অমুসলিম ঐতিহাসিকগণ তো সবসময় মুসলমানদের দোষ খুঁজে বেড়ান, কিন্তু এক্ষেত্রে মুসলিম ঐতিহাসিকগণও লেখেছেন যে, মুসা বিন নুসাইর তারিক বিন যিয়াদকে সাহায্য করার জন্য আন্দালুসিয়া পৌঁছেননি; বরং তিনি আন্দালুসিয়ার বিজয়-মুকুট অর্জন করতে চাচ্ছিলেন।
তারিক বিন যিয়াদকে সকলেই আন্দালুসিয়ার বিজেতা আখ্যায়িত করছিল। তার বিজয়ের বিভিন্ন সংবাদ খলীফা ওলিদ বিন আবদুল মালেকের নিকট পৌঁছানো হচ্ছিল। খলীফার পক্ষ থেকে তারিক বিন যিয়াদের নিকট পয়গামও পাঠানো হত। এটা মুসা বিন নুসাইর পছন্দ করছিলেন না। আরব মুসলমানরা বার্বার মুসলমানদেরকে সেকেলে ও গোঁয়ার মনে করত। মুসা বিন নুসাইর এটা মেনে নিতে পারছিলেন না যে, তাঁর আযাদকৃত একজন গোলামকে আন্দালুসিয়ার বিজেতা বলা হবে।
কোন কোন ঐতিহাসিক লেখেছেন, সে সময় মুসা বিন নুসাইরের বয়স হয়েছিল আশি বছর। তাই তিনি পূর্ণ বিচক্ষণতার সাথে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে পারছিলেন না। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য তিনি তাঁর অধীনস্থ উপদেষ্টাদের উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। এসকল উপদেষ্টারা তাঁকে তাদের হাতের মুঠোয় ভরে নিয়েছিল। তারাই তাকে বুঝিয়ে ছিল যে, একজন গোলামকে আন্দালুসিয়ার মতো বিশাল সাম্রাজ্যের বিজেতা বলা মনিবের জন্য অপমানজনক।
এমন কিছু ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়, যদ্বারা মুসা বিন নুসাইরের মানসিকতা বুঝা যায়। তিনি যখন তারিক বিন যিয়াদকে আন্দালুসিয়ায় পাঠিয়েছিলেন তখন তার সাথে মাত্র সাত হাজার সৈন্য দিয়েছিলেন। সেই বাহিনীতে অশ্বারোহীর সংখ্যাছিল খুবই কম। কিন্তু মুসা বিন নুসাইর যখন নিজে আন্দালুসিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন তখন তাঁর সাথে ছিল আঠার হাজার সিপাহী। তন্মধ্যে দশ হাজার অশ্বারোহী, আর আট হাজার পদাতিক। তিনি যদি তারিক বিন যিয়াদের প্রতি হিতাকাক্ষী হতেন তাহলে নিজে আন্দালুসিয়া না এসে এই আঠার হাজার সৈন্যের বাহিনীকে তারিক বিন যিয়াদের সাহয্যে পাঠিয়ে দিতেন।
দ্বিতীয়ত তিনি যখন আন্দালুসিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন তখন তিনি তাঁর দুই পুত্র আবদুল্লাহ এবং মারওয়ানকে সালার বানিয়ে নিজের সাথে রাখেন। বড় ছেলে আবদুল আযিযকে আফ্রিকার আমীর নিযুক্ত করেন।
তৃতীয়ত তিনি কুরাইশের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকেও সাথে নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে আলী বিন আবিল হুমা ও হায়াত বিন তামিমী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার বাহিনীতে দুই-তিনজন বয়োবৃদ্ধ সাহাবায়ে কেরামও ছিলেন, যাদের শারীরিক অবস্থা লড়াই করার মতো ছিল না। এছাড়া তিনি কয়েকজন সাহাবায়ে কেরামের সন্তানকেও তার বাহিনীর সাথে নিয়ে যান। তার উদ্দেশ্য ছিল, বাবার সম্প্রদায়ের উপর আরবদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা।
