এই শহর দুটিতে মুসা বিন নুসাইরের কৃতিত্ব শুধু এতটুকু ছিল যে, শহর দুটিতে বিদ্রোহের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠার আগেই তিনি বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ নির্বাপিত করে দিয়েছিলেন। কিন্তু দামেস্কে খলীফার দরবারে এই সংবাদ পাঠানো হল যে, মুসা বিন নুসাইর ঐ শহর দুটি জয় করেছেন।
এরপর মুসা বিন নুসাইর যখন এ্যাশবেলিয়া শহরের দিকে অগ্রসর হন তখন তাঁর যুদ্ধ-পারঙ্গমতা ও নেতৃত্বের পরীক্ষা হয়। এ্যাশবেলিয়া আন্দালুসিয়ার একটি বড় শহর। তারিক বিন যিয়াদ এই শহর আক্রমণ করেননি। কারণ, তিনি সর্বপ্রথম আন্দালুসিয়ার প্রাণকেন্দ্র ও রাজধানী টলেডো দখল করতে চাচ্ছিলেন। তিনি মনে করতেন, রাজধানীতে বাদশাহর সিংহাসন এখন খালি পড়ে আছে। মূলত আন্দালুসিয়ায় এখন কারো বাদশাহী নেই। তাই টলেডো দখল করতে পারলে অন্যান্য এলাকা দখল করা সহজ হবে। তারিক বিন যিয়াদ কর্ডোভা ও গ্রানাডাকেও টলেডোর মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর মনে করতেন।
প্রফেসার ডোজি লেখেন, এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শহর হস্তগত হয়ে গেলে অন্যসব এলাকার কোন গুরুত্ব থাকবে না। তখন সেসব এলাকার সৈন্যরা এমনিতেই হাতিয়ার সমর্পণ করবেন। এটাই ছিল তারিক বিন যিয়াদের সামরিক বিচক্ষণতা ও যুদ্ধজয়ের নিগুঢ় তথ্য। তিনি সর্বোচ্চ রণকৌশল প্রয়োগ করে অল্প সংখ্যক সৈন্যের মাধ্যমে বিশাল সাফল্য অর্জন করতে চাচ্ছিলেন।
মুসা বিন নুসাইর পূর্বেই তাঁর গুপ্তচর ইউনিটের সদস্যদেরকে এ্যাশবেলিয়া পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি মেডেনাসেডোনা ও কারমুনার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের থেকে এ্যাশবেলিয়ার যাবতীয় তত্ত্ব সংগ্রহ করেছিলেন। অবশেষে তিনি এ্যাশবেলিয়া অবরোধ করে বসেন। তার ধারণা ছিল, এই বিশাল বাহিনীর মাধ্যমে তিনি অতি সহজে এ্যাশবেলিয়া দখল করে নিতে পারবেন। কিন্তু সেখানকার সৈন্যবাহিনী অত্যন্ত বীরত্বের পরিচয় দিল এবং এমন রণকৌশল অবলম্বন করল যে, মুসা বিন নুসাইর অল্প সময়ের মধ্যে বুঝতে পারলেন, এই দুর্গ জয় করা খুব একটা সহজ হবে না।
এ্যাশবেলিয়ার অধিবাসীরা এমন প্রতিরোধের ব্যবস্থা করল যে, সকাল বেলা তারা হঠাৎ করে দুর্গের দুটি ফটক খোলে দিত। তারপর বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের ন্যায় অশ্বারোহী বাহিনী দুর্গ থেকে বের হয়ে মুসলিম বাহিনীর উপর অতর্কিতে হামলা করে বসত। তারা এক স্থানে জমে লড়াই করত না, বরং তলোয়ার ও বর্শা দ্বারা আঘাত হানতে হানতে ঘুরে দুর্গের ভিতর ঢুকে যেত। কখন কোন দিক থেকে তারা আক্রমণ করবে তা কিছুই বুঝা যেত না।
মুসা বিন নুসাইর এ অবস্থার মুকাবেলা করার জন্য অনেক চেষ্টা করলেন, কিন্তু কোন উপায়ই কাজে লাগল না। অবরোধ দীর্ঘায়িত হতে লাগল। এভাবে অবরোধ করে বসে থাকতে থাকতে এক মাস অতিবাহিত হয়ে গেল।
মুসা বিন নুসাইর ছিলেন অভিজ্ঞ সেনাপতি। তিনি জীবনে অনেক দুর্গ জয় করেছেন। যুদ্ধের ময়দানে নিজেও একজন সাধারণ সৈন্যের মতো লড়াই করতেন। কিন্তু এখন তিনি জীবনের শেষ বেলায় উপনীত হয়েছেন। তাঁর বার্ধক্যপীড়িত শরীরে আগের মতো সেই শক্তি ছিল না, যা তাকে দুর্গপ্রাচীরের উপর আরোহণ করতে সহায়তা করত। খ্রিস্টান বাহিনী একের পর এক তাঁর বাহিনীর ক্ষতি করছিল, কিন্তু তিনি তাদেরকে কোন কিছুই করতে পারছিলেন না। তাই তিনি গভীরভাবে চিন্তা করছিলেন, এখন কী করা যায়?
