‘মুসা বিন নুসাইর কোন নতুন সেনা-সাহায্য ও যুদ্ধরসদ পাঠাচ্ছেন না। অথচ যুদ্ধরসদ ও সেনা-সাহায্যের প্রয়োজন খুবই তীব্র। আমাদের সৌভাগ্য এই যে, কয়েক হাজার বার্বার মুসলমান স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসেছে। তা না-হলে এত কম সংখ্যক সৈন্যদল নিয়ে এই অল্প সময়ে এত বড় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হত না।
তারিক বিন যিয়াদ তো জানতেনই না যে, খোদ মুসা বিন নুসাইর দশ হাজার অশ্বারোহী ও আট হাজার পদাতিক সৈন্য নিয়ে আন্দালুসিয়া প্রবেশ করেছেন।
টলেডোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত মজবুত–এটাই তারিক বিন যিয়াদ জানতেন, কিন্তু বর্তমানে টলেডোর অভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না।
টলেডোর শাহীমহলে অন্য রকম এক নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছিল। শাহীমহলে কোন বাদশাহ ছিল না। রডারিকের বেশ কয়েকজন সন্তান ছিল। তাদের মধ্যে একমাত্র রাচমাভই ছিল তার বৈধ সন্তান। তার বয়স ছিল আঠার-উনিশ। নিয়ম অনুযায়ী সেই ছিল সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। কিন্তু এই বয়সেই সে অত্যন্ত বিলাসপ্রিয় হয়ে পড়েছিল। মা-বাবা তাকে রাজকর্মের প্রতি মনোযোগী করতে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাদের কোন চেষ্টাই সফল হয়নি।
রাচমান্ডের সবচেয়ে প্রিয় সখ ছিল শিকার করা, আর সুন্দরী রূপসী মেয়েদের সান্নিধ্য লাভ করা। সে কোন সুন্দরী যুবতী মেয়েকে দেখলেই তাকে নিজের ঘরে নিয়ে আসত। তারপর কিছুদিন তাকে নিজের কাছে রেখে বিদায় করে দিত।
রডারিক ছিল আন্দালুসিয়ার শাহানশা। সে তার শাহীমহলে হেরেম বানিয়ে রেখেছিল। তার হেরেমে শুধু আন্দালুসিয়ার মেয়েরাই থাকত না; বরং আশ-পাশের রাজ্যের সুন্দরী মেয়েরাও সেখানে থাকত। এদের দুই-তিনজনকে সে এমনভাবে হেরেমে স্থান দিয়েছিল যে, মনে হত তারা তার বৈধ স্ত্রী। তার বৈধ স্ত্রী শুধু একজনই ছিল। আর সেই স্ত্রীর ঘরেই জন্ম নিয়েছিল তার বিলাসপ্রিয় ছেলে রাচমান্ড। এছাড়া অন্য রমণীদের ঘরে রডারিকের যে ছেলে-সন্তান হয়েছিল তারা সকলে অবৈধ হওয়ার কারণে তাদেরকে রাজপুত্র বলা হত না। হেরেমের অন্যান্য রমণীদেরকে কিছু দিন অতিবাহিত হওয়ার পরই বের করে দেওয়া হত। তাদের জায়গায় নতুন রমণীদেরকে নিয়ে আসা হত। কিন্তু তাদের মধ্যে দুই-তিনজন রমণী রডারিকের প্রিয়ভাজন হয়ে গেয়েছিল। মধ্য বয়সেও তারা শাহীমহলেই অবস্থান করত। তাদের সন্তানরা যৌবনে পদার্পণ করেছিল। রডারিকের মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্ত কে হবে, তা নিয়ে সমস্যা দেখা দিল। এ সময় রডারিকের উপপত্নিরাও তাদের ছেলেদেরকে আন্দালুসিয়ার বাদশাহ বানানোর জন্য ষড়যন্ত্র শুরু করল। কিন্তু রডারিকের বৈধ সন্তান রামান্ডের বর্তমানে অন্য কেউ সিংহাসনে বসতে পারছিল না।
