“কি হল? মেরী জিজ্ঞেস করল।
‘সামনে গিয়ে গুপ্তধন দেখে এসো।’ জিম বলল।
মেরী মশাল হাতে নিয়ে গর্তের কাছে গিয়ে চিৎকার করে উঠল। গর্তে তিনটি লাশ পড়ে ছিল। লাশ দেখে ভয় পাওয়ারই কথা। কিন্তু এই লাশগুলোর সাথে মাথা ছিল না। তিনটি মাথা প্রতিটি লাশের বুকের উপর রাখাছিল। এ দৃশ্য দেখে মেরী কাঁপতে কাঁপতে জিমকে জড়িয়ে ধরল।
‘লাশগুলোর রক্ত দেখছি এখনও শুকায়নি।’ জিম বলল। মনে হচ্ছে, কিছুক্ষণ আগে তাদেরকে হত্যা করে দাফন করা হয়েছে।
‘এদেরকে কেন হত্যা করা হয়েছে?’ মেরী জানতে চাইল।
এরা হয়তো জানত-এখানে গুপ্তধন আছে।’ জিম বলল। এরা মনে হয়, গুপ্তধন নেওয়ার জন্য এসেছিল। পাদ্রি নিশ্চয় এখানে প্রহরী রেখে গেছে। প্রহরীরাই এদেরকে হত্যা করেছে, কিংবা এরা বেশি সংখ্যক লোক এসেছিল গুপ্তধন নেওয়ার জন্য। অংশিদার কমানোর জন্য নিজেরাই নিজেদের তিনজন লোককে হত্যা করেছে।’
‘তাহলে তো গুপ্তধন আর নেই।’ মেরী বলল।
***
‘তুমি সরো।’ জিম বলল। আমি দ্বিতীয় গর্ত থেকে মাটি সরিয়ে দেখছি।’
মেরী দূরে গিয়ে দাঁড়াল। জিম দ্বিতীয় গর্তের মাটি সরাতে শুরু করল। জিমের পিঠ সিঁড়ির দিকে ছিল। সে দ্বিতীয় গর্ত থেকে মাত্র মাটি সরানো শুরু করেছে, এমন সময় সিঁড়ির দিক থেকে এক ব্যক্তি তলোয়ার হাতে নিয়ে দৌড়ে এসে জিমর উপর আক্রমণ করে বসল।
‘এ সম্পদ আমার।’ লোকটি জিমের পিঠে তলোয়ার সমূলে বিদ্ধ করে বলল। ‘এই সম্পদের কারণেই আমি একাকী এখানে রয়ে গেছি।’
তলোয়ারের আঘাতে জিম মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। হামলাকারী মেরীর দিকে তাকাল। সে মেরীকে আক্রমণ করতে উদ্যত হল। মেরীর কাছেও খঞ্জর ছিল, কিন্তু সে খঞ্জর চালাতে পারত না। হামলাকারী মেরীর উপর আক্রমণ করতে উদ্যত হতেই মেরী তার হাতের জ্বলন্ত মশাল হামলাকারীর মুখের উপর ছুঁড়ে মারল। মশালের আগুনে হামলাকারীর চেহারা ঝলসে গেল। হামলাকারী তলোয়ার ফেলে দিয়ে দু’হাতে চেহারা ধরে মাটিতে বসে পড়ল।
মেরী মশাল তুলে নিয়ে দ্বিতীয়বার তার চেহারার উপর ছুঁড়ে মারল। মশালের আগুন হামলাকারীর হাতে লাগলে সে হাত সরিয়ে নিল। ফলে চেহারা আরও ঝলসে গেল। হামলাকারীর পিছনে জিম মাটিতে পড়ে ছটফট করছিল। হামলাকারী মশাল থেকে বাঁচার জন্য পিছনে সরে এলে জিমের শরীরের সাথে ধাক্কা লেগে পড়ে গেল। জিম মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিল। তার কাছেই একটি কোদাল পড়ে ছিল। জিম কোদালটি উঠিয়ে শুয়ে থেকেই হামলাকারীর মাথা লক্ষ্য করে আঘাত করল। সাথে সাথে মেরী দৌড়ে এসে হামলাকারীর বুকে খর বসিয়ে দিল। তারপর খঞ্জর টেনে বের করে আবার আঘাত করল।
‘মেরী! জিম মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তে লড়তে বলল। দ্রুত এখান থেকে পালিয়ে যাও। তোমার ঘরে গিয়ে আত্মগোপন করে থাক।’