মুসা বিন নুসাইরের মনের কথা এভাবেই প্রকাশ হয়ে পড়েছিল যে, তিনি আঠার হাজার সৈন্য নিয়ে আন্দালুসিয়া গেছেন, কিন্তু তিনি তারিক বিন যিয়াদকে তাঁর আগমন সম্পর্কে সংবাদ দেওয়ার কোন প্রয়োজনও মনে করেননি, বরং তিনি তারিক বিন যিয়াদকে এই নির্দেশ পাঠিয়ে ছিলেন যে, তারিক যেখানে আছে সেখানেই যেন অবস্থান করে; সামনে অগ্রসর না হয়। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে যদি দেখা হয়, তাহলে স্পষ্টই বুঝে আসে যে, এই নির্দেশও ছিল ক্ষতিকর। কারণ, সেই পরিস্থিতিতে একমাত্র তারিক বিন যিয়াদই বুঝতে পারছিলেন, তাঁকে কী পদক্ষেপ নিতে হবে? তারিক তার সালারদের সাথে পরামর্শ করেই সিন্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাদের একজনও তাঁকে এই রামর্শ দেয়নি যে, অগ্রযাত্রা বন্ধ করে এখানেই বসে থাকা উচিৎ।
মুসা বিন নুসাইর তারিক বিন যিয়াদকে মাত্র সাত হাজার সৈন্য দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেই বাহিনীর সকলেই ছিল বার্বার। বাবার সম্প্রদায় যদিও লড়াকু ছিল, কিন্তু নিয়মিত যুদ্ধ করার নিয়ম-কানুন তাদের জানাছিল না। তাদের নিকট গুপ্তচর বৃত্তির কোন ব্যবস্থা ছিল না। অথচ একটি সেনাবাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল তার গুপ্তচর ইউনিট। বার্বাররা শুধু লড়াই করতে জানত। কিন্তু মুসা বিন নুসাই যখন আন্দালুসিয়া যান তখন তার সাথে ছিল গুপ্তচর বাহিনীর শক্তিশালী ইউনিট। এই গুপ্তচর ইউনিটের কারণে পূর্বেই তিনি জানতে পারতেন, সামনের রণাঙ্গনে তাঁকে কী পদক্ষেপ নিতে হবে এবং শত্রুপক্ষের শক্তি কতটুকু?
***
তারিক বিন যিয়াদ যেসব এলাকা জয় করে সামনে অগ্রসর হচ্ছিলেন তার মাধ্যে প্রসিদ্ধ দুটি এলাকা হল মেডোনাসেডোনা ও কারমুনা। মুসা বিন নুসাইরের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তাঁকে এই সংবাদ দিল যে, তারিক বিন যিয়াদ এই শহরগুলোর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য খ্রিস্টানদের নিয়োগ দিয়েছিলেন।
তারিক বিন যিয়াদের এটাও একটা অপারগতা ছিল যে, তাঁর নিকট প্রশাসন চালানোর মতো কোন যোগ্য লোক ছিল না। তাই তিনি বাধ্য হয়ে খ্রিস্টান ও ইহুদি প্রশাসক নিযুক্ত করেন।
মুসা বিন নুসাইর জানতে পারলেন যে, এই শহর দুটিতে খ্রিস্টানরা বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অতিসত্বর তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করবে।
মুসা বিন নুসাইর হঠাৎ এই শহর দুটিতে প্রবেশ করে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। ক্ষমতা যেহেতু মুসলমানদের ছিল, তাই মুসলিম বাহিনীকে শহরে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে বাধা প্রদান করা হল না। মুসা বিন নুসাইর শহরগুলোর উপর তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে আরব প্রশাসক নিযুক্ত করলেন।