টলেডোতে সেনাবাহিনীর জেনারেল ছিল ইউগোবেলজি। সে রডারিকের একান্ত আস্থাভাজন ব্যক্তি ছিল। সেনাবাহিনীর লোকেরা মনে করত যে, ইউগোবেলজি অত্যন্ত যোগ্য ও অভিজ্ঞ জেনারেল। তাই রডারিক তাকে টলেডোতেই রাখত।
কখনও কোন যুদ্ধে টলেডোর বাইরে পাঠাত না। প্রকৃত সত্য হল, সে ছিল রানীর একান্ত প্রিয় মানুষ। রডারিকের উপর রানীর প্রভাব ছিল খুব বেশি। রানীর কোন কথাই রডারিক অমান্য করতে পারত না। রানীর প্রতি রডারিকের এই আনুগত্যের প্রতিদানও রানী যথাযথভাবে আদায় করত। কোথাও কোন সুন্দরী-রূপসী মেয়ে পেলে রানী তাকে উপহারস্বরূপ রডারিকের নিকট পেশ করত।
***
রডারিকের ছেলে রাচমান্ড ঐ সকল যুবতী মেয়েদেরকে তার শয্যাসঙ্গী বানাত, যারা রডারিকের উপপত্নিদের গর্ভজাত ছিল। এসকল মেয়েদের মাধ্যে লিজা নামের একটি যুবতী মেয়ে ছিল। তার বয়স বাইশ কি তেইশ হবে। বারাগসান নামে তার একজন ভাইও ছিল। সে ছিল পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের যুবক। শাহীমহলে তার বেশ ভালো প্রভাব ছিল।
জেনারেল ইউগোবেলজিও রডারিকের মতোই বিলাসপ্রিয় ছিল। রডারিকের মৃত্যুর পর শাহীমহলে সেই ছিল অঘোষিত সম্রাট। তার নির্দেশই শাহীমহলে কার্যকর হত। সে লিজার প্রতি অনেকটা দুর্বল ছিল। রডারিকের মৃত্যুর পর সে লিজাকে কাছে পাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করল। কিন্তু লিজা তাকে কোন পাত্তাই দিল না। অবশেষে জেনারেল লিজাকে বিবাহ করার প্রস্তাব দিল, কিন্তু লিজা তাতে সম্মত হল না। ফলে জেনারেল তাকে কঠিন ধমকি দিল। লিজাও জেনারেলকে পাল্টা ধমকি দিয়ে বলল, সে যদি তাকে আর কখনও বিরক্ত করতে চেষ্টা করে তাহলে সে রানীর কাছে সব বলে দেবে। লিজা হয়তো জানত যে, জেনারেল রানীকে খুব ভয় পায়। শাহীমহলে রানীর প্রভাব ছিল সবার উপর। রানীর অনুগ্রহে মহলে এই জেনারেলকে সবাই সমীহ করে চলত।
তারিক বিন যিয়াদ যখন টলেডোর দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন তখন এক রাতে লিজা জেনারেল ইউগোবেলজির ঘরে এসে উপস্থিত হল।
‘তুমি? কেমন আছো?’ জেনারেল ইউগোবেলজি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
আপনার কাছেই এসেছি। লিজা বলল। আপনি এত আশ্চর্য হচ্ছেন কেন?
‘তোমাকে এখানে আসতে কেউ দেখেনি তো?’ জেনারেল জিজ্ঞেস করলা।
“না, কেউ দেখেনি। লিজা বলল।
লিজা জানত না যে, এক ব্যক্তি তাকে লক্ষ্য করছে এবং তার পিছু নিয়ে এখানে এসেছে। সে হল, রাচমান্ড।
‘আমি অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও বেকুফ নই।’ জেনারেল বলল। তোমার চেহারা ও তোমার অঙ্গভঙ্গি বলে দিচ্ছে, তুমি অন্য কোন উদ্দেশ্যে এখানে এসেছ, তোমার সে উদ্দেশ্য কি বল?
