিয়েও তাকে হত্যা করানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
‘আপনি কি রানীকে ভয় করেন?’ লিজা বলল।
‘না।’ ইউগোবেলজি বলল। কোন বাবার পক্ষে নিজের সন্তানকে হত্যা করা সম্ভব নয়। রাচমান্ড আমার ছেলে, রডারিকের ছেলে নয়। রডারিকের থেকে রানীর কোন সন্তান হয়নি।’
লিজার জন্য এটা কোন আশ্চর্যের কথা ছিল না। শাহীমহলে এমনটিই হতো। কে কার সন্তান? এ প্রশ্নের উত্তর কেবল সন্তানের মা-ই দিতে পারতো।
একজন জার্মান ঐতিহাসিক আগস্ট মেবিল লেখেন, রডারিক একজন যোদ্ধ ছিল ঠিকই; কিন্তু সে তার প্রজা সাধারণকে ক্ষুধা ও দারিদ্রের মাঝে রেখে নিজে ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকত। কোন সেনাবাহিনীই এমন বাদশাহর মঙ্গল কামনা করে না, যে বাদশাহ তার প্রজা ও অধীনস্থদের মঙ্গল কামনা করে না। রডারিক যে এত অল্প সংখ্যক বাহিনীর হাতে পরাজয় বরণ করেছিল, তার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল এটাই।
রডারিকের আপন বিবিও তাকে বিশ্বাস করত না। রডারিক যখন মারা যায় তখন জেনারেল ইউগোবেলজি তার বিবির সামনে বসে শরাব পান করছিল।
লিজা জেনারেল ইউগোবেলজিকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি মুসলমানদের হাত থেকে এই শহরকে রক্ষা করতে পারবেন?
জেনারেল জবাব দিতে যাচ্ছিল এমন সময় দরজা খোলে এক নওজোয়ান প্রবেশ করল।
‘হেলুলো রাচমান্ড!’ জেনারেল আদর করে রাচমাভকে ডাকল। এসো, এসো, বসো।’
রাচমান্ড লিজাকে এখানে আসতে দেখেই তার পিছু নিয়েছিল। এতক্ষণ সে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে লিজা ও জেনারেল ইউগোবেলজির কথাবার্তা শুনছিল। রাচমান্ড নিজেকে রডারিকের একমাত্র সন্তান মনে করত।
‘আমার বাবা তুমি?’ রাচমান্ড জেনারেলকে লক্ষ্য করে বলল। অথচ আমি নিজেকে বাদশাহর ছেলে মনে করতাম।
এ কথা বলেই সে অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে বর বের করল। ইউগোবেলজি শরাবের নেশায় উন্মাদ হয়েছিল। কোন কিছু বুঝার আগেই রাচমান্ড তার বুকে খঞ্জর বসিয়ে দিল। তারপর খঞ্জর টেনে বের করে দ্বিতীয়বার একই জায়গায় খঞ্জরের আঘাত হানল। বৃদ্ধ জেনারেল তৎক্ষণাৎ মুখ থুবরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
লিজা চিৎকার করে পালাতে চাইল, কিন্তু রাচমান্ড তাকে ধরে তার বুকেও পর বসিয়ে দিয়ে চিরতরে খতম করে দিল।
তারিক বিন যিয়াদ তার বাহিনী নিয়ে টাইগিস নদীর তীরে পৌঁছে গেলেন। তাঁর ধারণা ছিল, পুলের ঐ পাড়ে টলেডোর সেনাবাহিনী উপস্থিত থাকবে। তারা মুসলিম বাহিনীকে পুল পার হতে দেবে না। ফলে নদীর তীরেই প্রচণ্ড লড়াই হবে, কিন্তু তারিক বিন যিয়াদ নদীর তীরে কাউকে দেখতে পেলেন না।
‘এত বড় ধোকা ইতিপূর্বে আর কখনও দেখিনি।’ তারিক বিন যিয়াদ বললেন। টলেডোর বাহিনী আমাদেরকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছে।