অবশেষে তাঁর দুই ছেলে আবদুল্লাহ ও মারওয়ান অত্যন্ত বীরত্ব প্রদর্শন করলেন। খ্রিস্টান বাহিনী যখন দুর্গের বাইরে এসে মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ করল তখন তারা দুজন তাদের অশ্বারোহী বাহিনীকে দ্রুত হাঁকিয়ে একেবারে দুর্গপ্রাচীরের কাছে নিয়ে গেলেন। এভাবে তারা খ্রিস্টান বাহিনীর দুর্গে ফিরে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দিলেন। মুসলিম বাহিনীর জন্য ভয়ের কারণ ছিল, তাদের উপর দুর্গপ্রাচীর থেকে তীরন্দাজ বাহিনী তীর-বর্শার আক্রমণ করতে পারে। মুসলিম বাহিনী এই বিপদকে উপেক্ষা করে দুর্গের প্রাচীর ঘেষে অবস্থান গ্রহণ করে। তার পর খ্রিস্টান অশ্বারোহী বাহিনীকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে তাদেরকে খতম করে দেয়।
এ ধরনের যুদ্ধকৌশল অবলম্বন করলে অনেক বেশি প্রাণহানীর সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু এ ছাড়া বিকল্প কোন উপায়ও ছিল না। এমন বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে তিন-চারবার প্রতিরোধ গড়ে তুলার ফলে দুর্গের সৈন্যসংখ্যা অনেক কমে গেল। মুসা বিন নুসাইর এই সিন্ধান্তে অটল থাকলেন যে, যত বেশি রক্তের প্রয়োজনই হোক না কেন-এই শহর জয় করতেই হবে। অবশেষে দেড় মাস পর এ্যাশবেলিয়া মুসলিম বাহিনীর হাতে বিজিত হয়।
***
আন্দালুসিয়ার আরেকটি বড় শহর মেরিডা। কোন কোন ঐতিহাসিক লেখেছেন, টলেডোর চেয়েও মেরিডার গুরুত্ব ছিল বেশি। মুসা বিন নুসাইর এই শহরের দিকে রওনা হলেন।
তারিক বিন যিয়াদ টলেডোর দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। এই যুদ্ধের ব্যাপারে তিনি এতটাই চিন্তিত ছিলেন যে, ইতিপূর্বের কোন যুদ্ধের ব্যাপারে তিনি এতটা চিন্তিত ছিলেন না। টলেডোর প্রাকৃতিক ও সামরিক প্রতিরক্ষার যে বিবরণ তিনি শুনেছিলেন, তা তাকে পেরেশান করে তুলেছিল। তারিক বিন যিয়াদ তার সালারদের নিকট কয়েকবার মুসা বিন নুসাইরের ব্যাপারে অসন্তুষ্টির কথা প্রকাশ করলেন। তিনি তাদেরকে বললেন :