“না, জিম! আমি তোমাকে এখানে রেখে কোথাও যাব না। মেরী কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলল।
মেরী জিমের কাছে গিয়ে তার মাথা কোলে তুলে নিতেই জিম শেষ নিঃশাস ত্যাগ করল। জিমের মাথা একদিকে হেলে পড়ল। হামলাকারীও মারা গেল।
মশাল মেজের উপর পড়ে জ্বলছিল। ভূ-গর্ভস্থ ঘরের দেয়াল ও ছাদে মশালের আলোতে ছায়া নড়াচড়া করছিল। মনে হচ্ছিল, ঐ মৃত ব্যক্তিদের প্রেতাত্মা সারা ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গুপ্তধন অন্য গর্তে ছিল। গুপ্তধনের স্তূপের উপর দুটি লাশ পড়ে ছিল। তাদের শরীর থেকে তখনও রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল।
আইনামেরী ভয়ে থর থর করে কাঁপছিল। মশালের আলোর রহস্যময় ছায়া তাকে আরও বেশি ভীত করে তুলল। হঠাৎ তার মনে হল, আরও কেউ এখানে চলে আসতে পারে। হয়তো গির্জাতেই কেউ আছে। সে মশাল সেখানে ফেলে রেখে ভূ-গর্ভস্থ ঘর হতে বের হয়ে উপরে উঠে এলো। ভূ-গর্ভস্থ ঘরের সিঁড়ির দরজা বন্ধ করে সে ধীরে ধীরে চলতে লাগল। চারদিকে নিকষ কালো অন্ধকার। সে যদি গির্জা সম্পর্কে অবগত না হত তাহলে সে এই অন্ধকারে দেয়াল, পিলার ও অন্যান্য বস্তুর সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যেত। গির্জা হতে বের হওয়ার কোন রাস্তাও সে খুঁজে পেত না। ভয়ের কারণে তার পাও চলছিল না। গির্জা হতে বের হতেই তার ভয় করছিল।
আন্দালুসিয়ার রাজধানী টলেডোর রাত নীরবে-নিবৃত্তে কেটে যাচ্ছিল। গোটা শহরে ভূতুরে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। শহরের অধিকাংশ বাড়ী মানবশূন্য হয়ে পড়েছিল। এ অবস্থা একজন সুন্দরী যুবতী মেয়ের জন্য অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ছিল। গির্জায় আত্মগোপন করে থাকাও সে নিজের জন্য নিরাপদ মনে করছিল না। সে সাহসে বুক বেঁধে বাইরে বেরিয়ে পড়ল। তারপর ভয়ে-আতঙ্কে জড়সড় হয়ে দেওয়ালের আড়াল নিয়ে তার বাড়ীতে পৌঁছে গেল। বাড়ীতে পৌঁছে ভিতর থেকে সে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল।
***
রাতের আধার কেটে যখন ভোরের আলো ফুটে উঠল তখন তারিক বিন যিয়াদ তার বাহিনীকে সামনে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন। টলেডো পৌঁছার আগ পর্যন্ত তারিক বিন যিয়াদের বাহিনীর জন্য এটাই ছিল শেষ যাত্রা বিরতি। সফরও খুব দীর্ঘ ছিল। তারিক বিন যিয়াদ তার সকল সালারদেরকে নিয়ে টলেডোর মতো গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ সফলভাবে দখল করার জন্য মহড়ার ব্যবস্থা করলেন।
৭১২ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৯৩ হিজরীর শেষ দিনগুলোর ঘটনা। আফ্রিকার সম্মানিত আমীর মুসা বিন নুসাইর ১৮ হাজার সিপাহীর এক বিশাল বাহিনী নিয়ে আন্দালুসিয়ার দক্ষিণ সীমান্তবর্তী উপকূলীয় অঞ্চলে অবতরণ করেন।
